দীপঙ্কর নন্দী: সন্ন্যাসী হওয়ার কথা ছিল। সব ঠিক করেই ফেলেছিলেন। শিকাগোর রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামীজি দীনেশকে বলেন, ‘‌তুমি সমাজের ভেতরে থেকে মানুষের সেবা করো। তোমার সন্ন্যাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই।’‌ সেই সময় পরিবারের সকলেই আপত্তি করেছিল। দক্ষিণ কলকাতার ২২–‌এর পল্লীর কাছে নিজেরা একটি ক্লাব তৈরি করেন, ক্লাবের নাম দিয়েছিলেন বালক সঙ্ঘ। এখানে খেলতেন বিখ্যাত ফুটবলার মোহন সিং ও প্রাক্তন ক্রিকেটার দিলীপ দোশি। ওদের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বন্ধুত্ব ছিল। বলছিলেন, ‘‌মোহন সিং দুরন্ত ফুটবলার ছিল। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ওর ফুটবল খেলার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।’‌ আমি মোহনকে বলেছিলাম, ‘‌তুমি যে কোনও একটা খেলা বেছে নাও।’‌ দিলীপ দোশির সঙ্গে সম্পর্ক দীনেশের খুব ভাল ছিল। ভারতীয় দলে প্রথম সুযোগ পাওয়ার পরই দীনেশ অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
দীনেশ ত্রিবেদী এবারও ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন। জন্ম ১৯৫০ সালে, সিমলায়। ১৭ দিন সিমলায় থেকে বাবা–‌মার সঙ্গে পাকাপাকিভাবে কলকাতায়। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে পাশ করে এমবিএ পড়তে টেক্সাস। অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ। শিকাগোর রামকৃষ্ণ মিশনে যাতায়াত শুরু করেন। সেই সময় শিকাগোতে ডিটেক্স কোম্পানিতে কিছুদিন চাকরিও করেছেন। বিবেকানন্দের প্রতি ক্রমশই আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। সেই সময় শিকাগোর স্বামীজি তাঁকে চাকরি ছাড়তে নিষেধ করেন। ১৯৮৪ সালে চাকরি ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। কলকাতায় ফিরে বিমান–‌পণ্যপরিবহণের একটি কোম্পানিও খোলেন। ছোটবেলা থেকেই পাইলট হওয়ার স্বপ্ন ছিল। ভারতে ফেরার পর কলকাতায় এসে বেহালা ফ্লাইং ক্লাব থেকে বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। সেই সময় রাজীব গান্ধীও পাইলট ছিলেন। তাঁর সঙ্গে দীনেশের খুবই ভাল সম্পর্ক ছিল। রাজীবের অনুরোধেই দীনেশ রাজনীতিতে পা রাখেন। অন্য জীবন শুরু হয়। ১৯৮০ সালে কংগ্রেসে যোগ দেন। এর কয়েক বছর পর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ভি পি সিংয়ের কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। জনতা দলে যোগ দেন। গুজরাট থেকে জনতা দলের হয়ে রাজ্যসভার সদস্য হন। দীনেশের প্রধান গুণ, সকলের সঙ্গে মিশতে পারা। সেই সময় দিল্লিতে প্রথম সারির নেতাদের বাড়িতেও তাঁর যাতায়াত ছিল। স্বল্পভাষী দীনেশকে সকলেই পছন্দ করতেন। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হওয়ার পর মমতার ডাকেই দীনেশ তৃণমূলে যোগ দেন। ২০১৯ পর্যন্ত তিনি আর দল পরিবর্তন করেননি। ২০০৯–‌এ প্রথম লোকসভায় নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪–‌য় আবার গেলেন লোকসভায়। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও রেলমন্ত্রীও হন। তার পরের ঘটনা সকলেরই জানা।
অর্জুন সিং ও মুকুল রায়ের সম্পর্কে দীনেশের বক্তব্য, ‘‌এই দুজন যদি এখনও তৃণমূলে থাকত, তাহলে আমার জেতার সমস্যা হত। ওরা এখন দলে নেই, তাই আমি জেতার ব্যাপারে নিশ্চিত। ওরা যখন দলে ছিল, তখন আমাকে কাজ করতে দিত না। ঘিরে রেখেছিল। ওরাই সব এলাকা দেখত। অর্জুন তো রিভলভার নিয়ে ঘুরত। মানসিক ভাবে আমি ওঁদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতাম না। এখন তো প্রচারে বয়স্কদের বলছি, ‘‌শিশুদের হাতে কলম না রিভলবার দেবেন, এটা আপনাদেরই ঠিক করতে হবে।’‌ দীনেশ বললেন, ‘‌অর্জুন চলে যাওয়ায় ব্যারাকপুরের সংগঠন চাঙ্গা হয়ে গেছে। ও ভেবেছিল বিজেপি–‌তে অনেককে নিয়ে যেতে পারবে। এরই মধ্যে ভাটপাড়া পুরসভা ওর হাতছাড়া হয়ে গেছে। ২০০৯ ও ১৪–‌য় অর্জুন আমাকে ভাটপাড়া থেকে লিড দিতে পারেনি। আসলে ওর রাজনীতি এলাকার মানুষ পছন্দ করে না। অবাঙালিদের মধ্যেও অনেকেই ওঁর বিরুদ্ধে আমার হয়ে প্রচারে নেমেছেন।’‌ 
তড়িৎ তোপদার সম্পর্কে দীনেশের বক্তব্য, ‘‌ওঁর মতো চায়ের দোকানে বসে আমি রাজনীতি করতে পারব না। অর্জুনের মতো গুন্ডাদের নিয়ে ঘুরতে পারব না। মুকুলের রাজনীতি আমার দ্বারা করা সম্ভব নয়। ওরা কেউই আমার ব্যাকগ্রাউন্ড জানে না। আমার সম্পর্কে অভিযোগ করে, আমি নাকি এলাকায় মিশতে পারি না। মিথ্যে অভিযোগ। কুষ্ঠরোগীদের নিয়ে আমি কাজ করি। গরিব লোকের সঙ্গে মিশি, তাঁদের অভাব–‌অভিযোগ শুনি। ওদের মতো আমার টাকা–‌পয়সা নেই। আমার সম্পর্কে টাকা তোলার অভিযোগ কেউ করতে পারবে না।’‌ 
গত পাঁচ বছরে সাংসদ তহবিলের টাকা সবই খরচা করে ফেলেছেন দীনেশ। দুটি স্টেডিয়াম করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এ ব্যাপারে খুবই সাহায্য করেছেন। ব্যারাকপুরে সব রাস্তা পাকা হয়েছে। প্রচুর আলো, পানীয় জল ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। মমতাদিই তো অধিকাংশ কাজ করেছেন। আগামী দিনে আরও কাজ করার ইচ্ছা আছে। 
দীনেশের বাবা কলকাতায় হিন্দুস্থান কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি করতেন। হিমাচল প্রদেশে স্কুলের বোর্ডিং–‌এ থাকতে হয়েছে দীনেশ ত্রিবেদীকে। স্কুলের গণ্ডি পার করে কলকাতায় এসে ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেতার শিখেছেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত জানেন, অভিনেতা হওয়ার জন্য পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে আবেদনও করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ভর্তি হননি। শ্রেষ্ঠ সাংসদ হিসেবেও একবার নির্বাচিত হন।
গুজরাটি হলেও, দীনেশ আমিষ, নিরামিষ দুটোই খান। স্ত্রী মিনাল বেথুন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। এখন গবেষক। দীনেশের প্রিয় খাবার খিচুড়ি। একমাত্র ছেলে পার্থসারথি এমআইটি থেকে পাস করে স্ট্যান্ডফোর্ডে রয়েছেন। ভাল যোগাযোগ আছে। প্রতিদিন সুদূর আমেরিকা থেকে ফোন করেন বাবা–মাকে। সবশেষে বললেন, ‘‌সংস্কৃতি–‌দর্শন নিয়ে থাকতে ভালবাসি।’‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top