আজকালের প্রতিবেদন- গত ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেডের মঞ্চে ২৩টি দলের প্রতিনিধিদের একজোট করে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রমাণ করেছিলেন বিজেপি–‌বিরোধী লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনিই। রবিবার থেকে ধর্মতলায়‌ যে সত্যাগ্রহ আন্দোলন তিনি শুরু করেছেন, রাত পোহাতে না পোহাতে তাতে এ–ও প্রমাণিত যে, নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনিই আসল ‘মুখ’। বিরোধীরা প্রায় সকলেই তাঁর পাশে।  
কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, ডিএমকে নেতা স্ট্যালিন থেকে শুরু করে ফারুক আবদুল্লা, মেহবুবা মুফতি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, অখিলেশ যাদব— সকলেই তাঁর সত্যাগ্রহকে সমর্থন করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বস্তুত, বিরোধী জোটকে আরও শক্তিশালী করতে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন বিজু জনতা দলের নেতা, ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কও। অখিলেশের প্রতিনিধি হিসেবে সোমবার মমতার সঙ্গে দেখা করেন কিরণময় নন্দ। আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব এবং ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝিও রাতে মঞ্চে আসেন। তেজস্বী সটান বলেন, ‘বিজেপি বিদায় হলে দেশ বাঁচবে। প্রধানমন্ত্রী আসে–যায়। কিন্তু দেশের সংবিধান থেকে যায়।’ লালুপ্রসাদ যাদবের পুত্রের আরও বক্তব্য, ‘মমতাদি যে পদক্ষেপ করেছেন, আমাদের সকলের সেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া উচিত।’ তাঁর বক্তব্যের পর মমতা বলেন, ‘লালুজি কখনও বিজেপি–র সঙ্গে সমঝোতা করেননি।’ কংগ্রেসকে বার্তা দিয়ে মমতা বলেন, ‘আমার মনে হয়, সমস্ত আঞ্চলিক দল এবং জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া উচিত। আমাদের ওয়ান পয়েন্ট প্রোগ্রাম মোদিকে হটিয়ে দেশ বাঁচানো। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আমাদের বাঁচাতে হবে। দেশের নেতা তিনিই, যিনি সকলকে নিয়ে চলবেন। অন্য রাজনৈতিক দলকে ভয় দেখিয়ে, মেরেধরে দেশের নেতা হওয়া যায় না।’
মঞ্চ থেকে কানিমোঝি বলেন, ‘আমি আমার দল ডিএমকে এবং আমাদের নেতা এম কে স্ট্যালিনের তরফে বলতে এসেছি যে, আমরা সকলে মমতাদির সঙ্গে আছি। বিজেপি সরকার ম্যাডাম মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে যা করেছে, সেটা আসলে ব্রিগেডের সফল সমাবেশের জন্য উপহার। আমি এটা বলতে কলকাতায় এসেছি যে, আমরা সকলে একজোট হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মোকাবিলা করব।  বিজেপি–র ফ্যাসিস্ত সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে। দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সংবিধান রক্ষার জন্য আমাদের লড়াই চলবে।’
রবিবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই হানার পরই কেন্দ্রের সঙ্গে সঙ্ঘাত চরমে ওঠে রাজ্যের। রাজীবের বাড়িতে গিয়ে কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের পদস্থ অফিসারদের সঙ্গে আলোচনার পর রাতেই ধর্মতলায় অবস্থান–সত্যাগ্রহ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন মমতা। 
এদিন সেই মঞ্চ থেকেই তিনি বলেন, ‘‌এটা কোনও রাজনৈতিক মঞ্চ নয়। ভারত বাঁচাবার মঞ্চ। এই মঞ্চে যে কেউ আসতে পারেন। আমি সবাইকে স্বাগত জানাই।’‌ প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আক্রমণ করে মমতা বলেন, ‘‌আমি কোনও নির্দিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে নই। আমি মোদির বিরুদ্ধে। গোটা ভারতকে তিনি ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন। ভেদাভেদের রাজনীতি এনেছেন। তাঁর আমলে পারস্পরিক ঘৃণা বেড়েছে। সন্ত্রাস ক্রমশই বাড়ছে। বেআইনি কাজ করে তিনি গণতন্ত্রের স্তম্ভ ভেঙে দিয়েছেন।’‌ 
মঞ্চের সামনে ভিড় দেখে স্বভাবতই মমতা খুশি। সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‌সমস্ত রাজনৈতিক দল আমাদের কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছে। আমরা যৌথ নেতৃত্বে লড়ছি। ‌ইউনাইটেড ইন্ডিয়া‌ নাম দিয়ে আমরা বিজেপি–‌র বিরুদ্ধে নির্বাচনে লড়ব।’‌ মমতা সাফ বলেন, ‘‌গণতন্ত্র যেন গণতন্ত্রের পথে চলে। আইন যেন আইনের পথে চলে। বিজেপি ‌সকলের কণ্ঠরোধ করতে চায়। যারাই তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে, তাদের হয় জেলে ঢোকানো হচ্ছে নয়তো দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে। আমরা এসব ঘৃণা করি। দেশে ভয়ঙ্কর জরুরি অবস্থা চলছে।’‌
মন্ত্রী–নেতাদের সঙ্গেই ধর্মতলায় মমতার সত্যাগ্রহ মঞ্চে এদিন ছিলেন শিবাজি চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, সৈকত মিত্র, সুবোধ সরকার, শান্তনু রায়চৌধুরি, প্রণতি ঠাকুর, অভীক মজুমদার, পর্ণাভরা। কেউ গান করেন। কেউ কবিতা পড়েন। ছিলেন বিদেশ বসু, মানস ভট্টাচার্য, রহিম নবিরাও। সারাদিন ধরেই মাঝেমাঝে  বক্তব্য পেশ করেন মমতা। 

 

মমতা বলেন, ‘‌২০১৪ এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনে যে কায়দায় সন্ত্রাস ওরা করেছিল, একই কায়দায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে সন্ত্রাস হয়েছে। ১৯ জানুয়ারি ব্রিগেডে ২৩টি দলের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সেদিন থেকেই মোদিবাবুর ঘুম ভেঙে গেছে। ভয়ে কাঁপছেন আর ভাবছেন এই বুঝি তাঁর ক্ষমতা চলে গেল। তাই বিরোধীদের শেষ করতে নেমেছেন।’‌ 
মমতা বুঝিয়ে দেন, আগামিদিনে বিরোধীদের নিয়ে তিনি বিজেপি–র বিরুদ্ধে আরও জোরাল লড়াইয়ে নামছেন। তিনি বলেছেন, ‘‌আমাদের প্রথম কাজ মোদিকে তাড়ানো।’‌ রবিবার সত্যাগ্রহ শুরুর পর সারারাত জেগেই ছিলেন মমতা। রাতে খাবারও খাননি। শুধু চা খেয়েছেন। সঙ্গে ছিলেন অধিকাংশ নেতা–মন্ত্রী। সকালে আবার বসেছেন মঞ্চে। দিনভর সেখানেই ছিলেন। 

মমতার পাশে। তেজস্বী ও কানিমোঝি। মেট্রো চ্যানেলে। সোমবার রাতে। ছবি: বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top