অদিতি রায়- বইমেলায় চা, কফি, কোল্ডড্রিঙ্কস চলতে পারে। কিন্তু নেশাজাতীয় পানীয় তো বটেই, ধূমপানও নিষিদ্ধ। তা বলে দামাল কবির দল সে–কথা শুনবে কেন!‌ কফি হাউসের ঠেক এই ক’‌দিন তো বইমেলা চত্বরেই। আর সুখটান তো দিতেই হবে!‌ কোথায়?‌ কীভাবে?‌ এক কবি ঘোষণা করলেন, বেশি লুকোচুরির দরকার কী?‌ ‌প্রদীপের তলাতেই তো অন্ধকার!‌ দেখা গেল ওই চত্বরে রাজ্য পুলিসের ওয়াচ টাওয়ারের নিচে আধা অন্ধকারে ঠোঁটে ঠোঁটে জ্বলে উঠল আলোর ফুলকি, গোলাকার ধোঁয়া উড়িয়ে দিল দৈনন্দিন গ্লানি, হতাশা, সংগ্রাম। গল্পে, আড্ডায়, কবিতায় জমে উঠল সোমবার সন্ধের বইমেলা।
আসলে বইমেলার চেহারা ‘স্লিম‌’‌ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু চরিত্র বদলাচ্ছে না। এখনও গিটার কাঁধে সদ্য যুবকের দল একটু জায়গা খুঁজছেন বসে গান গাওয়ার। এখনও স্টলে বা টেবিলে জায়গার তোয়াক্কা না করে একদল কলেজ–পড়ুয়া মাঠেই বসে পড়েছেন লিটল ম্যাগাজিন বেচতে। এখনও নামী প্রকাশন সংস্থার স্টলে তিলধারণের জায়গা নেই। এখনও লিটল ম্যাগাজিনের টেবিলগুলোর সামনে ‘‌ফাগুন করিছে হা হা’‌, বা বড়জোর দু–একজন ভ্রাম্যমাণ ‘বইমেলা পর্যটক‌’‌, যাঁরা অফিসফেরত একবার টুক করে ঘুরে যাচ্ছেন বইমেলায়, ঠিক কোন বইটা কিনবেন সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে, সাধ আর সাধ্যের টানাপোড়েনে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সেই উপন্যাসটাই কিনে ফেলেন, যেটা থেকে বাংলা সিনেমা হয়েছিল!‌ কে বলুন তো?‌ ধরুন আপনার পাড়ার ঘোষবাবু!‌
‘‌‘‌আসলে ঘোষবাবু হলেন শ’‌য়ে শ’‌য়ে অত্যন্ত সাধারণ মানুষের সারির একটি মুখ’‌‌’‌‌— মুখবন্ধে বলছেন লেখিকা বিদিশা ঘোষ। তাঁর ছড়ার বই ‘ঘোষবাবুর বাবুগিরি‌’‌ পাওয়া যাচ্ছে ‘গাঙচিল‌’‌–‌এর স্টলে। শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা, বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্রী বিদিশা বীরভূমের একটি গ্রামের স্কুলের শিক্ষিকা। রোজ স্কুটি চালিয়ে পাড়ি দেন কর্মক্ষেত্রে। চোখ আর মন উন্মুক্ত থাকে ওই রাঙামাটির যাত্রাপথে। ‘‌ঘোষবাবু’‌কে হয়তো এভাবেই খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। তবে দুনিয়ার সঙ্গে ‘‌ঘোষবাবু’‌র পরিচয় ঘটান ফেসবুকের মাধ্যমে। ফেসবুক–সাহিত্য যে অবহেলার নয়, এই ছড়ার বইটি তার সার্থক উদাহরণ। ছড়ার ছলে কত ভারী কথা যে সহজেই বলে ফেলা যায়, তা কে না জানে!‌ কাজেই বিদিশার এই ছড়া পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগকে সাধুবাদ। তবে প্রকাশকের কাছে একটা ছোট্ট অনুরোধ, বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে বানান এবং প্রোডাকশনের গুণমানের ওপর আর একটু যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করবেন।
ভাষালিপি থেকে প্রকাশিত হয়েছে নয়ের দশকের কবি বিপ্লব চৌধুরির ‘‌কবিতা সংগ্রহ’‌ এবং কবি রাহুল পুরকায়স্থের ‘‌ভস্ম মাখি/‌মাটিতে শুই’‌। রাহুল পুরকায়স্থের এই বইয়ে কবিতা নেই। রয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কিছু লেখা। পড়তে শুরু করলেই লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো কখন যেন পাঠকেরও হয়ে ওঠে তাঁর কলমের সততায় ও আন্তরিকতায়।
দেখা হল ৪ বছরের অগ্নিস্নাতর সঙ্গে। মায়ের হাত ধরে অক্লান্ত ঘুরছে ডিজিটাল প্রজন্মের ছোট্ট পাঠক। কিনেছে পছন্দের কিছু বইও। হ্যঁা, বইগুলো নিজেই পছন্দ করেছে ও, গর্বের সঙ্গে জানালেন আগামীর মনোজ্ঞ পাঠকটির মা ফিল্মমেকার অনিন্দিতা সর্বাধিকারী। এ প্রসঙ্গেই বলে রাখা ভাল, ‘‌মিত্র ও ঘোষ’‌ প্রকাশন সংস্থার এক অভিনব উদ্যোগের কথা। মূলত প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাঙালি শিশুদের সুবিধার জন্য রোমান হরফে প্রকাশিত হল ‘সহজ পাঠ‌’‌, ‘আবোল তাবোল‌’‌–‌এর মতো কিছু অবশ্যপাঠ্য বই!‌ বিতর্ক থাকতেই পারে এই নিয়ে। কিন্তু লিপির থেকে যে ভাষা জরুরি, কিংবা বাঙালি মাত্রেই যে রবীন্দ্রনাথ বা সুকুমার রায় পড়ে ফেলা অবশ্যকর্তব্য, তা নিয়ে তো তর্কের অবকাশ নেই। ও হ্যাঁ, রোমান হরফের এই বাংলা বইগুলোর পাতায় বাংলা হরফও চেনানো হয়েছে বইকি!‌
১২ বছর ধরে অক্লান্ত নির্ঘুম রাতের সাক্ষী তাঁর কলম। ১২ বছর ধরে গবেষণা করতে করতে শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ লিখে ফেলেছেন ‘‌মহাভারত’। তিনটি খণ্ড আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইমেলায় ‘অভিযান‌’–‌এর স্টলে ওই তিনটির সঙ্গে চতুর্থ খণ্ডটিও পাওয়া যাচ্ছে। ‌‘মহাভারত‌’–‌এর মতো প্রকাণ্ড একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলা তো সহজ–সরল ব্যাপার নয়। কিন্তু শুদ্ধসত্ত্বের কলমের সারল্যে বা তারল্যে ‘মহাভারত‌’‌ সুখপাঠ্য এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সাধারণ পাঠকদের কাছেও।
এবার বইমেলায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জায়গা পায়নি। অতএব ফাঁকতালে বোকাবাক্সের তারকাদের দেখে ফেলাটা ‘‌মিস’‌ করছেন কেউ কেউ!‌ তার ওপর প্রতিবারের মতো এবার খাওয়াদাওয়ারও সেই এলাহি ব্যবস্থা নেই চত্বরে। তাতেও অবশ্য আনন্দে কোনও কমতি নেই। মাঝেমাঝেই ‘আজকাল‌’–‌এর স্টলে ঢুকে পড়ছেন অজস্র মানুষ। বই কেনার পাশাপাশি বিখ্যাত মানুষদের দুর্লভ মুহূর্তের ছবির প্রদর্শনী আকৃষ্ট করছে তাঁদের। কখনও দাঁড়িয়ে পড়ছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবির সামনে, কখনও শাহরুখ খানের একান্ত মুহূর্তের সামনে অপলক!‌
বই, খাওয়াদাওয়া, সাজগোজ, গলা ছেড়ে গান, ভিড়ের একান্তে ভীরু প্রেম— এ সবের মধ্যেই টের পাওয়া গেল এবারের বইমেলাতেও তাঁর উপস্থিতি অমলিন। প্রয়াত কবি উৎপলকুমার বসুর নির্বাচিত রচনাসমগ্র নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘‌সারাৎসার’‌। মনে হল, সাদা ধুতি–পাঞ্জাবি আর মোটা ফ্রেমের চশমায় উৎপলদা মিটিমিটি হাসছেন আর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছেন এই প্রজন্মের কবিদের, দ্যাখ ব্যাটা কার বই বেশি বিক্রি হয়!‌ দেখে নে বইমেলা আজও ৬–‌এর দশকের সেই চার তরুণের দখলে!‌

 

বইমেলায় সোমবার। ছবি— অভিজিৎ মণ্ডল

জনপ্রিয়

Back To Top