সম্রাট মুখোপাধ্যায়: বইমেলাতেই সম্ভব!
সত্যিকারের খাবার হার মানছে খাবারদাবারের গল্পের কাছে। খাওয়ার পয়সা বাঁচিয়ে ভারী দামের খাবারের বই কিনছেন রসিক পড়ুয়ারা।
এবারের বইমেলায় দুটি ফুড কর্নার। বেশ গোছানো। লোকজন যাচ্ছেও খেতে। কিন্তু তার থেকেও বেশি হাতে হাতে ঘুরছে রান্নাবান্না, খাবারদাবারের বই। না, নিছক ‘‌রেসিপি বুক’‌ নয়। সে তো পথচলতি ট্রেনে–বাসেও পাওয়া যায়। বসিয়ে, তারিয়ে, জমিয়ে খাবার খাওয়ার বিবরণের বই। পাঠেন অর্ধভোজনং। স্টলে দাঁড়িয়ে পড়লেও সুখ।
খাবারের স্টলগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলতেই যেন ফুড কর্নারের পেছন দিকটায় ‘লিরিকাল’ বসেছে একগাদা রসনা–‌রসের বই নিয়ে। দু’খণ্ডে বেরিয়েছে এখান থেকে ‘‌রসনাস্মৃতির বাসনাদেশ’। দুই নামজাদা ফুড–‌কলামনিস্ট সামরান হুদা আর দামু মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়। বাংলাদেশ উজাড়–‌করা স্বাদ–‌গন্ধময় থালারা এখানে উড়ে এসেছে। কোনও লেখার নাম ‘‌চাপড়–‌ঘণ্ট’‌, কোনওটার ‘‌শুঁটকি স্বাদের রহস্য’‌, কোনওটার ‘‌ডুমুর মৌরলার চাটনি’‌। এখান থেকেই বেরিয়েছে ‘‌জঙ্গলগাথা ও রসনাবিলাস’, লেখক ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরি। আনন্দ থেকে বেরিয়েছে পিনাকী ভট্টাচার্যের ‘‌খানাতল্লাশি’‌, কাবাব–‌কোফতার পাশাপাশি সস, পটেটো চিপসেরও ইতিহাস। তবে এসবিআই অডিটোরিয়ামের মুখে মিষ্টির দোকান ‘‌মিষ্টি কথা’ ইউরোপীয় ছাঁচে বাংলার মিষ্টি পরিবেশন করে বেশ নজর কাড়ছে।
জনপ্রিয় জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির একটি উপন্যাস অনুবাদ করেছেন সুদীপ বসু। ‘‌আজব লাইব্রেরি’‌। এ বছর বইমেলাতেই তা প্রকাশ করেছে ‌‘‌ধানসিড়ি‌’‌। এই উপন্যাসে এক কিশোর বাড়ি ফেরার পথে ‌এক লাইব্রেরির সিঁড়িতে পা দেয়। আর নিমেষে অসংখ্য ঘটনা আর চরিত্রের গোলকধাঁধার ভেতর হারিয়ে যেতে থাকে সে। সেখানে নানা কাহিনী, নানা জীবন একে–‌অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। যেমন ধানসিঁড়ির স্টলে ঢুকেই দেখা গেল, মুরাকামির ওই বইয়ের মুখোমুখি বসে আছে মিশরের নাগিব মহফুজের কালো বিড়াল, নীলাঞ্জন হাজরার ঝরঝরে অনুবাদে। ‘‌কালি বিল্লির ঠেক’‌। নাগিবের ১৪টি গল্প আর ১০টি স্বপ্ন সেখানে দু’‌মলাটে গাঁথা।
টলস্টয় বেঁচে থাকলে আর এই বইমেলা দেখলে নিশ্চয়ই উচ্চারণ করতেন নিজের সেই প্রিয় শব্দটি— ‘‌রেজারেকশন’‌। পুনরুজ্জীবন। তা ছাড়া আর কী–‌ই বা বলা যায় এ ঘটনাকে যে, মৃত্যুর ৩২ বছর পরে আবার পুরনো প্রতাপে বইমেলার মাঠে ঢুকছেন অসীম রায়। ‘‌গোপাল দেব’‌ বা ‘‌আবহমানকাল’‌–‌এর লেখক। দু’‌খণ্ডে তাঁর স্মৃতিকথা আর ডায়েরির সুমুদ্রণ করেছে ‘‌লিরিকাল’‌। এই বই চমকে দিচ্ছে ছাপায়, টুকরো ছবিতে, প্রায় প্রতি পাতার পাশের টীকায়। মজার কথা, গোটা আত্মজীবনীতে ‘‌আমি’‌ নেই!‌ বদলে আছে ‘‌সে’‌!‌ এদিকে দে’‌জ পাবলিশিং থেকে এবারই প্রকাশিত হল অসীম রায়ের ‘‌গল্পসমগ্র’‌। এবার এক খণ্ডে। এবারের বইমেলায় এমনই আরেক পুনরুত্থান অমিয়ভূষণ মজুমদারের। সুদূর উত্তরবঙ্গে বসে প্রচার–‌জনপ্রিয়তা ইত্যাদিকে তুচ্ছজ্ঞানে দূরে সরিয়ে রেখে এই লেখক লিখে গেছেন ‘‌রাজনগর’‌, ‘‌চাঁদবেনে’‌র মতো একের পর এক ক্লাসিক উপন্যাস। চাইতেন, পাঠক পরিশ্রম করে খুঁজে নিক তাঁর বই। এবার মেলা কিন্তু অমিয়ভূষণময়। হাতে উঠে আসছে একের পর এক তাঁর এবং তাঁকে ঘিরে বই। দে’‌জ পাবলিশিং থেকে বেরিয়েছে তাঁর ‘‌প্রবন্ধসংগ্রহ’‌। মেয়ে এণাক্ষী মজুমদার লিখেছেন, বাবার সুদীর্ঘ জীবনী ‘‌বনেচর’। ‘‌এবং ‌মুশায়েরা’‌ পত্রিকার বিশেষ অমিয়ভূষণ সংখ্যার পাশাপাশি এই প্রকাশনা থেকেই বেরিয়েছে অমিয়ভূষণের প্রায় সমস্ত সাক্ষাৎকারের সঙ্কলন ‘‌কথা বলতে বলতে’‌। ‘‌কবিতীর্থ’‌ও সংখ্যা করেছে তাঁকে নিয়ে।
নবীন লেখিকা দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক থ্রিলার ‘‌নরক সঙ্কেত’‌ প্রকাশ পেয়েই মাস দু’‌য়েক আগে হইচই ফেলে দিয়েছিল। বইমেলায় ফুরিয়ে এল তৃতীয় সংস্করণও! ‘‌বুকফার্ম’‌–‌এর এই বই পাওয়া যাচ্ছে মেলার ৩০০ নম্বর স্টলে। ‌লিটল ম্যাগাজিনগুলির প্রকাশনা এখন কত শক্তপোক্ত, তার প্রমাণ ‘‌গল্পসরণি’‌র টেবিলে থাকা ইন্তিজার হুসেনের ‘‌গল্পসংগ্রহ’‌। সাদাত হোসেন মান্টোর সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ উর্দু লেখকের গল্প এবার বাংলা অনুবাদে পাওয়া গেল।
নাটক–‌সিনেমার বই, পত্রিকার কদর প্রতিবারই বইমেলায় আলাদা। এর একটা আলাদা ক্রেতা আছেই। ‘‌বৈশাখী’‌ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার বিষয় সত্যজিৎ রায়ের পছন্দের বাংলা ছবি। পছন্দের নামগুলি পত্রিকা দেখেই জানা ভাল। ‘‌বালি সিনে গিল্ড’‌–‌এর পত্রিকা ‘‌প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র এবং’‌–‌এর বিপুলায়তন সংখ্যা গত প্রায় একশো বছরের বাংলা সিনেমা নিয়ে। অপূর্ব দে–র ‘‌নাটুকে গপ্পো’‌ বের করেছে বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ। মঞ্চের নাটককেও যে অনেক সময় হার মানাতে পারে নট–নটীদের মঞ্চের বাইরের জীবন, তারই নানান সাক্ষ্য মজাদার এই বইয়ে। এমনই সুখপাঠ্য ‘‌অ্যানেকডোটস’‌ ভরা আরেকখানি বই ‌অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘‌রঙ্গালয়ের রঙ্গকথা’‌, পুরনো থিয়েটার জগতের দুষ্প্রাপ্য নানা রঙ্গকাহিনীর বইটি বের করেছে ‘‌পত্রলেখা’‌। ‘‌চলচ্চিত্রচর্চ্চা’‌ পত্রিকার টেবিলে কাড়াকাড়ি সদ্যপ্রকাশিত ‘‌ঋত্বিক–‌চলচ্চিত্রের সমালোচনা’‌ সংখ্যাটি নিয়ে।
‘‌বাঘের বাচ্চা’‌ পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা বের করে প্রতিবার সাহিত্যের কোনও এক ‘‌বাঘের বাচ্চা’‌কে নিয়ে। সুবিমল মিত্র, বাসুদেব দাশগুপ্তদের ধারায় এবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। সংখ্যার যা ঝাঁজ, তাতে ‘‌বাচ্চা’‌ নয়, পূর্ণবয়স্ক বাঘ বললেই ভাল। আরেক ‘‌বাঘ’‌ চারু মজুমদারকে নিয়ে বছরের পর বছর সংখ্যা প্রকাশ করে চলেছে ‘‌এবং জলার্ক’‌।  এবার ১৭–‌য় পড়ল।
‘‌সাদা পৃষ্ঠার সঙ্গে সততার কোনও যোগ নেই’‌। সদ্যপ্রয়াত অদ্রীশ বিশ্বাসের ‘‌অ্যাসাইলামের ডায়েরি’‌ প্রকাশ করেছে ‘‌ধানসিড়ি’‌। সেখানেই পেলাম লাইনটি। বইমেলা তো সাদা পাতাকে ধ্বংস করারই আয়োজন।‌

জনপ্রিয়

Back To Top