‌সোহম সেনগুপ্ত: আইনজীবী স্বামীকে খুন করে সে রাতেই নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে অনিন্দিতা পাল (‌দে)‌ লিখেছিল ‘‌বিয়ে হল গণশৌচালয়ের মতো’‌। গুগল সার্চে গিয়ে মাঝে মাঝেই ‘‌লিগেচার মেটেরিয়াল’–‌এর খোঁজ করেছিল সে। এছাড়াও স্বামী রজত দে সম্পর্কে নানা বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য লিখত হোয়াটসঅ্যাপে। শেষ পর্যন্ত নিউ টাউনের আইনজীবী রজত দে খুনে তাঁর আইনজীবী স্ত্রী অনিন্দিতা পাল (দে)–কে সোমবার দোষী সাব্যস্ত করলেন বারাসত আদালতের ফাস্ট ট্র্যাক থার্ড কোর্টের বিচারক সুজিতকুমার ঝা। ১৬ সেপ্টেম্বর বুধবার এই মামলার সাজা ঘোষণা করবে বারাসত আদালত।  প্রায় দশ মাস বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জামিন পায় অনিন্দিতা। স্বামী–‌স্ত্রী দুজনেই ছিল আইনজীবী। এই মামলায় ৩১ জন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। 
এই মামলার সরকারি আইনজীবী বিভাস চ্যাটার্জি জানান, ৩০২ (খুন) ও ২০১ (প্রমাণ লোপাট) ধারায় অনিন্দিতাকে রজত দে খুনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ইলেকট্রনিক্স তথ্য ও মেডিক্যাল পরীক্ষার যাবতীয় (‌প্রায় ৬০টি)‌ তথ্য তিনি আদালতে তুলে ধরেছিলেন। মোবাইলের চার্জারের তার পেঁচিয়েই যে রজতকে খুন করা হয়েছিল তা তদন্তে প্রমাণিত বলেও জানান তিনি। তাই বিরল এই খুনের মামলায় তিনি দোষী অনিন্দিতার সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি চাইবেন বলেও জানান। তিনি বলেন, ‘‌হোয়াটসঅ্যাপে রজতের সঙ্গে অনিন্দিতার বাক্য বিনিময়ে স্পষ্ট, অনিন্দিতা তাঁর কাছে ডিভোর্স চেয়েছিল। রজত খুনের আগের মুহূর্তের হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য থেকে জানা গেছে, সেইসময় রজত ও অনিন্দিতা একসঙ্গেই বাড়িতে ছিল। রজত হোয়াটসঅ্যাপে অনিন্দিতাকে লিখেছিল, ‘‌তোমায় ডিভোর্স দিলে তুমি তো আর একজনকে বিয়ে করে নেবে। তখন আমার ছেলের কী হবে?‌’‌ এই সব তথ্যই আদালতে জমা পড়েছিল বলেও জানান বিভাস।
আদালতের এই রায়ে খুশি নিহত রজত দে–র বাবা সমীরকুমার দে–সহ রজতের আত্মীয়স্বজন বন্ধু–বান্ধব সকলেই। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আদালতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে অনিন্দিতা। তার আইনজীবী জ্যোতির্ময় অধিকারী এদিন আদালতে জানান, এই রায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা উচ্চ আদালতে যাবেন। অনিন্দিতার ফাঁসি দাবি করেছেন নিহত রজতের বাবা সমীরকুমার দে–ও। সমীরবাবু জানান, তিনি প্রথম থেকেই বলে আসছেন তাঁর ছেলেকে পরিকল্পনা করেই খুন করে অনিন্দিতা। তাই তিনি অনিন্দিতার ফাঁসি চান।  
২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর রজতের নিউ টাউনের বাড়ি থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দেহ উদ্ধারের পর রজতের স্ত্রী অনিন্দিতা বারেবারেই বলেছে, স্বামী আত্মঘাতী হয়েছে। কিন্তু পুলিশের মনে তখন থেকেই সন্দেহ ছিল, একজন ব্যক্তি মোবাইলের চার্জার গলায় পেঁচিয়ে সোফায় বসে নিজে নিজে কী করে আত্মঘাতী হয়?‌ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে রজতের মাথায় দু জায়গায় আঘাতের চিহ্নও ছিল। সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে অনিন্দিতা অন্য ঘরে ঘুমোতে গিয়েছিল। রজতের উপার্জনের প্রসঙ্গ নিয়েও নানা সময়ে নানা কথা বলত অনিন্দিতা। সেদিন রাতেও তর্কাতর্কি হয়েছিল। ভোরবেলায় রজতের ঘরেই মৃতদেহ উদ্ধার হয়। তারপরেই অনিন্দিতা বিচিত্র তথ্য দেওয়া শুরু করে।
রজতের পরিবারের পাশাপাশি তার আইনজীবী বন্ধুরাও এই খুনে অভিযুক্তের শাস্তির দাবিতে সরব হন। নিহত রজতের বাবা সমীরকুমার দে–র অভিযোগের ভিত্তিতে ১ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় অনিন্দিতাকে। ১৬ সেপ্টেম্বর, বুধবার এই মামলায় অনিন্দিতার কী সাজা হয় এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন নিহত রজতের পরিবার ও বন্ধুরা। 
এদিকে অনিন্দিতার ফাঁসির দাবিতে এদিন বারাসত আদালত চত্বরে বিক্ষোভ দেখান আইনজীবীদের একাংশ। অনিন্দিতার ফাঁসির দাবিতে স্লোগানও তোলেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য রজত খুনের পর থেকে কোনও অনুতাপ দেখা যায়নি অনিন্দিতার চোখেমুখে। ঠান্ডা মাথাতেই খুন করা হয়েছে তাঁদের সহকর্মী রজতকে। ‌‌এদিন অবশ্য আদালতের রায় শোনার পর এজলাসেই কান্নায় ভেঙে পড়ে অনিন্দিতা।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top