অরুন্ধতী মুখার্জি: তিনি বসে আছেন হুইলচেয়ারে। ১২ ফুট বাই ১৪ ফুট ঘর। কালো কাচের স্লাইডিং জানলা। ঘরটি সাজসজ্জাহীন। সাদামাটা। সিঙ্গল বেড। নীল সাদায় মেশানো শয্যার সজ্জা। সোফায় ঘন নীল কভার। বেডসাইড টেবিলে ইতস্তত ছড়ানো শিশিপত্তর। মৃদু এসি চলছে। নিঃশব্দে। অনেকটা মানুষটির মতো। তিনি মাথা নামানো। চোখা বোজা। হাতে স্যালাইনের চ্যানেল। নাকে ‘রাইলস টিউব’। ক্যাথিটার এখন তাঁর জরুরি সঙ্গী। বড্ড রোগা লাগছে। গায়ে নার্সিংহোমের ঢিলেঢালা পোশাক। খালি পা হুইলচেয়ারের পা‌দানিতে। পার্ক নার্সিংহোমের ৫ তলায় ৪১২ নম্বর ঘর। তাঁকে দেখলে মায়া হয়।
ইনিই কি ড.‌ অশোক মিত্র?‌ তিনি কোনওদিনই ‘টম–‌ডিক–‌হ্যারি’ নন। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যে ‘মার্কসিস্ট ইকনমিস্ট’–কে কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা করেছিলেন। বিশ্বব্যাঙ্কে কাজ করেছেন। আইআইএম জোকা–সহ দেশবিদেশের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন। একসময় পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। যখন কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি ছেড়ে দেন, তখনই বা তাঁর বয়স কত?‌ মেরেকেটে চল্লিশের কোঠায়। কেরিয়ার মধ্যগগনে। চাকরিটি নিছক চাকরি ছিল না। সঙ্গে  ছিল মোটা মাইনে, গাড়ি। কিন্তু পদ, বেতন বা সম্মান তাঁকে কখনও মোহিত করেনি। তাই অনায়াসে সেসব ছাড়তে পেরেছিলেন। এমনই পদ এবং সম্মান তিনি ছেড়েছিলেন বাম আমলেও। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে মতবিরোধে নীরবে সব ছেড়ে মহাকরণ থেকে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চলে গিয়েছিলেন আলিপুরের বাড়িতে।
এখনও চিটফান্ডের শিকার গরিবগুর্বো মানুষ। ইতিহাস খুঁড়ে দেখা নয়, তবু সম্ভবত বাংলায় তিনিই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন ‘পনজি স্কিমে’র আসল রূপ। মুখেই ‘মার্কসিস্ট ইকনমিস্ট’ নন, মন্ত্রী হিসেবে তাঁর চোখ ছিল অর্জুনের মতো। গরিবের টাকা যেন মার না যায়— এটাই তিনি বরাবর দেখে এসেছেন।
তবে কিনা, গরিব–‌দরদি বলে তিনি নরমসরম গোছের মানুষ ভাবলে ভুল হবে। তাঁর বাক্য বাণের মতোই। নিন্দুকেরা বলে দুর্মুখ। তাঁরই তো বিখ্যাত উক্তি— ‘‌আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট।’‌
গত ১ এপ্রিল ভাইপো অরিন্দম তাঁকে এই নার্সিংহোমে ভর্তি করেন। সঙ্গে ছিলেন আশৈশব তাঁর বাড়ির সহযোগী রবি। যিনি এখন প্রায় পরিবারের সদস্য। স্ত্রী মারা গেছেন ১০ বছর আগে। আলিপুরের বাড়িতে ড.‌ মিত্রর সঙ্গী বই আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। এখন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী সিস্টার। বার্ধক্য ধরে ফেলেছে তাঁকে। তিনি এখন ‘ডিমেনশিয়া’র শিকার। আত্মীয়–পরিজন তেমন নেই। ভক্ত, ছাত্র, পরিচিতরাই দেখতে আসেন। কিন্তু কী–ই বা দেখেন তাঁরা?‌ মাথা নামানো চোখ বুজে থাকা মানুষটি কাউকে দেখেন না। চিনতেও পারেন না। কিছুদিন আগে কথা বলতেন। তবে মর্জিমাফিক। এখন তা–ও নয়। তখন বলতেন, ‘‌এখানে ভাল লাগছে না। আমাকে ছেড়ে দিতে বল্‌। বাড়ি যাব।’‌
৯০ বছরের মানুষটি বড় নিঃসঙ্গ। একাকী। তাঁকে দেখতে দেখতেই মনে আসে অমোঘ প্রশ্ন— সঙ্গ কি পারে কারও একাকিত্ব দূর করতে!‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top