আজকালের প্রতিবেদন: মধ্যরাতে প্রবল গতিতে ছুটে চলা জাগুয়ার একটি মার্সিডিজে ধাক্কা মেরে পিষে দিল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের কর্ত্রীকে। মৃত্যু হয় তাঁর সঙ্গে থাকা বাংলাদেশি নাগরিক এক যুবকেরও। একটু দূরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান তাঁদের সঙ্গী। শুক্রবার গভীর রাতে শেক্সপিয়র সরণি ও লাউডন স্ট্রিটের সংযোগস্থলের ঘটনা। জাগুয়ারের চালক, চেন রেস্তোরাঁ আরসালানের মালিকের ছেলে আরসালান পারভেজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে জামিন–অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। মধ্যরাতের এই ঘটনা ফিরিয়ে আনল ৩ বছর আগে রেড রোডের সাম্বিয়া–কাণ্ডের স্মৃতি।
পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার রাত পৌনে ২টো নাগাদ শেক্সপিয়র সরণি ও লাউডন স্ট্রিটের সংযোগস্থলে একটি পুলিশ কিয়স্কের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কুষ্ঠিয়ার বাসিন্দা ফারহানা ইসলাম তানিয়া (‌৩০)‌ এবং ঝিনাইদহের কাজি মহম্মদ মইনুল ইসলাম (‌৩৬)‌। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের বন্ধু শফি রহমতুল্লাহ জিহাদ। তিনি ছিলেন একটু দূরে। হঠাৎ প্রবল গতিতে ছুটে আসা একটি জাগুয়ার রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটি মার্সিডিজকে ধাক্কা মারে। ধাক্কায় দুমড়ে যায় মার্সিডিজের মাঝের অংশ। তার পর জাগুয়ারটি ফুটপাথের পাশে থাকা পুলিশ কিয়স্কে ধাক্কা মেরে তানিয়া ও মইনুলকে পিষে দেয়। ধাক্কা লাগে জিহাদেরও। গুরুতর আহত অবস্থায় ৩ জনকে এসএসকেএমে নিয়ে যাওয়া হলে তানিয়া ও মইনুলকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মাথায় আঘাত পেয়েছেন জিহাদ। ধাক্কার অভিঘাতে পুলিশ কিয়স্কটি ভেঙে যায়। ঘটনায় মার্সিডিজের দুই যাত্রী আহত হন। ঘটনার পর জাগুয়ারের চালক পালিয়ে যান। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শনিবার বিকেলে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থলে যান। খতিয়ে দেখেন দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়ি দুটি ও সেগুলির যন্ত্রাংশ। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত দুটি গাড়িই উচ্চ প্রযুক্তির। গাড়ি দুটির মধ্যে ডেটা রেকর্ডার রয়েছে। সেখান থেকেই গাড়ির গতিবেগ, সঙ্ঘর্ষের সময় সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করা হবে। ঘটনার আগে–পরে প্রবল বৃষ্টি হয়েছিল। সেই কারণে রাস্তা থেকে প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া মুশকিল হচ্ছে। প্রয়োজনে এলাকায় থাকা সিসি টিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হবে।
ঘাতক জাগুয়ার গাড়িটি আরসালান চেন রেস্তোরঁার নামে। গাড়ির তথ্য খতিয়ে দেখেই আরসালান পারভেজকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আদালতে আরসালানকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হবে। কারণ, ধৃত ব্যক্তি গভীর রাতে সেই সময় কোথা থেকে আসছিলেন, অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন কেন, কীভাবেই বা দুর্ঘটনা ঘটল— এ সব যেমন জানার প্রয়োজন রয়েছে, ঘটনার সময় গাড়ির চালক মত্ত ছিলেন কি না, সেটাও জানা দরকার। তাই পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ পেতেই ধৃতকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়া দরকার।

জানা গেছে, ধৃতরা দুই ভাই। দু’‌জনেই বিদেশে পড়াশোনা করতেন। আরসালান এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টের পাঠ নিয়ে দেশে ফিরেছেন। বেকবাগানের কাছে আরসালান পারভেজদের পারিবারিক বাড়ি। তবে তিনি ওই বাড়িতে থাকেন না। সায়েন্স সিটি লাগোয়া একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। জাগুয়ারটি রাখা থাকত বেকবাগানের বাড়িতে। ঘটনাটি নিয়ে আরসালানদের পরিবারের কেউ কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি রেড রোডে সাধারণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে সেনাবাহিনীর মহড়া চলছিল। সেই সময় নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে প্রবল গতিতে রেড রোডে ঢুকে পড়ে একটি সাদা রঙের অডি কিউ–৭ গাড়ি। বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান বায়ুসেনা কর্মী অভিমন্যু গৌড়। পালানোর সময় আরও এক সেনাকর্মীকে ধাক্কা মেরে রেস কোর্সের কাছে গাড়ি ফেলে পালিয়ে যায় ওই গাড়ির চালক এবং আরোহীরা। পরে ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে প্রাক্তন বিধায়ক এবং বড়বাজারের ফল ব্যবসায়ী মহম্মদ সোহরাবের ছোটছেলে তৌসিফ ওরফে সাম্বিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দুই বন্ধুকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
বছর দুয়েক আগে প্রবল গতিতে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়েন অভিনেতা বিক্রম চট্টোপাধ্যায়। ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর বান্ধবী, মডেল সনিকা সিং চৌহানের।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top