শিখর কর্মকার: দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে ইন্টারনেট। কম্পিউটারের মাউসে ক্লিক্‌ করে বা মুঠোফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে নিমেষে আজ পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে বিশ্বের যে–‌কোনও প্রান্তে। অতি সহজে জেনে নেওয়া যাচ্ছে প্রয়োজনীয় তথ্য। ব্যাঙ্কের আদান‌প্রদান, জিনিসপত্র বেচাকেনা— ‌ সব নিমেষে সেরে ফেলা যাচ্ছে ইন্টারনেটের দৌলতে। নিত্য জীবনের সঙ্গী হয়ে–‌ওঠা এই ইন্টারনেট আবার আমাদের দূরে, আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ইন্টারনেটের বশীভূত হয়ে বই পড়ার অভ্যাস কমছে। একই ছাদের তলায় বসবাস করেও স্বামী–‌স্ত্রী একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বিদেশের খবর রাখলেও, আজকের মানুষ পাশের বাড়ির মানুষের খোঁজ রাখছে না। স্মার্টফোন আবিষ্কারের পর অবস্থা জটিলতর হয়েছে। এ থেকে মুক্তির ডাক দিয়ে মণ্ডপ গড়েছে হাতিবাগান সর্বজনীন ও উল্টোডাঙা সংগ্রামী। অন্য দিকে, পড়ুয়াদের বই পড়ার অভ্যাস পুনরুদ্ধারের আশায় পাঠাগারের আদলে মণ্ডপ গড়েছে নবীনপল্লি।
শুধু প্রযুক্তির জাল নয়, সমাজ সংসার রাজনীতি— সব ক্ষেত্রেই জীবন যেন এখন জালে বন্দি। এই জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার ডাক দিয়ে শিল্পী দেবজ্যোতি জানার ভাবনায় তারের জালের মণ্ডপ তৈরি হয়েছে হাতিবাগান সর্বজনীনে। এখানে কলকাতার ল্যান্ডস্কেপ সুতোর জালে বন্দি। তারের জালে তৈরি মানুষগুলো বন্দিদশায়। জাল কেটে বেরোতে চাইছে তারা। কিন্তু অদৃশ্য কোনও এক শক্তি পেছন থেকে মানুষগুলোকে টেনে আটকে রেখেছে ইন্টারনেটের জালের ভেতর। শিল্পী সৌমেন পালের দুর্গামূর্তির থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থান অসুরের। অন্যদের মতো সেও জালে বন্দি। জাল কেটে মুক্তি চাইছে সে। শিল্পী স্বরূপ নন্দীর ভাবনায় আন্তর্জালের মণ্ডপ তৈরি হয়েছে উল্টোডাঙা সংগ্রামীতেও। এখানে রংবেরঙের মাকড়সার জাল ঢেকে
রেখেছে মণ্ডপটিকে। বৈদিক যুগে চতুরাশ্রমের চার দশা ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস— এই চার প্রতীকের মাথাতেও হেডফোন। ইন্টারনেট–‌যোগাযোগ স্থাপনের নেশায় ডিশ অ্যান্টেনা মাথায় নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে পঁাচ মানবমূর্তি ওপরে উঠছে। দুটি হাতে পৃথিবীকে নিয়ে জাগলিং করছে। ফুল‌পাতাহীন নকল গাছগুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে মণ্ডপ–‌চত্বরে। দুর্গা এখানে একা। জালে মোড়া তঁার সন্তানেরা। হাতিবাগান নবীনপল্লিতে শিল্পী সুবল পালের ভাবনায় তৈরি দোতলা পাঠাগারে থরে–‌থরে সাজানো নানা ভাষায় লেখা হরেক বই। পড়ার ডেস্কে খোলা বইয়ের সামনে পাঠকের দুটি হাত। পাঠাগারের দেওয়ালে ঝুলছে রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন, জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল, সত্যজিৎ রায়ের মতো বাংলার কিংবদন্তিদের ছবি। এক কোণে আধুনিক ই–বুক জোন। সারিবদ্ধ ভাবে কম্পিউটার বসানো আছে সেখানে

জনপ্রিয়

Back To Top