কাকলি মুখোপাধ্যায়

 

 

বাঙালি যে আজও অদম্য, ফের একবার হাড়ে–‌হাড়ে মালুম হচ্ছে এবারের শারদোৎসবে!‌
শনি–‌রবিবারের ছড়ানো–‌ছেটানো বৃষ্টিকে তুড়িতে উড়িয়ে যে–বাঙালি ঝঁাপিয়ে নেমেছিল বনহুগলি থেকে বেহালার পথে–‌পথে, মহানবমীর সকালে দেখা গেল, ফুরসত–মতো একটু যেন জিরিয়ে নিচ্ছে নতুন উৎসাহে কোমর বেঁধে মাতবে বলে। হাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস ততক্ষণে সকলেরই শোনা হয়ে গেছে। আকাশও সেজেছে মেঘে–‌মেঘে। রীতিমতো যুদ্ধ–‌প্রস্তুতি নিয়ে তাই সকাল পেরিয়ে বেলা গড়াতেই রাস্তায় নামতে দেরি করেনি ছাতা বা বর্ষাতি–‌সঙ্গী আমজনতা। শহরতলি থেকে একেকটা লোকাল ট্রেন ঢুকেছে হাওড়া ও শিয়ালদায়, আর উগরে দিয়েছে ভিড়। সেই ভিড় ক্রমশ চওড়া হয়ে রওনা দিয়েছে শহরের নানা মণ্ডপে–মণ্ডপে। বৃষ্টি–‌বাজের সাধ্য কী সে–‌আনন্দতরঙ্গে বাদ সাধে!‌

এবার ‘‌অজান্তে’‌। উত্তর কলকাতার আহিরীটোলা সর্বজনীনের পুজো–‌ভাবনা। সভ্যতার সংকট আর তাকে মোকাবিলার বার্তা। কেন ফুরিয়ে যাচ্ছে সব ঐতিহ্য, লম্বা হচ্ছে হারানোর তালিকা, তার দিকেই অঙ্গুলি–‌নির্দেশ তাদের ভাবনায়। যথেচ্ছ জল অপচয় রুখতে গুজরাটের পাটনের বিখ্যাত ‘‌রানি কি ভাভ’‌ তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপে। ভিড় টানছে বেশ। বরাবরের মতো এবারও অনেকেরই প্রিয় গন্তব্য বাগবাজার সর্বজনীন। সেদিকটা এক ঝলক দেখে নিয়ে, অনেকেই চলেছেন শোভাবাজার রাজবাড়ির দিকে। ২৬৩তম বর্ষে সেখানে সাবেক রীতি মেনে পুজোর আয়োজন। পঁাঠাবলি নিষিদ্ধ। তাই আখ, মাগুর মাছ, চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয় রাজবাড়িতে। তিন দিনে ৯টি বলি। রাজবাড়ি ঘুরে নিয়ে তার পর পায়ে–‌পায়ে এগিয়ে চলা টালা পার্ক প্রত্যয়, কাশী বোস লেন, নবীন পল্লি, নলিন সরকার স্ট্রিট, হাতিবাগান সর্বজনীনে। সর্বত্র ভিড়–‌জমাট মুখর নবমী। নর্থ ত্রিধারা সর্বজনীন এবার নজরকাড়া ভাবনায় দর্শক টানছে। আপাতভাবে মনে হতে পারে, মিনিবাস এখানে থিম। না। বিষয় হিসেবে এখানে ধরা হয়েছে মিনিবাস–চালক প্রতিমা পোদ্দারকে, তঁার সারা জীবনের সংগ্রামকে। অভিনব বৈকি!‌ বেশ ক’‌বছর ধরে সল্টলেকের পুজোগুলিও নজর টানছে। এবার এডি ব্লকে শিল্পী শঙ্কর পালের বিষয়–ভাবনায় ধরা দিয়েছে ‘‌সূচনা’‌, মাধ্যম যার শঙ্খ। আবার এফডি ব্লকে শিল্পী মিন্টু পাল গড়েছেন গ্যালিভার ট্রাভেল্‌সের লিলিপুটদের দুনিয়া। দু’‌জায়গাতেই যথেষ্ট ভিড় নবমীর সকালে। ওদিকে, মধ্য কলকাতায় সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যার থেকে শুরু করে কলেজ স্কোয়্যার, মহম্মদ আলি পার্ক— নবমীর দুপুর যথারীতি ভিড়াক্কার। সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে এবার দুর্গাপ্রতিমাকে মুড়ে দেওয়া হয়েছে ৫০ কেজি সোনার পাতে। কাজ হয়েছে আড়াই মাস ধরে। পরিশ্রম সার্থক, দেদার ভিড় সেখানে। এ ছাড়া দক্ষিণ কলকাতার ৬৬ পল্লি, ৯৫ পল্লি, বাদামতলা আষাঢ় সংঘ, দেশপ্রিয় পার্ক, ত্রিধারা, একডালিয়া এভারগ্রিন— সর্বত্র নাছোড় দর্শনার্থীর ধুম লেগেছে দুপুরের পর থেকেই। ম্যাডক্স স্কোয়্যারে আড্ডা জমেছে এদিনও। আবাসনগুলিতেও মাংস–‌পোলাও খাওয়ার পাশাপাশি মহানবমীর হইচই আর হুল্লোড়।

এদিকে কলকাতা পুলিশের উদ্যোগে মহানগরের পথে পথে এবারও বসেছে সিসিটিভি। ভিড় সামলাতে সদা–‌প্রস্তুত পুলিশ। ভিড়ের মধ্যেই মিশে রয়েছে কলকাতা মহিলা পুলিশের ‘‌দ্য উইনার্স’‌ বাহিনী। কোথাও সাদা পোশাকে, কোথাও–‌বা ইউনিফর্মে। রাস্তাঘাটে মহিলাদের সঙ্গে অভব্যতা করলেই ভিড়ের মধ্যে আচমকা আটক করবেন তঁারা। দিনের বেলাতেও প্রচুর দর্শনার্থী ঠাকুর দেখতে বেরোচ্ছেন বলে এবার ভোর থেকেই ঝঁাকে–‌ঝঁাকে পুলিশকর্মী মোতায়েন রয়েছেন রাস্তাঘাটে।

বেহালা–‌লাগোয়া নামী পুজোগুলির বাজার এবারও সপ্তমে। পুজোর মুখেই কলকাতার মহানাগরিক ফিরহাদ হাকিম দুটি বেইলি ব্রিজের উদ্বোধন করেছেন। ওই দুটি সেতু খুলে দেওয়ায় যাতায়াতের সমস্যা নেই। নবমীর বিকেল থেকেই নাকতলা উদয়ন সংঘ, সুরুচি সংঘ, চেতলা অগ্রণী, আলাপি, বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব, অজেয় সংহতি, ৪১ পল্লি, বড়িশা ক্লাব, বেহালা নূতন দলের পুজোমণ্ডপ ভিড় শুষে নিতে শুরু করেছে ব্লটিং পেপারের মতো। বেলা যত বিকেলে গড়িয়েছে, উৎসবের মাতনও ক্রমেই চড়েছে পাল্লা দিয়ে। ভিড়ের দাপটে দক্ষিণ কলকাতার কোথাও কোথাও থমকে যেতে আরম্ভ করেছে যান–‌চলাচল।

বিকেল পেরিয়ে সন্ধে নামলে, বৃষ্টির বাউন্সারকে সুকৌশলে সামলে কীভাবে নবমী–‌নিশিতে বিভোর হয়ে ওঠে বাঙালি, এখন তারই প্রহর গুনছে শহর কলকাতা।

  


  ‌‌‌‌ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top