নীলাঞ্জনা সান্যাল: একক ও নীরব আন্দোলন। আন্দোলন পরিবেশ রক্ষার। আন্দোলন প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে। লড়ছেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। গত একমাস ধরে তিনি করছেন অবস্থান। এখনও পর্যন্ত কোনও সাড়া মেলেনি। পাশে পাননি কাউকে। তা হোক, পরিবেশের জন্য এই লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র হতোদ্যম হয়ে পড়েননি এই তরুণ। কলকাতা শহর বিবিধ আন্দোলনের সাক্ষী। এই একক আন্দোলন সেই ইতিহাসে অবশ্যই এক নতুন মাত্রা যুক্ত করল।  
ছাত্রটির নাম আরিয়ান অগ্রহারী। স্নাতক অর্থনীতির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। থাকেন হিন্দু হস্টেলে। নিজের বা সহপাঠীদের লেখাপড়াকে সমস্যায় ফেলে নয়, সপ্তাহে দুটি রাত তিনি ক্যাম্পাসে এসে জাগছেন। দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়কে প্লাস্টিকমুক্ত করতে হবে। প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাতে হস্টেল থেকে বিছানার চাদর নিয়ে চলে আসেন আরিয়ান। পোর্টিকোতে বিছিয়ে বসে থাকেন সারা রাত। বই পড়েন। পাশে রাখা থাকে পোস্টার। সেখানে লেখা ‘‌পরিবেশের এই সঙ্কটে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাঙ্গণ হোক প্লাস্টিকমুক্ত।’‌ 
সাড়া নেই কর্তৃপক্ষের। আরিয়ানের পাশে, তাঁর এই পরিবেশ আন্দোলনে, নেই তাঁর কোনও বন্ধু, সহপাঠী। নেই কোনও সিনিয়র দাদাও। নানা দাবিতে নানা সময় উত্তাল হয়েছে প্রেসিডেন্সি। কখনও হাজিরা না থাকলেও পরীক্ষার বসার দাবিতে, কখনও হিন্দু হস্টেল ফেরত চেয়ে— আরও কত দাবি। কিন্তু যে দাবিকে সামনে রেখে গত একমাস ধরে পোর্টিকোয় চাদর বিছিয়ে ‘‌অবস্থান’‌–এ বসে থাকছেন আরিয়ান, সেই আন্দোলন কখনও দেখেনি প্রেসিডেন্সি।
শুধু প্রেসিডেন্সি কেন, এ শহরের তাবড় পরিবেশবিদরাও রাখেন না কোনও খবর। সম্ভবত, আরিয়ান কোনও ‘‌প্রচার’–এ নেই বলে সে একা। শুধু প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাসই নয়, আরও দুটি দাবি আছে আরিয়ানের— ১.‌‌‌ ক্যাম্পাসে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, ২.‌‌‌ প্রেসিডেন্সিতে বসানো হোক পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ। পুরুলিয়ায় বাড়ি আরিয়ানের। থাকেন হিন্দু হস্টেলে। বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাত ১০টা থেকে পোর্টিকোয় ধর্নায় বসেন তিনি। সকাল ৬টায় উঠে হস্টেলে ফিরে আসেন। গত দু’‌সপ্তাহ হল রাতে ঢুকতে দেরি হওয়ায় ক্যাম্পাসের গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টপকে ঢুকতে হচ্ছে তাঁকে। 
হঠাৎ এই ধরনের দাবিতে ধর্নায় বসার কারণ হিসেবে আরিয়ানের বক্তব্য, ‘‌পরিবেশ নিয়ে এখনই কিছু না ভাবলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। বাইরের পৃথিবীটা বদলানোর আগে নিজের ক্যাম্পাস বদলানোটা বেশি দরকার বলে মনে হয়েছিল। নিজের জায়গাটা বদলাতে পারলে গেটের বাইরে গিয়ে পাঁচজনকে সেটা বলতে পারব।’‌ ঘরে বসে ‘‌বদলাতে হবে’‌ এটা বলার চেয়ে কাজে সেটা করাতেই বেশি বিশ্বাসী আরিয়ান। বললেন, ‘‌আমার মা বলেন, ঘরে বসে শুধু প্রার্থনা করলে হবে না, মাঠে নেমে কাজটাও করতে হবে।’‌ ‘‌পরিবেশ বাঁচাও’‌ বলে বসে থাকলে হবে না। নিজেকে কয়েকটা গাছও লাগাতে হবে। তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। বিশ্ব জুড়ে পরিবেশ নিয়ে আলোচনা চলছে। ৫০ বছর পর প্লাস্টিক থেকে কী ক্ষতি হতে পারে, হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রভাব, সম্প্রতি জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস আমাজন—পরিবেশের কথা এখন না ভাবলে আর কবে ভাবব?‌’‌ পাশে কোনও বন্ধুর না থাকা নিয়ে বলেন, ‘‌চেষ্টা করেছিলাম। দাবিগুলো লিখে বিলিও করেছিলাম। সবাই জিজ্ঞাসা করে এখনও বসে থাকি কিনা। কিন্তু কেউ পাশে বসতে আসেনি।’‌ আরিয়ানের এই ধর্না একমাস ধরে চললেও জানেন না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ডিন অফ স্টুডেন্টস অরুণ মাইতি বলেন, ‘‌এ ব্যাপারে কিছু জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখব। ছেলেটিও কিছু জানায়নি। তবে ক্যাম্পাসকে প্লাস্টিকমুক্ত করতে প্রচার চালানো হয়। বিষয়টি ডিসপ্লেও করা আছে। ক্যান্টিন মালিকদেরও প্লাস্টিক ব্যবহার না করতে বলা হয়।’‌ ‌

জনপ্রিয়

Back To Top