নির্মলকুমার সাহা—কয়েকদিন আগে একজন ফোনে জানতে চাইলেন, কলকাতায় কোথাও ব্রিজ খেলা শেখানো হয় কিনা?‌ ফোন করেছিলেন বছর বাইশের এক তরুণী। সবে বি কম পাশ করে এক বেসরকারি সংস্থায় চাকরিতে ঢুকেছেন। প্রণব বর্ধন–শিবনাথ দে সরকারের এশিয়ান গেমসে সোনা জয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ব্রিজ খেলা শিখতে চান। ব্রিজ খেলতে চান। 
এরকম অনেক ফোন পাচ্ছেন রাজ্য ব্রিজ সংস্থার সচিব অরিজিৎ গুহও। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি, রাজ্যজুড়ে ব্রিজ খেলা নিয়ে মাতামাতির শেষ নেই। কমবেশি সব জেলাতেই প্রচুর লোক ব্রিজ খেলেন। কেউ কন্ট্র‌্যাক্ট ব্রিজ, কেউ অকশন ব্রিজ। প্রণব–শিবনাথের সোনা জয়ে সাধারণ মানুষের সেই আগ্রহ রাতারাতি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। 
উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবারগুলো থেকেই বাংলায় ছড়িয়েছিল ব্রিজ খেলা। একসময় উত্তর কলকাতার বিভিন্ন বাড়িতে ছুটির দিনে বসত ব্রিজ খেলার আসর। প্রতিবেশীরা বা দূর থেকে আসা বন্ধুরাও অংশ নিতেন তাতে। সকাল থেকে সন্ধে গড়িয়ে রাত পর্যন্ত চলত খেলা। খেলতেন বেশি বয়সিরাই। উত্তর কলকাতার বাসিন্দা প্রয়াত বিখ্যাত দুই ক্রীড়া সাংবাদিক অজয় বসু আর মুকুল দত্ত ছিলেন ব্রিজ খেলার পোকা। তাঁদের দেখা গিয়েছে স্নান–খাওয়া ভুলে ছুটির দিনে ওভাবে ব্রিজ খেলে যেতে। উত্তর কলকাতার বিখ্যাত আরও একজন, বিচারপতি শ্যামল সেন নিজে সেভাবে না খেললেও ব্রিজের ভক্ত। তাঁর বাবার আমল থেকেই ওই বাড়িতে ব্রিজ খেলা চলে আসছে। তাঁর বাবা ছিলেন ওই অঞ্চলে ব্রিজ খেলার পৃষ্ঠপোষক। এখন সেই কাজটা করে চলেছেন তিনি। এখনও সেনবাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায় চলে ব্রিজ খেলা। আগের মতোই এখনও আসেন সমাজের অনেক বিশিষ্ট মানুষ। যেমন রাজ্যের প্রাক্তন সংস্কৃতি অধিকর্তা সোমনাথ মুখার্জি। সেনবাড়িরই এক ঘরে গড়ে উঠেছে তাসের ক্লাব ‌‘‌সাহস’‌। সেখানেই এখন চলে ব্রিজ খেলা। 
দক্ষিণ কলকাতায় একসময় ব্রিজের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলির দাদু নীরদকান্ত গোসাঁই। আর মধ্য কলকাতায় ব্রিজের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বীরেন্দ্রলাল দে। রাজ্য ব্রিজ সংস্থার ২০ বছরের সচিব অরিজিৎ গুহ বলছিলেন, ‘‌এখন বেশি ব্রিজ খেলা হয় দক্ষিণ কলকাতাতেই। এরপর হুগলি, বারুইপুর, সল্টলেকে।’‌ এই রাজ্য সংস্থা অবশ্য শুধু কন্ট্র‌্যাক্ট ব্রিজই পরিচালনা করে। রাজ্য সংস্থার নথিভুক্ত খেলোয়াড়ের সংখ্যা ১৩০০–র একটু বেশি। মহিলা একশোর মতো। কলেজের ছাত্র তিনশোর কাছাকাছি। এখনও ব্রিজ প্রবীণদের খেলা হিসেবেই বেশি পরিচিত। রাজ্য সংস্থার নথিভুক্ত খেলোয়াড়দের গড় বয়স ৪৫ বছর। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিজ খেলার সঙ্গে জড়িত, সবারই আক্ষেপ, অনেক চেষ্টা করেও ছোটদের এই খেলায় বেশি আনা যাচ্ছে না। এর কারণ, পরিবারের আপত্তি। এখনও অভিভাবক–অভিভাবিকারা সেই পুরনো প্রবাদের (‌‌তাস–দাবা–পাশা, তিন সর্বনাশা)‌ কিছুটা মাথায় রেখে দিয়েছেন। কিছুটা বলার কারণ, অভিভাবকদের কাছে দাবা এখন আর ‘‌সর্বনাশা’‌ নয়। তাস ও দাবা, দুটোই মাইন্ড গেম। দাবাকে ছোটদের মনের বিকাশ ঘটানোর খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সমাজের একটা বড় অংশ এখনও তাসকে মেনে নিতে পারছে না। 
একসময় রাজ্য সংস্থার কর্তারা কয়েকটা স্কুলের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। চেষ্টা করেছিলেন স্কুলে স্কুলে ব্রিজ খেলা চালু করার। কিন্তু পারেননি। এশিয়াডে দুই বাঙালির সোনা জয়ের পর আশা, পরিস্থিতি বদলাবে। ওঁরা আবার উদ্যোগী হচ্ছেন, নতুনভাবে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে স্কুল, কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার। 
যৌথ পরিবার এখন আর বিশেষ নেই। পাড়ায় পাড়ায় সান্ধ্য–আড্ডার ব্যাপারটাও অনেক কমে গিয়েছে। ব্রিজের ব্যাপক প্রসার না ঘটার কারণ এগুলোও। ব্রিজের সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িয়ে থাকা কয়েকজন প্রবীণ বলছিলেন, ব্রিজ অনেক সময়ের খেলা। আগে যৌথ পরিবারে পারিবারিক কাজকর্ম করার জন্য অনেকে থাকতেন। একজন তাস নিয়ে মেতে থাকলে কোনও সমস্যা হত না। আগে পাড়ায় পাড়ায় সান্ধ্য–আড্ডায়ও গুরুত্ব পেত ব্রিজ। বিকেলে শুরু করে মাঝরাত পর্যন্তও চলত সেই খেলা। এখন টিভি, ফেসবুক অনেককেই অন্য পথে নিয়ে গিয়েছে। ফলে ব্রিজের যতটা প্রসার ঘটা উচিত ছিল তা হয়নি। 
তবু জাতীয় পর্যায়ে বাংলার ব্রিজ কিন্তু আছে বেশ ভাল জায়গাতেই। আন্তঃ রাজ্য ও অন্যান্য সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় বাংলার খেলোয়াড়রা ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পাচ্ছেন। এবার এশিয়ান গেমসে ভারতীয় দলেও তো ছিলেন বাংলার প্রণব বর্ধন, শিবনাথ দে সরকার, সুমিত মুখার্জি, দেবব্রত মজুমদার, ভারতী দে–রা।
কলকাতায় রাজ্য সংস্থার স্বীকৃত ব্রিজের কোচিং সেন্টার আছে দু’‌টি। একটা দক্ষিণ কলকাতায়, আরেকটা উত্তর কলকাতায়। বালিগঞ্জে ইউনিয়ন ব্রিজ ক্লাব ও গিরিশ অ্যাভিনিউয়ে ক্যালকাটা ব্রিজ ক্লাব। এখন এখানে স্কুল–কলেজের ছাত্রদেরও দেখা যাচ্ছে ব্রিজ খেলার তালিম নেওয়ার জন্য আসতে। প্রতিবছর রাজ্য প্রতিযোগিতাও হয়। গোটা আটেক সারা বাংলা প্রতিযোগিতাও হয় প্রতি বছর। ‌‌‌‌‌
পরপর তিন দিন, দক্ষিণ থেকে উত্তর, কলকাতার বিভিন্ন পাড়ায় ঘুরে অবশ্য অন্যরকম ছবিই দেখা গেল। অজস্র লোক জড়িয়ে ব্রিজ খেলার সঙ্গে। বেশ কিছু ক্লাবে গিয়ে দেখা গেল তাস খেলার আসর। কলকাতায় অভিজাত ক্লাবগুলোতেও সেই একই ছবি। সেখানে এখনও ব্রিজ খেলায় মেতে থাকেন সমাজের অনেক বিশিষ্ট মানুষ। কিন্তু তাঁদের ব্রিজের সঙ্গে প্রণব বর্ধন–শিবনাথ দে সরকারদের খেলার সম্পর্ক নেই। কন্ট্র‌্যাক্ট নয়, ওটা অকশন ব্রিজ। আর ওই অকশন ব্রিজই বাংলায় বেশি জনপ্রিয়। পাড়ায় পাড়ায় যে খেলা হয়, সেটা অকশন ব্রিজই। রাজ্য সংস্থার ওই ১৩০০ নয়, হাজার হাজার লোক জড়িয়ে ওই অকশন ব্রিজের সঙ্গে। ওঁরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে যেতে না পারলেও বিভিন্ন অঞ্চলে হয়ে থাকে সারা বাংলা প্রতিযোগিতা। রাজ্য সংস্থার গোটা আটেক প্রতিযোগিতার চেয়ে তা অনেক গুণ বেশি। যাতে কন্ট্র‌্যক্ট ব্রিজের চেয়ে প্রতিযোগীও অনেক অনেক বেশি। শিলিগুড়িতেই তো অকশন ব্রিজের একগুচ্ছ প্রতিযোগিতা হয়। ওখানে মিত্র সম্মিলনী, সূর্যনগর ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন, শিলিগুড়ি কিশোর সঙ্ঘের সদস্যরা যে শুধু ব্রিজ খেলেন, তা নয়। বছরে ওখানে অনেকগুলো প্রতিযোগিতাও হয়। অন্যান্য জেলাতেও অকশন ব্রিজের রমরমা। যাঁরা অকশন ব্রিজ খেলেন, তাঁদের অনেকেরই দাবি, রাজ্য ও জাতীয় সংস্থা অকশন ব্রিজকেও স্বীকৃতি দিক। ‌একই সংস্থার ছাতার তলায় হোক, দুই ধরনের ব্রিজ খেলাই। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top