সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়- ক্লাস সিক্সের আদি সকাল থেকেই ব্যস্ত। দাদুভাইয়ের চুল ছেঁটে দিতে হবে! সত্তরোর্ধ্ব দাদুভাইয়ের চুল বড় হলে খুব অস্বস্তি। ইন্টারনেটে ভিডিও ক্লিপিং দেখে কাঁচি জোগাড় করে বসেছে দাদুর চুল ছাঁটতে। শুধু চুল ছাঁটা নয়, গাছে জল দেওয়া, অনলাইনে কাগজ পড়া, গল্পের বই পড়া— সবেতেই এখন দাদুর ছায়াসঙ্গী আদি। স্কুল, টিউশন, ক্যারাটে, টেনিসের ব্যস্ততায় দাদুর সঙ্গে প্রায় দেখাই হত না। বিপত্নীক দাদু থাকতেন আড়ালে, আয়ার তত্ত্বাবধানে। প্রাক্তন রেলকর্মী মন্মথ চ্যাটার্জি তাই লকডাউনে বেজায় খুশি। নাতিকে সর্বক্ষণ কাছে পাবেন, কোনও দিন ভাবেননি। জানালেন, ‘‌কোনও কাজে উৎসাহ পেতাম না। সারাদিন শুয়ে–‌বসেই কাটত। অনেক বছর পর আবার শার্লক হোমস, রাস্কিন বন্ড, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্পের বই নামিয়েছি। নাতিকে পড়ে শোনাতে হবে যে !
কলেজপড়ুয়া দিঠি চারতলা থেকে নেমে ঠাকুমার দোতলার ফ্ল্যাটেই আস্তানা গেড়েছে। ঠাকুমা ৮৬। কোলোস্টমি হয়েছে। আয়া আসতে পারছে না। তাই ছোটখাট সাহায্য ছাড়াও সারাক্ষণ বকবক করে ঠাকুমাকে খুশি রাখাও দিঠির চ্যালেঞ্জ। টেলিভিশনে লাগাতার করোনার খবর শুনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে না পড়েন ঠাকুমা আরতি চৌধুরি, তাই নিয়ে সজাগ দিঠি। ধাঁধা, শব্দছক— ঠাকুমাকে ব্যস্ত রাখার রুটিন বানিয়ে ফেলেছে। সকালে কাগজ পড়ে শোনায়। তারপর ভিডিও চ্যাটে পিসি, জ্যাঠার সঙ্গে কথা বলায়। নাতনির থেকে আরতিদেবী রপ্ত করে ফেলেছেন হোয়াটসঅ্যাপ,  ফেসবুক। প্রাক্তন স্কুলশিক্ষিকা ঠাকুমা চনমনে, রোগভোগ ভুলে হাস্যময়ী।
বিজয়গড়ের টিপু লকডাউনের ঠিক আগেই ঠাকুমা–দাদুকে চেতলার বাড়ি থেকে ও দিদাকে ম্যুর অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাট থেকে নিয়ে এসেছে। বছর সতেরোর টিপুর বাবা কর্মসূত্রে ভিনরাজ্যে। তাই সবাইকে নিয়ে জমজমাট বাড়ি। টিপুর কাজ খুনসুটি ও ইয়ার্কি করে সবাইকে মাতিয়ে রাখা। সন্ধেয় নেটফ্লিক্সে সিনেমা।
বেঙ্গালুরুবাসী স্নিগ্ধাও দুবেলা ভিডিও চ্যাটে দাদু–‌ঠাকুমার মন ভাল রাখার চেষ্টা করছে। ঠাকুমা মিনতি ভট্টাচার্য জানালেন, ‘‌কলকাতায় দুই বুড়ো–‌বুড়ি ঘরবন্দি। নাতনি স্নিগ্ধা‌ই ওয়েসিস। চ্যাট করে, গল্পও পড়ে শোনায়। ’‌
মনোবিদ জয়িতা সাহার মতে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির কারণে নাতি–‌নাতনিরা ঠাকুমা–‌দাদুর স্নেহ থেকে বঞ্চিত। লকডাউনের কারণে তারা যদি ঠাকুমা–‌ দাদুর সঙ্গে কাটাতে পারে, তাহলে সবারই মানসিক স্বাস্থ্য ভাল থাকবে। সমাজতত্ত্বের অধ্যাপিকা অনীতা মুখোপাধ্যায়ের মতে, যে কোনও সঙ্কটে মানুষ সঙ্ঘবদ্ধ হয়। একে অপরের ওপর নির্ভর করেই বিপন্মুক্ত হয়।

দাদু, ঠাকুমার সঙ্গে গড়িয়ার বাড়িতে ঝিনুক।

জনপ্রিয়

Back To Top