‌আজকালের প্রতিবেদন: কলকাতা পুলিসের কমিশনার রাজীব কুমারকে নিয়ে কেন্দ্র–‌রাজ্য সংঘাত চরমে উঠল। যে সঙ্ঘাতের প্রেক্ষিতে রবিবার রাতে ধর্মতলায় ধর্নায় বসেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তার আগে তিনি সাফ বলেছেন, ‘যতক্ষণ না পরিস্থিতির বদল হবে, ততক্ষণ ধর্না চলবে। তাঁর বক্তব্য, ‘এটা অবস্থান–সত্যাগ্রহ। গান্ধীজির মতো আন্দোলন।’ ধর্নায় রাতেই সমর্থন জানান অখিলেশ যাদব। তৃণমূলের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন টুইট করেন, আজ, সোমবার বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিরোধী জোট প্রতিবাদের ঝড় তুলবে। ঘটনার সূত্রপাত এদিন সন্ধ্যায়। সিবিআই অফিসারদের একটি দল লাউডন স্ট্রিটে পুলিশ কমিশনারের সরকারি বাসভবনে যায়। তারা জানায়, তারা কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে চায়। অনুমতি ছাড়া বাড়িতে ঢোকা যাবে না বলে সিবিআইয়ের পথ আটকায় কলকাতা পুলিস। শুরু হয় তর্কাতর্কি। অন্যদিকে, সিবিআইয়ের একটি দল যায় পার্ক স্ট্রিট থানায় একটি চিঠি নিয়ে। তাদের বক্তব্য, তারা ওই চিঠিটি রাজীবকে দিতে চায়। ওই থানা থেকে বলা হয় কমিশনার যে এলাকায় থাকেন তা শেক্সপিয়র সরণি থানা এলাকায়। সিবিআই যায় শেক্সপিয়র সরণি থানায়। রাজীবের বাড়িতে সিবিআইয়ের যে দলটি গিয়েছিল, তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি পুলিস সুপার পদমর্যাদার অফিসার তথাগত বর্ধন ও অন্য অফিসাররা। তাঁদের কার্যত ‘আটক’ করে শেক্সপিয়র সরণি থানায় নিয়ে যায় কলকাতা পুলিশ। কিছুটা ধস্তাধস্তিও হয়। সিবিআই অভিযোগ করে, তাদের কাজে বাধা দিয়েছে কলকাতা পুলিশ। জোর করে গাড়িতে তুলে তাদের থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। প্রায় একইসময়ে বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশকে সল্টলেকের সিবিআই দপ্তর, সিজিও কমপ্লেক্সের বাইরে মোতায়েন করা হয়। কমপ্লেক্সে ঢোকার দুটি গেটের সামনে প্রচুর পুলিশ দাঁড়িয়ে যায়। পুলিশ যায় নিজাম প্যালেসে সিবিআইয়ের পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তরেও। ইতিমধ্যেই রাজীবের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। পৌঁছন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, রাজ্যপুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র, এডিজি (‌আইনশৃঙ্খলা)‌ অনুজ শর্মাও। সেখানে দীর্ঘক্ষণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলে। বৈঠকের পর কমিশনারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা বাংলাকে অপমান করা হচ্ছে। আমি দীর্ঘদিন রাজনীতি–করা লোক। সকলের কাছে সম্মান পেয়ে এসেছি। যে কায়দায় মোদি সমস্ত সৌজন্য নষ্ট করেছেন, তা অভাবনীয়।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘আমার ব্রিগেড সমাবেশের দিনই সিবিআই অফিসারদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমরা বাড়ির চা দেওয়ার লোককেও ডেকে নিয়ে গিয়ে জেরা করেছে। সব অপমান আমি সহ্য করেছি। করতে করতে এদের সাহস বেড়ে গেছে। কিন্তু আর নয়। ভয় দেখিয়ে, ধমকি দিয়ে ভাবছে বিজেপি–কে জেতাবে!’ কেন তিনি রাজীবের পাশে দাঁড়ালেন, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘আমি যে প্রশাসন চালাই, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব, ব্যাক্তিগত দায়িত্ব, প্রশাসনিক দায়িত্ব। যে লোকটা কয়েক কোটি লোকের পাহারার দায়িত্বে আছে, তার বাড়িতে এভাবে ওয়ারেন্ট ছাড়া চলে আসবে? আমি ফোর্সের বিপদে পাশে থাকব। ফোর্সের ওপর আঘাত আমি মানব না।’ এরপরেই মমতা প্রশন তোলেন, ‘এরপর কী? ৩৫৫ ধারা? ৩৫৬ ধারা? জনগণের থাপ্পড় কোনওদিন খেয়েছেন? ওটা ভোটের ময়দানে খেতে হয়।’ মমতার কথায়, ‘সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, তদন্তকারী দু–পক্ষই একে অপরকে ডেকে আপোসে (মিউচুয়ালি) কথা বলতে পারে। আমার তদন্তের সব আমি তোমায় দেব কেন? যদি প্রয়োজন না থাকে?’ তারপরেই মমতা জানান, তিনি ধর্মতলায় ধর্নায় বসছেন। সেই অনুযায়ী তাঁর সোমবারের কর্মসূচিরও রদবদল করেন। জানিয়ে দেন, রাজ্য বাজেটের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকও প্রয়োজনে ধর্নামঞ্চের পাশে করে নেবেন। তার মধ্যেই কলকাতা পুলিশের পদস্থ অফিসার প্রবীণ ত্রিপাঠী জানিয়ে দেন, সিবিআইয়ের দলটি কোনও প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেনি। যা উড়িয়ে দিয়ে সিবিআই জানায়, তাদের কাছে সমস্ত নথি ছিল। এরপর যা হওয়ার আইনগতভাবেই হবে। ততক্ষণে সিবিআইয়ের কলকাতা ও বিধাননগরের দপ্তরের সামনে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়ে গেছে। তার মধ্যেই সংবাদমাধ্যম জানায়, সিবিআইয়ের অধিকর্তা নাগেশ্বর রাও জানিয়েছেন, সংস্থার তদন্তকারী অফিসারদের সঙ্গে তাঁরা কথা বলবেন। কিন্তু রাত পর্যন্ত মমতা ধর্নায় বসে আছেন। তাঁর পাশে আছেন রাজীব কুমার–সহ রাজ্য ও কলকাতার পদস্থ পুলিশ অফিসাররা। আসছেন মন্ত্রী এবং তৃণমূলের অন্য নেতারাও। প্রসঙ্গত, শনিবার খবর প্রকাশিত হয় রাজীব কুমারকে গ্রেপ্তার করতে পারে সিবিআই। রবিবার সকালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি টুইট করেন, কলকাতা পুলিশও এ ধরনের খবর অসত্য ও ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যমূলক বলে জানায়। বিকেলে অতিরিক্ত নগরপাল জাভেদ শামিম সাংবাদিক বৈঠক করেন, সেখানে তিনি জানান— কিছু সংবাদ মাধ্যমে অসত্য, ভিত্তিহীন এবং মানহানিমূলক খবর ছড়ানো হয়েছে। এ ধরনের খবরে কোনও সত্যতা নেই, কোনও তথ্যও নেই। ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে হেয় করতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই কাজ করা হয়েছে। যারা এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ করেছে সেই সমস্ত সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিন বিকেলের পর থেকেই সিবিআই–‌ কলকাতা পুলিস বিবাদ তুঙ্গে ওঠে। পারস্পরিক দোষারোপের পালা চলে। কলকাতা পুলিশের গুণ্ডা দমন শাখার অফিসাররা সিবিআই–‌এর আধিকারিকদের নিয়ে থানায় নিয়ে চলে যান। সেখানে তাঁদের বসিয়ে রাখা হয়। উপনগরপাল (‌দক্ষিণ)‌ মিরাজ খালিদ–‌সহ আরও ২ জন উপনগরপাল শেক্সপিয়র সরণি থানায় চলে আসেন। সিবিআই কী চিঠি নিয়ে গিয়েছিল নগরপালের বাড়ি তা অবশ্য জানা যায়নি। সিবিআই–‌এর অভিযোগ, ডিএসপি তথাগত বর্ধনের কলার ধরে টানা হয়েছে। সিবিআই দিল্লিতে গোটা বিষয়টি জানাবে বলে জানিয়েছে। নগরপালের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির চারপাশে গার্ডরেল দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে। এমনকি সংবাদ মাধ্যমকেও বাড়ির থেকে অনেক দূরে থাকতে বলা হয়েছে। শেক্সপিয়র সরণি থানা পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। আশেপাশে কাউকেই যেতে দেওয়া হচ্ছে না। দীর্ঘক্ষণ ধরে সিবিআই–‌কলকাতা পুলিস টানাপোড়েন চলে। যদিও সিবিআই–‌এর তরফ থেকে সরকারিভাবে জানানো হয়নি কেন নগরপালের বাড়িতে তারা গিয়েছিলেন। এক সময় পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে যেখানে প্রতি মুহূর্তে ঘটনাক্রম বদলাতে থাকে। সিবিআই অফিসারদের থানায় নিয়ে বসিয়ে রেখে কেন তারা নগরপালের বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন তাই নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top