সব্যসাচী সরকার, বিপ্লব সরকার: সোমবার বিকেল ৫টার পর থেকে কলকাতা–সহ গোটা রাজ্যই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। লকডাউনের প্রথম দিন সকাল থেকেই একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল গোটা রাজ্যের সঙ্গে কলকাতাও। এরই মধ্যে ঘোষণা হয়েছে, লকডাউন চলবে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। স্বাভাবিকভাবেই মঙ্গলবার বিকেলের পর থেকে একেবারে জনমানবশূন্য এক ভূখণ্ড হয়ে পড়ে রইল কলকাতা। কলকাতা ও জেলার চিত্র এদিক থেকে দেখতে গেলে প্রায় এক। মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মানুষের কোনও সাড়াশব্দ (‌যদিও গাড়িঘোড়া, মানুষজনের কোলাহল ছাপিয়ে আবার শোনা গিয়েছে নানা ধরনের পাখির ডাক)‌ নেই। তারপর বাজারের দিকে ছুটেছে মানুষ। বাজারফেরত মানুষের জটলা পাড়ার মোড়ে মোড়ে। ওষুধের দোকানে লম্বা লাইন। কলকাতা লাগোয়া হাওড়া জেলার এই ছবি হুবহু মিলে গিয়েছে কলকাতার সঙ্গে। ১১টার পর থেকে আবার লোকজন ঘরে ঢুকে পড়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকে ঘোষণা করা হয়েছে ঘরে চলে যেতে। সর্বত্রই তৎপরতা দেখা গেছে পুলিশের। সোমবার বিকেল ৫টার পর থেকে মঙ্গলবার সন্ধে পর্যন্ত লকডাউন অমান্য করার জন্য কলকাতায় ১,০০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে দক্ষিণ কলকাতায় (‌২১৭)‌, সবচেয়ে কম পূর্ব কলকাতায় (‌৮ জন)‌।
হাওড়া ও শিয়ালদা স্টেশন চত্বর একেবারে শুনশান। গেটে বড় বড় তালা। হাওড়া সেতুর দু’‌দিকেই ব্যারিকেড দিয়ে আটকানো। পুলিশ রয়েছে মাস্ক পরে। গাড়ি দেখলেই দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দুপুরের পর থেকে একটি মানুষেরও দেখা পাওয়া যায়নি। বড়বাজার, ক্যানিং স্ট্রিটের অলিতে–গলিতে। মন্দিরের গেটেও ঝুলছে তালা। বাইক নিয়ে দু–চারজন যাতায়াত করছিল বটে, তাদের আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ধর্মতলায় দেখা গেল সরকারি বাস থেকে ৪ জন লোক নামলেন, ৩ জনই পুলিশকর্মী। এটিএম কাউন্টারগুলিতেও লোক নেই। লেনিন সরণি ফাঁকা। পি জি হাসপাতালের সামনে রোগীদের বাড়ির লোকজনের ভিড়। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, গিরিশ পার্ক ইত্যাদি জায়গা জনশূন্য। মেডিক্যাল কলেজের সামনে রোগীর আত্মীয়দের ভিড়। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে নিস্তব্ধ বাড়িগুলি দাঁড়িয়ে আছে। বেলেঘাটা আই ডি হাসপাতালের সামনে কিছু মানুষের জটলা। এই প্রথম কলকাতার পথে কোনও ভিখিরি বা ভবঘুরের দেখা পাওয়া যায়নি।
জরুরি পরিষেবার স্টিকার দেওয়া কিছু কিছু গাড়ি ছুটছে। মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টা থেকে কলকাতা বিমানবন্দর বন্ধ হয়েছে তাই একেবারে দু’‌হাত ছড়িয়ে পড়ে আছে ভিআইপি রোড। রাস্তায় কেউ হাঁটলে জুতোর শব্দে নিজেই চমকে যাবেন। পিনড্রপ সায়লেন্স গোটা শহরই গ্রাস করে নিয়েছে। ভিআইপি রোড ধরে সল্টলেকে ঢোকার বেইলি ব্রিজ দিয়ে ডানদিকে আসতেই ফাঁকা গাছতলা। তালা বন্ধ চায়ের দোকান। এই গাছতলার নীচেই ছিল রিকশাস্ট্যান্ড। সল্টলেক পার হয়ে করুণাময়ীর দিকে আসতে অফিসপাড়ার নিস্তব্ধতা যেন আরও বেড়ে গেল।
যে সেক্টর ফাইভ সকাল থেকেই জেগে থাকে, গাড়ি, বাইক আর তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের কোলাহলে‌ সেখানে দু–‌চারটি পাখির ডাক। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া ভবঘুরে কুকুরের হাইতোলা ছাড়া আর কোনও ছবি নেই।
কলকাতার মানুষজন জোরে কথা বলাও বোধহয় ভুলে গেছে। রাতে উঁচু উঁচু বাড়ির কিছু কিছু ঘরে আলো দেখা যায়। অনেক ঘরের আলোই নেভানো। কান পেতে শুনলে মাঝে মাঝে টিভির শব্দ ভেসে আসে।
কলকাতা এখন দু’‌বেলা জাগে। সকালে একদফা। সন্ধের পর খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ার আগে যতটুকু জেগে থাকা যায়। রাস্তায় মাস্কবাঁধা পুলিশের বুটের শব্দ আর হঠাৎ হঠাৎ শিহরিত করে, দূর থেকে ছুটে আসা অ্যাম্বুল্যান্সের শব্দ ছাড়া কানে কিছু আসে না।
শহরের এই নীরবতাকে প্রতিজ্ঞা কিংবা সাধনা—‌ যে কোনও নামেই ডাকা যায়।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top