প্রচেত গুপ্ত- এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার টাকার বাংলা বই কিনে যে প্রবাসী বাঙালি যুবকটি নিঃশব্দে সোমবার দুপুরে কলকাতা বইমেলা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, তাঁকে কি বইপ্রেমীরা কেউ লক্ষ্য করেছে?‌ রোগাপাতলা, সাদামাঠা চেহারার এই যুবক সোমবার রাতেই হাজির কলকাতা বিমানবন্দরে। মধ্যরাতে মুম্বই যাওয়ার বিমান ধরেছেন।
বইমেলার ৪২ বছরের ইতিহাসে কোনও একজন ব্যক্তি এত টাকার বই কিনেছেন, এমন হিসেব নেই। সেই অর্থে বই কেনার রেকর্ড গড়লেন মহেশ। হ্যাঁ, নাম মহেশ রায়। বয়স তিরিশের সামান্য বেশি। আরও তিন সঙ্গীকে নিয়ে গত তিন দিন ধরে বই কিনেছেন মহেশ। সোমবারই কিনেছেন এক লক্ষ টাকার বই। আগের দিনগুলোতে যত বই কিনেছেন, তার বিল হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট এক লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার বিল তাঁর পকেটে। নীল শার্ট পরা গোবেচারা চেহারার মহেশকে দেখলে বোঝা কঠিন এত বড় রেকর্ড গড়ে ফেলেছেন!‌ তবে আলাপী। সামনে বসে গল্প করতে সব বলে দিলেন। বাংলা ভাল বলেন। হিন্দিতে সড়গড়।
‘‌আমি ২০১৫ সালেও অনেক টাকার বই কিনেছিলাম। সে–‌ও প্রায় দেড় লক্ষ টাকার মতো। তবে এবার সবথেকে বেশি টাকা খরচ করলাম।’‌
সব বাংলা বই?‌
মহেশের উত্তর, ‘‌অবশ্যই বাংলা। অন্য ভাষার বই কিনতে হলে তো দিল্লি বইমেলায় যেতাম!‌’‌
আপনি থাকেন কোথায়?‌
মহেশ বললেন, ‘‌মু্ম্বইতে জন্ম। ওখানেই থাকি।’‌
‌আপনি একা এত টাকার বই কিনলেন?‌
মহেশের জবাব, ‘‌না। আমার সঙ্গে আরও তিনজন এসেছে। সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে কিনলাম।’‌
‌আপনি এখানে থাকলেন কোথায়?‌ কারও বাড়িতে?‌
‌উঠেছি সায়েন্স সিটির কাছে একটা হোটেলে।
‌আপনি কী করেন?‌‌
এবার মহেশ পকেট থেকে ভিজিটিং কার্ড বের করে এগিয়ে দিলেন। সেখানে বড় করে লেখা ‘‌কমল জুয়েলার্স,‌ অ্যান্টিক জুয়েলারি’‌। কার্ডের ওপরে নিজের এবং ‘‌কমল’‌ নামের একজনের মোবাইল ফোন নম্বর। অফিসের ঠিকানাও রয়েছে। এর পরই তাঁকে করা হয় লাখ টাকার প্রশ্ন। লাখ নয়, পৌনে দু’‌লাখ টাকার প্রশ্ন।
‌কী ধরনের বই কিনলেন?‌
মহেশ জানালেন, তিন ধরনের বইয়ের পাহাড় ঘাড়ে নিয়ে তিনি মুম্বই ফিরছেন। আধ্যাত্মিক, জ্যোতিষ এবং এই দুই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানের বই।
এ–‌সব বই নিয়ে কী করেন?‌
‘‌নিজের লাইব্রেরিতে রাখি। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের পড়তে দিই। এই নিয়ে গবেষণা ধরনের কাজ করার ইচ্ছে।’‌
অধ্যাত্মবাদ আর জ্যোতিষ নিয়ে?‌‌
মহেশ মাথা নাড়েন। 
এত বই কী করে নিয়ে যাবেন?‌‌
মহেশের উত্তর,‌ ‘ট্রান্সপোর্ট বুক করেছি। আগের বারও তা–‌ই করেছিলাম।’‌
মহেশকে কীভাবে মেলায় খুঁজে পাওয়া গেল?‌‌ গত বার থেকে মেলায় শুরু হয়েছে ‘‌বই কিনলে লটারিতে ‌গাড়ি’‌। হাজার টাকার বিলের কপি জমা পড়লে লটারিতে অংশ নেওয়া যাবে। যাঁরা এই লটারির বিষয়টি দেখছেন, সোমবার মহেশ তাঁদের কাছে দশ হাজার টাকার বিল জমা দিতে যান এবং জানান, সব মিলিয়ে তিনি প্রায় দু’‌লক্ষ টাকার বিল জমা করতে চান। এর পরই তাঁকে ঘিরে কৌতূহল। এত টাকার বই যিনি কিনেছেন, তাঁকে চট করে চোখের আড়াল করা যায় না। মেলার মাঠ থেকে বেরোনোর আগে তিনি ১৭০টি বিলের কপি জমা দিয়েছেন। মহেশকে প্রশ্ন করা হয়েছিল,‌ ‌আপনি কি এই লটারির কথা জানেন?‌‌
মহেশ বলেন, ‘‌এসে শুনেছি। তার পর বিল জমা দিলাম।’
এত বইয়ের ক্রেতার বিদ্যে কেমন?‌ 
জানা গেছে, খুবই কম। স্কুলও নাকি পেরোননি। ছোটবেলায় লেখাপড়া না করবার দুঃখ আছে। বই কেনার পিছনে এটাও নাকি কারণ। তা বলে শুধুই আধ্যাত্মিক আর জ্যোতিষ?‌
মহেশের উত্তর, ‘‌এই দুই বিষয়ে উৎসাহ আমার।’‌
যাঁরা বইমেলায়‌ গাড়ি–‌লটারির দায়িত্বে, তাঁরা মহেশের নাম–‌ঠিকানা লিখে রেখেছেন। লটারিতে গাড়ি ভাগ্য ছিঁড়লে খবর দেবেন। কিছু দিন আগে আসানসোলের এক বইপ্রেমী এবারের বইমেলা থেকে ৩৮ হাজার টাকার বই কিনে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। মহেশ অনেকটা টপকে গেলেন।

মহেশ রায়। ছবি: তপন মুখার্জি

জনপ্রিয়

Back To Top