সম্রাট মুখোপাধ্যায়: সিনেমা কতরকম ভাবে যে বানানো যায়!‌ একটা পৌনে দু’‌ঘণ্টার আস্ত সিনেমা বানানো হয়েছে সোলার এনার্জি দিয়ে!‌ ভুটানের ছবি। নাম ‘‌লুনানা–‌এ ইয়াক ইন দ্য ক্লাসরুম’‌। দেখানো হল বুধবার নন্দন ১–‌এ। কলকাতার সিনেমাপ্রেমীরা ভিড় করে দেখল হলভর্তি রেখে এই ভুটানের ‘‌পোস্টমাস্টার’। ‌সত্যজিৎ রায়ের ‘‌কাল্ট’‌ ছবির মতোই এখানেও শহর থেকে গ্রামে, থুড়ি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারি চাকরি করতে যাওয়া এক যুবকের গল্প। পোস্টমাস্টারের বদলে সে খালি প্রাথমিক স্কুলের মাস্টারমশাই। ছবির শেষ তার সেই স্কুল ছেড়ে শহরে ফিরে যাওয়ায়। তার মধ্যেই দু’‌বার এ ছবি সম্মান পেল বাঙালি দর্শকদের দরবারে। প্রথম বার, যখন দেখা গেল ভুটানি বর্ণমালার উচ্চারণের সঙ্গে অদ্ভুত মিল বাংলা বর্ণমালার। হাততালি পড়ল প্রচুর। আর যখন সিনেমার ভেতর ভুটানের জাতীয় পতাকা উঠল জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে, গোটা হল উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল তাকে। তবে এরই ভেতর একটু গোলমালও হল। এ ছবি দেখানো হল ডিজিটাল প্রোজেকশন সিস্টেমে। তাতে এই ছবির ‘‌কালার কোড’‌ ঠিকমতো ধরা না পড়ায় ছবির রং কিছুটা ফ্যাকাশে থাকল। ছবি দেখানোর পরে মঞ্চে দর্শকদের সামনেই ওই ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করলেন উৎসব সংগঠকদের পক্ষে চেয়ারম্যান রাজ চক্রবর্তী ও অরিন্দম শীল। এ ছবি প্রতিযোগিতায় আছে। তাই পরিচালক পারো দোরজিকে মঞ্চেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল আগামী দু’‌দিনের মধ্যে এ ছবির আবার আর একটি শো করার।
শুধু বড় ছবিই তো নয়, ছোট ছবি নিয়েও উৎসব–চত্বর জুড়ে কত উত্তেজনা। এদিন সন্ধেয় নন্দন ৩–‌এ দেখানো হল ঋতু দাশ দত্তের পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘‌ক্রান্তদর্শী’‌। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়। ছবির বিষয়— কবিতা আর প্রকাশনা জগৎ। এটাই বোধহয় এই উৎসবের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য যে, নামকরা পরিচালক, পুরস্কার পাওয়া ছবি, প্রথম বিশ্বের দেশ–‌ এ সবের পেছনেই শুধু না ছুটে, দর্শকরা দেখেন প্রচারের বাইরে থাকা ছবিও। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবি পাঠানোর জন্য সারা বিশ্ব জুড়ে পরিচালকদের হুড়োহুড়ির কারণও বোধহয় এটাই। এবারও ২,৫০০ ছবির এন্ট্রি এসেছিল বলে জানা গেছে। কাশ্মীরের পরিচালক রাহত কাজমি এসেছেন তাঁর ছবি ‘‌লিহাফ’‌ নিয়ে। ইসমত চুগতাইয়ের সেই বিখ্যাত ও বিতর্কিত গল্প নিয়ে ছবি। রাহত জানালেন, এই ‘‌ফেসবুক ট্রোলিং’‌–‌এর যুগে তাঁর এ ছবি করতে বেশ মজা লেগেছে। তিনি এ ছবির যৌনতাকে বিকল্প যৌনতা হিসেবে গড়ে তুলতে চাননি। চেয়েছেন নারীর নিজস্ব স্বর হিসেবে দেখাতে। কাশ্মীরের এখন অবস্থা কী?‌ উত্তরে রাহত বললেন, কাশ্মীরে হয়তো এখন সিনেমা মুক্তি দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। কিন্তু সেখানকার জনজীবন বা সংস্কৃতি স্তব্ধ হয়ে নেই। হিন্দি ছবির বিখ্যাত অভিনেতা অনন্ত মহাদেবনের আবার আপত্তি সিনেমাকে মূল ধারা বা অন্য ধারা— এভাবে চিহ্নিত করায়। অনন্ত জনপ্রিয় ছবির অভিনেতা হলেও পরিচালক হিসেবে সিনেমা বানান পরীক্ষামূলক ধাঁচের। তাঁর কথায় সব ছবিই একটা নতুন অভিজ্ঞতা। বুধবার দেখানো হল তাঁর ছবি ‘‌মাই ঘাট ক্রাইম নাম্বার ১০৩’‌।
এই তর্কটাই আবার চলে এল চত্বরের মুক্ত মঞ্চ একতারা মঞ্চে। বিতর্কের আসরে। যেখানে রোজ সিনেমা দেখার মতোই ঠাসা ভিড়। এদিনের আলোচনা ছিল বড় বাজেট নাকি ছোট বাজেট সিনেমাকে হিট করায় কোনটা। আলোচক ছিলেন চিরঞ্জিত, পাওলি দাম, সোহম, শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, আবির চট্টোপাধ্যায়। এককথায় চাঁদের হাট। মঞ্চের অদূরেই দুটি খাবারের স্টলেও ভিড়। রাজ্য সরকারের মৎস্য দপ্তর আর হরিণঘাটার স্টলে। আর ঘুরতে ঘুরতেই কানে–চোখে ধরা পড়ছে কত মজার কথা–ছবি। তারই একটি যেমন, এক যুবক অন্য যুবককে বলছে, এই ভিড়ের অর্ধেকই সিনেমা–সিরিয়ালের লোক। এর ভেতর উঠতি নায়ক আর উঠতি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরদের আলাদা করে চিনবি কী করে?‌ উত্তর, দ্বিতীয় দলের গালে থাকে ঘন চাপ দাড়ি। আর প্রথম দল ‘‌ক্লিন শেভেন’‌। এমন সব মজার চুটকি ছাড়া মেলা জমে!‌

জনপ্রিয়

Back To Top