সঙ্ঘমিত্রা মুখোপাধ্যায়
১ জুলাই থেকে খুলে দেওয়া হল রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবর সংলগ্ন পার্ক। প্রাতর্ভ্রমণকারীদের জন্য। কিন্তু সাঁতার–‌প্রেমীদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না এখনও। রবীন্দ্র সরোবর সংলগ্ন চারটে সাঁতারের ক্লাব এমনকী ফ্রি সুইমিং  পুলও পুরো বন্ধ। সুভাষ সরোবরের সাঁতারের ক্লাবও তালাবন্দি। শহরের ছোট বড় সব সুইমিং পুলই এখন শুকনো। করোনার প্রকোপ যে হারে বাড়ছে, তাতে এই মরশুমে সাঁতারের ক্লাবগুলো খোলার অনুমতি মিলবে কিনা— সে বিষয়ে সন্দিহান সব ক্লাব কর্তৃপক্ষই। 
অ্যান্ডারসন ক্লাবের আজীবন সদস্য অনিরুদ্ধ চন্দ রবীন্দ্র সরোবরে প্রাতর্ভ্রমণের ফাঁকে জানালেন, ‘‌প্রায় চল্লিশ বছর ধরে সাঁতার কেটে দিন শুরু করি। এই প্রথম সাঁতারের মরশুমে একবারও জলে নামার সুযোগ পেলাম না। সাঁতার না কাটলে শরীরচর্চা যেন সম্পূর্ণ হয় না। শরীর ভারী লাগে।’‌ ক্লাবের কর্মকর্তা অমিত বসুর কথায়, ‘‌প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন এই ক্লাবের ইতিহাসে এমন শুখা মরশুম এই প্রথম। ২০২২ সালে ক্লাবের শতবর্ষ। নানা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ছিল। সব এখন অথৈ জলে।’‌ অ্যান্ডারসনের দুটি জলাশয়েই এখন মেরামতির কাজ চলছে। নতুন করে সেজে উঠতে মাসখানেক লাগবে। প্রশাসনের নির্দেশ মতোই এই ক্লাব আবার তাদের সাঁতারের প্রশিক্ষণ শুরু করবে। প্রশিক্ষণ ছাড়াও এখানে নানারকম প্রতিযোগিতা হয়। সব বন্ধ। জেলা স্তরের সাঁতারুদের অবশ্য অ্যাডভান্স প্রশিক্ষকরা কখনও অনলাইনে কখনও বা গঙ্গায় নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই। আট থেকে বাইশ বছরের বেশ কয়েকজন প্রতিযোগী জেলা স্তরের প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হচ্ছেন। 
মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর সাঁতারের মরশুম। সকাল ৬টা থেকে বেলা ১২টা, আবার বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা গমগম করে রবীন্দ্র সরোবর সংলগ্ন প্রত্যেকটি পুল। শুধু অ্যান্ডারসনেই রোজ আসতেন হাজার চারেক শিক্ষার্থী। সাঁতার শেষে চা–‌কফির কাপে তুফান তুলতেন। মহিলাদের ছিল আলাদা আড্ডার ঠেক। এখন সব শুনশান। কলকাতা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন, লেক ফ্রেন্ডস ক্লাব —একই ছবি। জল শুকিয়ে রাখা হয়েছে। নিয়মিত ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার হচ্ছে। চলছে স্যানিটাইজেশনও। ক্লাবের স্থায়ী কর্মীরা বেতন পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু অস্থায়ী প্রশিক্ষকরা পড়েছেন বিপাকে। মাসের পর মাস সাঁতার বন্ধ থাকায় রুটি–‌রুজির কারণে অন্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সাদার্ন অ্যাভিনিউ সুইমিং পুলের প্রশিক্ষক মিঠু দাসের কথায়, ‘‌বাচ্চাদের সাঁতার শিখিয়ে যে আনন্দ, তা তো অন্য কাজে পাওয়া যায় না। পেট চালাতে অন্য কাজ করতে হলেও মন পড়ে থাকে পুলেই।’‌
কলেজ স্কোয়‌‌্যারে সুইমিং ক্লাবের সহকারী সম্পাদক সন্তোষ দাসের বক্তব্য, ‘‌সাঁতার প্রশিক্ষণ থেকেই ক্লাবের প্রধান আয়। এই মরশুমে যা পুরোপুরি বন্ধ। এভাবে চললে ঘাটতি মেটানো খুব মুশকিল। স্থায়ী প্রশিক্ষকদের বেতন দিতে হচ্ছে। পুল সংস্কারের কাজও করতে হবে। হাজার খানেক ছেলেমেয়ে এখানে সাঁতার শিখত। ওয়াটার পোলো ছাড়াও কত প্রতিযোগিতা হত। এখন সব বন্ধ।’‌
কলেজ স্কোয়‌‌্যারের ওয়াইএমসিএ সুইমিং ক্লাবের আজীবন সদস্য মোহন সরকার অবশ্য আশাবাদী। জানালেন, ‘‌আশা রাখি করোনার প্রকোপ কেটে গিয়ে ছেলেমেয়েরা শিগগিরই আবার জলে নামতে পারবে। জল আবার সরগরম হবে কচিকাঁচাদের দাপাদাপিতে।’‌ সুভাষ সরোবরের এক সত্তরোর্ধ্ব আশাবাদী সাঁতারু (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) রবি–‌সকালে সুভাষ সরোবরে সাঁতরে বেড়াচ্ছিলেন। সুইমিং পুল বন্ধ তাতে কী? অনায়াসে পেরিয়ে গেলেন সরোবরের প্রায় ২০০ মিটার। ভারী জলের উথাল–‌পাথাল, মাছ ও পানকৌড়ির অবিরাম হুটোপুটি ওঁর সাঁতার– পথে বাধা সৃষ্টি করেনি।

জনপ্রিয়

Back To Top