শুভাশিস চট্টোপাধ্যায়: এই, তুই কোথায় রে?‌ কতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি!‌ নট্‌ রিচেব্‌ল বলছে!‌ এক্ষুনি আজকালের স্টলের সামনে চলে আয়। হোয়াট্‌সঅ্যাপে ডাক দিতে এভাবেই দেখা হল বইমেলার মাঠে। জোড়া কিংবা দঙ্গলে এভাবেই প্রতিবারই জমে যায় বইমেলা।
একটা ম্যানমেড, আরেকটা নেচার–‌মেড। তবু ভাবুন, কী ভীষণ মিল এই দুইয়ে!‌ বলছি, বইমেলার সঙ্গে বসন্তকালের নিবিড় পিরিত–‌যোগের কথা!‌ বইমেলা এলেই বসন্ত ইন্‌। সে ফুল, হাফ, যা–‌ই ফুটুক। হাতে হাত ধরে আঠেরোর সেল্‌ফি তোলা যদি বইমেলার অঙ্গ হয়, কাঁপা–‌কাঁপা হাতে অশীতিপরের আইসক্রিম খাওয়ার দৃশ্যটিও তবে মনে রাখার মতোই মিষ্টি বই–‌কি!‌ মন–‌ভরানো এই যুগল দৃশ্যের থেকেও অভিভূত হলাম এদিন আরও এক তাক‌–‌লাগানো দৃশ্যে। বইয়ের ডিজিটাল গ্রাস থেকে এখনও যে ছেলেপুলেরা নতুন বইয়ের গন্ধে অপূর্ব আনন্দ অনুভব করে, সেই দৃশ্যই চাক্ষুষ হল রবিবার, মাঘ–‌শেষের ভদ্দুপুরে পদ্য–‌গদ্য–‌প্রবন্ধে ঠাসা এই বইমেলায়। চমকে দিল এক তেমনই কিশোরের বইপ্রেম। হঠাৎই হন্তদন্ত হয়ে সে ছুটে এল অদূরে বসে–‌থাকা তার মা–‌বাবার কাছে। বলল, আমাকে ছশো টাকা দাও তো?‌ বিরক্ত মা বললেন, এত টাকা কী করবি?‌ 
— বই কিনব। 
— এই তো এত কিনলি?‌ 
— আরও একটা কিনব। 
— কী ভেবেছিস কী?‌ এত টাকা কোথায় পাব?‌ এত টাকার বই কিনলে সারা মাস খাব কী?‌ 
নাছোড়বান্দা সে। অগত্যা কিশোরের পায়ে–‌পড়া আবেগের কাছে হার মানলেন বাবা। প্যান্টের লুকোনো পকেট থেকে গুনে–‌গুনে বের করে দিলেন ছশো টাকা। টাকা পেয়েই কিশোরের ছুট্‌ বই কিনতে।
এলোমেলো একাকী হঁাটছি। মনে হল, সামনে যে কলেজপড়ুয়াটি হেঁটে যাচ্ছে, তার সঙ্গেও একবার কথা বললে কেমন হয়?‌ সত্যিই কি সে ছুটে এসেছে বইয়ের টানে?‌ পিঠে তার ব্যাকপ্যাক। হাতে স্মার্টফোন। কানে হেডসেট। বলে বসলাম, খোকন, তুমি আজ কী বই কিনবে?‌ সে বলল, কেন,‌ বই কিনতে যাব কেন?‌ আমি তো স—ব বই অনলাইনে পড়ি!‌
— এমন পড়ায় মজা পাও?‌ 
— খুব পাই। 
— তা হলে বইমেলায় কেন এসেছ?‌
— হুলিয়ে আড্ডা দিতে আর পেট ভরে খেতে। এখনই আমার গার্লফ্রেন্ড আসবে। আড্ডা, খাওয়া, দেন বাড়ি।
কথা না বাড়িয়ে আমি ঢুকে পড়লাম আজকাল স্টলে। এদিনও নজরকাড়া ভিড় ছিল সেখানে। অত্যুৎসাহী পাঠক ধৈর্য ধরে লাইনে দঁাড়িয়েছেন, কিনেছেন বাপুরাম সাপুড়ের তীব্র ব্যঙ্গে মোড়া ‘‌হিং টিং ছট সমগ্র’‌, সত্যম রায়চৌধুরীর ফর ইউ সিরিজ, দেবাশিস দত্তের ‘‌বিরাটইজম’‌, শঙ্খ ঘোষের ‘‌ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ’‌। আর পল্লব বসুমল্লিকের ঋজুদার সঙ্গে তো শেষই হয়ে গেল এদিন। মন খারাপ করে ফিরে গেলেন বহু ক্রেতা–‌পাঠক। এ–‌সবের বাইরেও ‘‌আনন্দধারা’‌, ‘‌মনে রেখো’‌, ‘‌জলছবির রং’‌, ‘‌হেমন্তর গল্প’‌ বইয়েরও বিক্রি এদিন ছিল তুঙ্গে। এদিন বাংলাদেশের স্টলে ছিল ব্যাপক ভিড়।
কী আছে এই বইমেলায়!‌ কেন, প্রতিবার যেমন থাকে!‌ দার্জিলিং টি আছে, ডাটা গুঁড়োমশলা আছে, পি সি চন্দ্র আছে, রঙিন ফুলের মেলা আছে। রাধাবল্লভি আছে, চিকেন মোমো আছে, বেনারসি পান আছে। থরে থরে বইও আছে। আর গোটা মেলা ছেয়ে আছে পুলিসের নজরমিনারে।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁতেই চোখের সামনে পাল্টে গেল মেলার ছবি। তুমুল জনস্রোত গোহারা হারিয়ে দিল একডালিয়ার অষ্টমীর ভিড়কেও। যত বারই আজকাল–‌এর স্টলকে নিশানা করে ফিরে–‌ফিরে আসার চেষ্টা করছি, তত বারই আরও হারিয়ে যাচ্ছি মানুষের ভিড়ে। সত্যিই, এমন বইমেলায় হারিয়ে যেতেও বেশ লাগছিল। 
প্রতিদিনই তো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঠাসা বইমেলার বিভিন্ন মঞ্চ। এদিন কিশোর ভারতী–‌র সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান ছিল এসবিআই প্রেক্ষাগৃহে। সংস্থার কর্ণধার ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়–‌সহ উপস্থিত ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, অনীশ দেব, প্রচেত গুপ্ত, সৈকত মুখোপাধ্যায়। ছিল আরও একটি মনোগ্রাহী আলোচনা। ফেসবুক কি বই–‌বাণিজ্য বা লেখকের জনপ্রিয়তায় আদৌ গুরুত্বপূর্ণ?‌ সেই শুনে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে দঁাড়ানো এক রসিকের প্রশ্ন তার বন্ধুকে, আচ্ছা, ফেসবুক কোনও স্টল দেয়নি?‌ এবার বইমেলার তিনটি হলের নামকরণ তিন প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, চণ্ডী লাহিড়ী আর রবিশংকর বলের নামে নামাঙ্কিত হয়েছে। মানুষের মাথা থিকথিক করেছে সেখানেও।‌

জনপ্রিয়

Back To Top