সব্যসাচী সরকার- সোমবার বই আর পাঠকের মিলনমেলা সাঙ্গ হল। আগামী বছরের জন্য উদ্দীপনারও জন্ম হল। আগামী বছরের বইমেলার থিম রাশিয়া। গিল্ডের পক্ষ থেকে লেখক এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের পুরস্কৃত করা হল। সেরা মণ্ডপ, বিশেষ সম্মাননা, বিশেষ স্মারক দেওয়া হল। প্রতিবারই বইমেলার ক’‌দিন মেলায় আসা পাঠক–ক্রেতার সংখ্যা এবং বই বিক্রির টাকার অঙ্ক গতবারের রেকর্ডকে ভেঙে দেয়। এবারও দিয়েছে। বইমেলায় লোক এসেছেন ২৩ লক্ষ, বই বিক্রি হয়েছে ২১ কোটি টাকার। চাকদার বাসিন্দা দেবব্রত চ্যাটার্জি ২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকার বই কিনেছেন। প্রতিবারই বইমেলা কিছু না কিছু উপহার দিয়ে থাকে সংগঠকদের। সেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সত্যটা বোঝা যায়। বাংলা বইয়ের বিক্রি এবং জনপ্রিয়তা টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে দুরন্ত গতিতে। অনেক নতুন প্রকাশক ঝকঝকে বই প্রকাশ করছেন বাংলা ভাষায়। তরুণ প্রজন্মের কাছে সে সমস্ত বই সোশ্যাল মিডিয়ার আকর্ষণের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। বাংলা ভাষা প্রতিবারই বইপার্বণীর দিনগুলোতে আরও দীর্ঘতর হতে থাকে পাঠকের মনে। বইমেলার শেষ দিনে মন্ত্রী সাধন পাণ্ডে গিল্ডের কাছে একটি প্রস্তাব দেন। গিল্ড তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করবে। সাধনবাবু বলেন, ‘‌বাংলায় অনেকে আছেন, যঁারা লিখতে চান। তঁাদের স্ক্রিপ্ট আপনারা জমা নিন। বিশিষ্ট লেখকদের দেখান। নির্বাচনের পর বই ছাপা হোক। সরকার সাহায্য করবে।’‌ সমাপ্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী সুজিত বসু। ছিলেন সুবোধ সরকার, সুজাতা সেন, শ্রীজাত, গায়ক সুরজিৎ–‌সহ অনেকেই। গিল্ডের ডিরেক্টর সুধাংশু দে বললেন, ‘‌আগামী বছর আরও ভাল ভাবে করার উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়ে গেল।’‌
বইমেলার আয়োজকরা খুশি, কেন না, সমস্ত প্রকাশকই দিনের শেষে হাসিমুখেই বাড়ি ফিরেছেন। যেমন মঞ্চে বলছিলেন পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‌সমস্ত প্রকাশকই কমবেশি একটু হেসেছেন। বইমেলা ঘিরে কোনও অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেনি। অর্থাৎ মেলার ছন্দ কাটেনি। মেঘ করেছিল অবশ্য একটু। বৃষ্টি হয়নি। বইমেলার এবারের থিম ছিল গুয়াতেমালা। গুয়াতেমালার রাষ্ট্রদূত জিওভানি কাস্টিও ভাষণে তাঁর মুগ্ধতার কথা বললেন। জানালেন, ‘‌আমি আপনাদের বন্ধু হতে পেরে আনন্দিত।’‌ দেড়শো জন গরিব পড়ুয়ার হাতে বই এবং খাবার দেওয়া হল গিল্ডের তরফে।
এদিন প্রতিক্ষণ, বৈভাষিক, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, দি বুকস পুরস্কৃত হল। ‘‌জাগো বাংলা’‌ মঞ্চ বিশেষ সম্মাননা পেল। এবার বইমেলার আয়োজকরা শুরু করলেন নতুন অধ্যায়। এবার থেকে প্রতি বছর বইমেলায় কোনও না কোনও জনজাতিকে বেছে নিয়ে তার প্রতিনিধিকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এবার দেওয়া হল লেপচাদের। পুরস্কার নিয়ে লেপচা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বললেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আমাদের ভাষা, সাহিত্যের জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেজন্য তাঁকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
গিল্ডের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হল লেখক প্রচেত গুপ্তকে। তিনি বললেন, প্রকাশকদের সঙ্গে বইও হেসেছে অলক্ষ্যে। যাঁরা বই ভালবাসেন, তাঁরা নিশ্চয়ই তা দেখেছেন।
বোধশব্দ প্রকাশন কবি মৃদুল দাশগুপ্তের ‘‌পার্টি বলেছিল ও সাতটি গল্প’ নামে‌ গল্পের বই,   সৈকত দে–র কাব্যগ্রন্থ ‘‌শৌখিন হস্তশিল্প’, এবং পাঁচজন গল্পকারের ৩টি করে গল্প নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছে।‌
বইমেলা ৪৩ বছরে পা দিল। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বইমেলার শিরোপা পেয়েছে। প্রতিবারই বিদেশ থেকে বহু নামী প্রকাশনা বইমেলায় তাদের সম্ভার বিক্রি করে। বইমেলার ক’‌দিনে গত এক বছরে কলকাতার অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গের খবরাখবরও তাঁরা জেনে নেন। বইমেলা উপলক্ষ মাত্র। লক্ষ্য হল, বাংলাকে সারা বিশ্বের দরবারে বইয়ের হাত ধরে এগিয়ে দেওয়া।‌‌‌‌

 ৪৩তম বইমেলার সমাপ্তি করতালিতে। ছবি:‌ কুমার রায়‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top