সৌগত চক্রবর্তী: ‘‌একই বৃন্তে দুটি কুসুম সৌরভ আর শাহরুখ’‌, বলে উঠলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়লেন দর্শক। বললেন, ‘‌শাহরুখ আমার ভাই, সৌরভ আমার আর একটা ভাই। আমার দুপাশে দুজন কেমন বসে আছে।’‌ আর সেখান থেকেই শুরু হল এক আনন্দঘন মুহূর্ত। 
সিনেমার উৎসবে ঢুকে পড়লেন সিনেমা জগতের বাইরের এক জনপ্রিয় তারকা— সৌরভ গাঙ্গুলি। শাহরুখ আর সৌরভের নাম উচ্চারিত হওয়া মাত্রই দর্শক যেভাবে উল্লাসধ্বনিতে ফেটে পড়লেন। অনভ্যস্ত পিচে সৌরভ কিন্তু এদিনও সাবলীল। আমন্ত্রণ পাওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ‘‌ধন্যবাদ দিদি। ‌একটা আলাদা মঞ্চে আমি এসেছি। এই মঞ্চে ঠিক অভ্যস্ত নই।’‌ কিন্তু তার মধ্যেই বাংলা সিনেমার ১০০ বছর নিয়ে, বাংলার ও ভারতের কিংবদন্তী অভিনেতা ও পরিচালকদের স্মরণ করে তাঁর বক্তব্য পেশ করলেন। তাঁর কথায় উঠে এল সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের সঙ্গে আদুর গোপালকৃষ্ণান, গোবিন্দ নিহালনির নামও। বাদ দিলেন না শাহরুখের কথাও।
উৎসবে দেখানো হবে রাখি গুলজার অভিনীত ‘‌নির্বাণ’‌। তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাখি এসে ধরলেন শাহরুখের হাত। নিয়ে চললেন পোডিয়ামের দিকে। রাখি বললেন, ‘‌আমি বাংলার মেয়ে। আমার ধমনীতে বাংলার রক্ত বইছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ডাকে এই অনুষ্ঠানে আসতে পেরে ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ। এত সুন্দর ভাবে যে এই অনুষ্ঠান করা যায়, তা দেখিয়ে দিল কলকাতা। এই কাজটা করা কিন্তু সহজ নয়।’‌ পাশে তখন দাঁড়িয়ে শাহরুখ। তাঁকে দেখিয়ে রাখি বললেন, ‘‌আমার পাশে এই যে দাঁড়িয়ে আছে ‘‌বাজিগর’‌, ও বাংলাকে খুব ভালবাসে। ও কিন্তু প্রতি বছর আসবে।’ উত্তরে শাহরুখ বললেন, ‘‌যখন ‘‌বাজিগর’–‌‌এ ওঁর সঙ্গে অভিনয় করলাম, তখন থেকেই উনি আমার মায়ের মতো।’ আরও‌ বললেন, ‘‌পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মহিলার সান্নিধ্য পেয়ে আমি গর্বিত।’ ‌ রাখি বললেন, ‘‌আমি তোমাকে বাংলা শেখাব।’‌ তার পরেই ধীরে ধীরে রাখি বলে গেলেন, ‘‌ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা’‌। শাহরুখও রাখির কথা অনুযায়ী বাংলায় উচ্চারণ করলেন ‘‌ও আমার দেশের মাটি.‌.‌.‌। কিন্তু যখন ‘‌তোমার পরে ঠেকাই মাথা’‌র প্রসঙ্গ এল তখন রাখি শাহরুখকে শেখালেন কীভাবে মাথায় হাত ঠেকাতে হয়। দর্শক হাততালিতে ফেটে পড়ল।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে দেখানো হল পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত তথ্যচিত্র। যা উৎসবের জন্যই  তৈরি হয়েছে বিদেশি অতিথিদের জন্য। দেখে অভিভূত পরিচালক ফল্‌কার স্লোয়েনডর্ফ। জানালেন,‘‌আমি কলকাতায় এসে অভিভূত। এখানকার মানুষ, এখানকার সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম। প্যারিস সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ছবি ছিল আমার মনে। জার্মানি সম্পর্কে তো ছিলই। কিন্তু এতদিন ভারত সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল ভাসা ভাসা। আমার কোনও ছবির শুটিং হয়তো এখানেও হতে পারে।’‌এবারও স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জমিয়ে দিলেন শাহরুখ। বললেন, ‘‌২৫ বছর এই উৎসব চলছে সেটা কম কথা নয়। বাংলা তথা কলকাতা আমাদের দেশকে বহু ভাল ছবি উপহার দিয়েছে।
এদিন অনুষ্ঠান শুরু হয়ে তনুশ্রীশঙ্করের পরিচালনায় নাচের অনুষ্ঠান ‘‌আনন্দ উৎসব’‌ দিয়ে। তারপর শাহরুখ খানকে বরণ করলেন নুসরত, জিৎ গাঙ্গুলি বরণ করলেন সৌরভকে, দেব রাখি গুলজারকে, শুভশ্রী ফল্‌কার স্লোয়েনডর্ফকে। এছাড়াও কোয়েল, যিশু, ইন্দ্রাণী হালদার, মিমি চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, আবির চট্টোপাধ্যায়, সোহম বরণ করে নিলেন অ্যান্ডি ম্যাকডোয়েল, মহেশ ভাট, মাধবী চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, দুসান হানান, রঞ্জিত মল্লিক ও সন্দীপ রায়কে। বাকিদের বরণ করে নিলেন উৎসবের চেয়ারম্যান রাজ চক্রবর্তী। প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করলেন শাহরুখ খান। সবশেষে দেখানো হল সত্যজিৎ রায়ের চির নতুন ছবি ‘‌গুপী গাইন বাঘা বাইন’‌।
সৌরভ ও শাহরুখকে একসঙ্গে অনুষ্ঠান চৌহদ্দিতে ঢোকেন মুখ্যমন্ত্রী। দেখা গেল শাহরুখ গাল টিপে আদর করলেন সৌরভকে। বললেন, ‘‌দাদাই আমাকে কলকাতা শহরের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ।’‌তবে ভাই আর দিদির আদরের মুহূর্ত তৈরি হল যখন মুখ্যমন্ত্রী শাহরুখকে বললেন, ‘‌তোমাকে কিন্তু প্রতি বছরই এই উৎসবে আসতে হবে। এবার তোমাকে দুর্গাপুজো দেখাব। দেখাব কলকাতার দুর্গাপুজোর কার্নিভাল। পৃথিবীতে এমন উৎসব আর কোথাও হয় না। নো ছুট্টি, নো কাট্টি।’‌‌

প্রদীপ জ্বেলে উদ্বোধনে মমতা ব্যানার্জি, সৌরভ গাঙ্গুলি, শাহরুখ খান, রাখি গুলজার, মুখ্য সচিব রাজীব সিন্‌হা ও কলকাতার নগরপাল অনুজ শর্মা। ছবি:‌ কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top