সরাসরি আমন্ত্রণ। সেনেটর–শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থাও তিনিই করে দেবেন। কারণ, তিনি বাংলার আরও সমৃদ্ধি চান। জবাব পেলেন তপশ্রী গুপ্ত 

বাঁকুড়ার সোনামুখী থেকে আমেরিকার হোয়াইট হাউস— এই যাত্রাপথটার দিকে ফিরে তাকালে কেমন লাগে?‌
স্বদেশ চট্টোপাধ্যায়:‌ অবিশ্বাস্য মনে হয়। আমার বই ‘‌বিল্ডিং ব্রিজেস’‌ আর তার বাংলা অনুবাদ ‘‌পরবাসে আমার দেশ’‌–‌এ সব লিখেছি। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় মেসে থাকতাম। চারপাশে সকলে আমেরিকা যাওয়ার জন্য দৌড়োদৌড়ি করত। আমি ওটা কখনও ভাবিইনি। কোথাও অ্যাপ্লাই করিনি। চাকরি পেয়ে পরিবারের দায়িত্ব নেব—এটাই লক্ষ্য ছিল। রৌরকেলা স্টিল প্ল্যান্টে চাকরিও পেলাম। তখনকার দিনে রীতিমতো ভাল চাকরি। হবু স্ত্রী মঞ্জুশ্রী মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি করত। মাসের একটা শনিবার রাতের ট্রেন ধরে ভোরে কলকাতা। স্টেশন থেকে সোজা কলেজ স্ট্রিট। পার্কে–‌রেস্তোঁরায় ঘুরে আবার রাতের ট্রেনে রৌরকেলা। বিয়ে করলাম। কিন্তু তখন ওখানে এত বাঙালি–‌বিদ্বেষ, যে কিছুতেই চাকরি পেল না মঞ্জুশ্রী। তখন ভাবলাম, বিয়ের পরেও আলাদাই যদি থাকতে হয়, দেশে থাকব কেন?‌ তার আগেই শ্যালক আমেরিকা গেছিল উচ্চশিক্ষার জন্য। একদিন সব বিক্রিবাটা করে রৌরকেলা ছেড়ে ফিরে গেলাম সোনামুখী। বাবা তো রেগে আগুন। সেটা ১৯৭৮ সাল। ৪২ ডলার সম্বল করে গেলাম নর্থ ক্যারোলিনার র‌্যলেতে। মেয়ের বয়স তখন মাত্র এক। নভেম্বরের ঠান্ডা। নিউইয়র্ক এয়ারপোর্টে বসে আছি। যে বন্ধুর নিতে আসার কথা, সে আসেনি। পরে বুঝেছি, ইচ্ছে করেই আসেনি। পাছে ঘাড়ে চড়ি। ৪২ ডলার কমে ততক্ষণে ৩৫ হয়ে গেছে। 
‌‌ ৩৫ ডলারের মালিক এখন আমেরিকার অন্যতম ধনী শিল্পোদ্যোগী!‌
স্বদেশ:‌ আমার নাম স্বদেশ। এসেছি বিদেশে। আমার মানুষকে সংগঠিত করার ক্ষমতা আছে। আমেরিকাতেই একদিন ছোট্ট ফ্ল্যাটে দু’‌বছরের মেয়ের জন্মদিনে তাকে মায়ের সুতির ছাপা শাড়ি পরিয়ে, সস্তার মিকি মাউস খেলনা দিয়ে উৎসবে মেতেছিলাম আমি–মঞ্জুশ্রী। এখন আমার বিরাট বাড়ি–গাড়ি, দেশে–‌বিদেশে নামডাক। কিন্তু প্রথম থেকেই আমার মিশন অন্য। এককথায় যাকে বলা যায়— ‘‌টু ট্রেন পলিসি মেকার্‌স অ্যাবাউট ইন্ডিয়া।’‌
‌‌ কিন্তু প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তো বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরমাণু চুক্তি ব্যাপারে...। 
স্বদেশ:‌‌ পরমাণু চুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা এবং বেশিরভাগ সময় মিডিয়ারও রিপোর্ট, এর সঙ্গে অস্ত্র বা যুদ্ধের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আদৌ তা নয়। আমি দেখেছিলাম, আমেরিকা ভারতকে বিশ্বাস করে না। বরং তাদের ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তানের সঙ্গে। ১৯৯৮ সালে পোখরানে পরমাণু পরীক্ষা হল। বিল ক্লিন্টন তখন প্রেসিডেন্ট। ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি হল। সরকারকে বুঝিয়ে সেটা তোলালাম। আসল উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে পরমাণু ক্লাবের সদস্য করা। জেদ চেপেছিল, ভারতকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়াতেই হবে। ৭৭ বার ওয়াশিংটন গেছি সেনেটরদের বোঝাতে। ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর একটা ঐতিহাসিক দিন। হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে ভারত–‌আমেরিকা পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। বিদেশ সচিব কন্ডোলিজা রাইস আর আমেরিকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত রণেন সেনও জোরদার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
‌‌ ‌আপনি প্রথম ইন্দো–‌আমেরিকান যিনি পদ্মভূষণে সম্মানিত। সম্মানটা পেয়ে কেমন লেগেছিল?‌
স্বদেশ:‌‌ ভারতীয় দূতাবাস থেকে ফোন করে আমাকে পায়নি। স্ত্রী–কে ফোন করেছিল উত্তরটা জানতে। উনি হাসপাতালে ডিউটিতে ছিলেন। তবু ফোনটা ধরেন। তারপর আমাকে জানান। আকাশ থেকে পড়েছিলাম। কী এমন করেছি, যেজন্য ভারত সরকার এতবড় সম্মান দেবে?‌ দেশে তো অনেকের ধারণা, আমি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই। হয়ত সত্যি। কিন্তু আমি দুই মায়ের সন্তান। প্রথম মা ভারত আমাকে জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় মা আমেরিকা দিয়েছে জীবিকা। দুজনের প্রতিই আমার কর্তব্য রয়েছে। তাই ইউএস–ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ কাউন্সিল তৈরি করেছি। তিন মাস অন্তর আলোচনায় বসি। সরকারকে চাপে রাখার কৌশল ঠিক করি। তবে ভারত আর আমেরিকার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি আর কোনওদিন ঘটবে না। 
‌‌ বুশ‌ আর ক্লিন্টন, দুই আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে কাছ থেকে দেখেছেন। মাঝে ওবামা। এখন ট্রাম্পের জমানায় কী মনে হচ্ছে?‌
স্বদেশ:‌‌ ট্র‌্যাম্পের আমলে অর্থনৈতিক ভাবে ভাল আছে আমেরিকা। ব্যবসায়ীরা খুশি। পজিটিভ অ্যাপ্রোচ টের পাচ্ছি। বেকারত্ব কমেছে। ভারতে একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে ট্র‌্যাম্প নিয়ে। উনি কিন্তু আদৌ ভারতবিরোধী নন। ভারতীয়দের তাড়ানোর চেষ্টাও করছেন না। পেশাদারদের কোনও ভয় নেই। আমরা তো বলেছি, আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশিরা যখন ডিগ্রি নিচ্ছে, তখন সেই ডিগ্রির সঙ্গে গ্রিনকার্ড স্টেপল করে দাও। এরপর আমেরিকান ইউনিভার্সিটিগুলো ভারতে ক্যাম্পাস তৈরি করলে সেটাও খুব ভাল হবে।
‌‌ ভারতে এলেই সোনামুখী যান। গ্রামাঞ্চলে কোনও পরিবর্তন?
স্বদেশ:‌‌ প্রথমে বলি, গ্রামে থাকতে আমার কোনও অসুবিধা হয় না। গ্রামের দিকে রাস্তাঘাট বা অন্যান্য পরিকাঠামোর অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা আর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ভাল করতে হবে। এটা অবশ্য শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। আমার স্কুল সোনামুখী বিজে হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের ছেলেরা বলল, কম্পিউটার চাই। আমি ২৫টা কম্পিউটারের ব্যবস্থা করলাম। পরের বার এসে দেখলাম, বিদ্যুৎ থাকে না। ইন্টারনেটও ঠিকঠাক কাজ করে না। যেটুকু যা হতো, ছাত্রদের না–দিয়ে মাস্টাররা ব্যবহার করছেন। প্রশ্ন করায় ওঁরা বললেন, ছাত্ররা মিসইউজ করে। আমি চাই, স্ট্যান্ডার্ড স্কুল তৈরি হোক গ্রামে গ্রামে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বেশি করে। ভাল ইংরেজি জানতাম  না বলে আমি আমেরিকা গিয়ে প্রথমে খুব অসুবিধেয় পড়েছিলাম। 
‌‌ বাংলার নবীন প্রজন্মের জন্য কোনও বিশেষ বার্তা?‌
স্বদেশ:‌‌ একটাই কথা বলতে চাই। রাজনীতি থেকে শিক্ষাকে দূরে রাখতেই হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। স্কুল–‌কলেজে ঘেরাও আন্দোলন একদম চলবে না। এভাবে সময় আর এনার্জি নষ্ট করে কেউ!‌ মনে রাখতে হবে, ভারতের জনসংখ্যার ৫৫%‌ পঁচিশ বছরের নিচে। সারা দুনিয়ায় কাজের জগতে এর বিপুল চাহিদা রয়েছে। শিক্ষা বা দক্ষতার দিক থেকে এদের তৈরি করতে না পারলে গোটা দেশের ক্ষতি। আর বাঙালি হিসেবে আমি যে বাংলার সমৃদ্ধি চাই, তা আর নতুন করে বলার কী আছে?‌ আমি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, আমেরিকায় আসুন। আমি সেনেটর, শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করব। রাজ্যে লগ্নি আসবে। 

 

ছবি:‌ কৌশিক সরকার‌

জনপ্রিয়

Back To Top