অমিতাভ সিরাজ: তিনি ম্যাডিবাবু। দুর্নীতির মাস্টার!‌
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঠিক এই দুই কঠোর শব্দে আবার আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
শুক্রবার বাংলায় পা রেখে তৃণমূল সরকারের সঙ্গে মমতার বিরুদ্ধেও সব সৌজন্য (‌!‌)‌ ছাপিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন মোদি। জলপাইগুড়িতে রাজ্যের গড়া কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর পরেই এদিন সন্ধ্যায় ইকো পার্কের ‘‌ক্যাফে অজান্তে’‌ রেস্তোরাঁয় সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন মমতা। সাংবাদিকরা মোদির ওই সব মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চান। সঙ্গত কারণেই প্রচণ্ড বিরক্ত ও রুষ্ট হয়েছেন তিনি, দৃশ্যতই। ক্ষুব্ধ মমতা বলেন, ‘‌নির্বাচন এলে চা–ওয়ালা হয়ে যান উনি। আর তারপরেই রাফাল–‌ওয়ালা। সারাক্ষণ মিথ্যে কথা বলছেন। দুর্নীতির মাস্টার। এখন তো ওঁকে মিস্টার রাফাল, ম্যাডিবাবু বলছেন সবাই।’ কংগ্রেস রাফাল দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হওয়ায় তাদের সমর্থনও করেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‌কিছু তো একটা হয়েছে পর্দার পিছনে। কংগ্রেসের কাছে তথ্য রয়েছে। আমরা ওদের সমর্থন করি।’‌ মেট্রো চ্যানেলে মমতার ‘‌সত্যাগ্রহ’‌ আন্দোলনে মোদির কটাক্ষের জবাব দিয়েছেন তিনি। মমতার দৃঢ় বিশ্বাস, ‘‌আসলে ম্যাডিবাবু ভয় পেয়েছেন। ২৩টি দল একজোট হয়েছি। ইন্ডিয়া ইজ ইউনাইটেড। তাই ভয় পেয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলছেন। চোরের মায়ের বড় গলা। মোদির মতো দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ কখনও এ দেশে জন্মায়নি। জগাই–‌মাধাই–‌‌বিদায় এটা আমাদেরই স্লোগান। টুকলি করছে ওরা। মোদি সরকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ!‌ এই নির্বাচনে এমন হারবেন মোদি যে ভুলেও আর তাকাবেন না।’‌
এদিকে, মোদির পশ্চিমবঙ্গ সফরকে ‘‌ফাঁকা কলসি বেশি বাজে.‌.‌.‌’‌ বলেও মন্তব্য করেছেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের উন্নতিতে কিছুই করে না কেন্দ্র। ৪ মাস আগেই জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চ উদ্বোধনের দিন ঠিক হয়েছিল। কথা ছিল কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও মুখ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। কিন্তু, কেন্দ্র বিজ্ঞপ্তি জারি না করায় পিছিয়ে যায় উদ্বোধনের দিন। অথচ এই সার্কিট বেঞ্চ গড়তে জমি দিয়েছে রাজ্য। ৩০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। এমনকী কর্মী থেকে বিচারপতি সবই রাজ্যের দেওয়ার কথা। সে সবের তোয়াক্কা না করেই‌ প্রধানমন্ত্রী রাজ্যকে, হাইকোর্টকে না জানিয়ে উদ্বোধন করেছেন বলে অভিযোগ মমতার। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, ‘‌সার্কিট বেঞ্চ কার?‌ কলকাতা হাইকোর্টের। উদ্বোধনে হাইকোর্টের কোনও বিচারপতি ছিলেন না। রাজ্য সরকারের কোনও অফিসার ছিলেন না। এ তো বরও নেই, কনেও নেই, ব্যান্ডপার্টি নিয়ে চলে এসেছে!‌ নির্বাচনী ব্যান্ড।’‌
রাজ্যের উন্নয়নে কেন্দ্রের অসহযোগিতা নিয়েও সোচ্চার হয়েছেন এদিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মোদি উত্তরবঙ্গের অনুন্নয়নের প্রশ্ন তোলায় মমতা বলেছেন, ‘‌কী করেছে কেন্দ্র?‌ ডানকানসের ৭টি–‌সহ মোট ১২টি চা–‌বাগান খুলবে বলেছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত খোলেনি। গরিব মানুষের ১৫ লক্ষ টাকা করে আজও ঢুকল না ব্যাঙ্কে। চা–‌শ্রমিকদের কোনও উন্নতি করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। বরং রাজ্য সরকারই সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে ভাতা থেকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা, ৩৫ কেজি চাল দিচ্ছে চা শ্রমিক–‌পরিবারকে।’ মমতা মনেও করিয়ে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গের মানুষের উন্নয়নে এই প্রথম সচিবালয় তৈরি হয়েছে‌ শিলিগুড়িতে। নতুন জেলা হয়েছে কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার। বেঙ্গল সাফারি পার্ক, পর্যটন শিল্পে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তরাই–‌ডুয়ার্স, কোচবিহার, মালদা, জলপাইগুড়িকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এদিন, জলপাইগুড়ির যে রাস্তা উদ্বোধন করেছেন মোদি, তার‌ও ইঞ্চি ইঞ্চি জমিতে অবদান রাজ্য সরকারের।’‌ 
মমতার আরও অভিযোগ, সারা দেশে সাংবিধানিক কাঠামো মানছে না মোদির সরকার। গণতন্ত্র বিপন্ন। সিবিআই, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘‌হুমকির মুখে’‌ কাজ করছে। রাজ্য থেকে আয়কর, সেস, আবগারি ইত্যাদি বাবদ টাকা নিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্র। অথচ গত ৫ বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখেছে মোদির সরকার। মমতা আরও বলেছেন, ‘‌আমাকে চমকানো সহজ নয়। সারা দেশে বিভেদ–‌রাজনীতি করছে। হিন্দু–‌মুসলমান ভাগাভাগি করে তাড়াচ্ছে অসম থেকে।’‌ সারদা তদন্ত নিয়ে মমতার বক্তব্য, ‘‌৫ বছর কেন্দ্র এ নিয়ে কী করেছে?‌ আমরা সিট গঠন করেছি। গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এটা বিচার বিভাগীয় ব্যাপার। তা সত্ত্বেও ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের হাতে তুলে দিয়েছি আমরা।’‌
মোদির উদ্দেশে তাই মমতার হুঁশিয়ারি, ‘‌আমাকে রাজনীতি শেখাবেন না। ২৩ বছর সাংসদ ছিলাম। প্রতিবাদের আওয়াজ উঠছে দেশ জুড়ে। আমার 
কণ্ঠরোধ করা যাবে না। নোটবন্দি থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে মানুষ বিরক্ত। ভূতের মুখে এখন রামনাম শুনছি। ঝুরি ঝুরি মিথ্যে কথা বলেন। আর এক মাস পরেই ওঁর বিদায় হবে।’‌
এদিকে মোদি–‌বিরোধী জোট ও নির্বাচনী লড়াই নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মমতা এদিন জানিয়েছেন, যেখানে ১:‌‌১ লড়াই হবে না, সেখানে যার যেমন শক্তি সেই দল নির্বাচনে লড়বে। মমতার বিশ্বাস, ‘‌আর এতেই ৬০ শতাংশ পেয়ে গেলে তো খেল খতম।’‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top