ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক- জনসাধারণের অপরিসীম কষ্ট লাঘব করার জন্য আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা তাঁদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করলেন। অভিবাদন সবাইকে। ১২ দফা দাবি ছিল তাঁদের। কোনওটাই অন্যায্য নয়। শুনলেন, জানলেন এবং সমস্যার গভীরে গিয়ে সবটা উপলব্ধি করলেন মমতা ব্যানার্জি। তাঁর গভর্নেন্সের একটা ধরন যে কোনও সমস্যায় চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তাকে দ্রুত কার্যকর করার প্রাথমিক পদক্ষেপ শুরু করে দেওয়া। নবান্নতে যা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। একটা আপশোস। আমাদের ছাত্রাবস্থায় তো এমন অভিভাবক কখনও পাইনি। যিনি সব আবদার শুনবেন, ব্যথার জায়গায় হাত বুলিয়ে দেবেন, চোখে জল এলে মুছিয়ে দেবেন, কেউ শাসালে বা ভয় দেখালে রুখে দাঁড়াবেন আর গর্জে উঠবেন। শুধু চিকিৎসক সমাজ কেন, গোটা রাজ্যের মানুষই বলছেন— ধন্যবাদ মুখ্যমন্ত্রী। নীলরতন সরকার শুধু একজন প্রথিতযশা চিকিৎসকই নন, একাধারে শিক্ষাবিদ, স্বদেশি আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ, শিল্পোদ্যোগী, বিধায়ক।

 

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতোই ক্রমাগত স্বদেশি শিল্পের প্রসারে কাজ করেছেন। জাতীয়তাবাদে উদ্ধুদ্ধ হয়েছেন কবিগুরু, মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু এবং স্বয়ং নেতাজির কাছে। তৈরি করেন নানা কারখানা— ন্যাশনাল সোপ ফ্যাক্টরি এবং বেলেঘাটায় ন্যাশনাল ট্যানারি। ১৯১৮ সালে পান নাইটহুড। প্রতিবেশী দেশের অনেক রাষ্ট্রপ্রধানও তাঁর রোগী ছিলেন। তিনি যেখানে ডাক্তারির প্রাথমিক শিক্ষা নেন, সেই ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলই আজকের নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বা লোকমুখে ‘‌এনআরএস’‌। সুতরাং একজন এনআরএস প্রাক্তনী হিসেবে চিরকাল গর্ববোধ করেছি। অবশ্য প্রত্যেকেরই নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একইরকম গর্ব থাকে। গত কয়েকদিন শুধু দেশ নয়, বিদেশেও ক্রমাগত আমাদের মেডিক্যাল কলেজই ছিল নিরন্তর আলোচনা ও জনসাধারণের চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে। ওয়াশিংটন থেকে আমার কলেজের এক সিনিয়র ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করছিলেন— ‘‌মেডিক্যাল ফিল্ডে কোনও ব্রেক থ্রু–‌র জন্য এত নাম হলে ভাল হত রে। মেকিং হেডলাইন্স ফর রং রিজন’‌। তাঁকে বলি, চিকিৎসক নিগ্রহের শেষতম ঘটনা আসলে ওখানেই ঘটে। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পরিবহ মাথায় চোট পাওয়ার পরই।
ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যেতে হবে সত্তরের শেষ এবং আশির দশকের শুরুতে। জুনিয়র ডাক্তারদের প্রথম সংগঠিত আন্দোলন সেদিন কিন্তু শুরু হয় এনআরএস থেকেই। সন্ধের মুখে ওয়ার্ড থেকে হস্টেল ফেরার পথে আমাদেরই এক সহপাঠিনী বহিরাগত কিছু দুষ্কৃতীর খপ্পরে পড়েন। কলকাতার সব মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং জুনিয়র ডাক্তাররা সেদিন ঘটনার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন। সর্বত্র কর্মবিরতি শুরু হয়। রাইটার্স পৌঁছনোর জন্য রাজপথে মিছিলে নামি আমরা। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এমন আন্দোলন দেখে চমকে ওঠেন রাজ্যবাসী। প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেছে। ডাক্তার–‌রোগী সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। একইসঙ্গে সমাজের সর্বস্তরে অসহিষ্ণুতাও প্রচণ্ড বেড়েছে। শুধু সরকারি হাসপাতালে নয়, বেসরকারি ক্ষেত্রেও ডাক্তাররাই বারবার হয়ে উঠেছেন মবোক্রেসির ‘‌সফট টার্গেট’‌। জুনিয়র ডাক্তারদের সাম্প্রতিক আন্দোলন রাজ্যের সর্বাঙ্গীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং প্র‌্যাকটিস করা সিনিয়রদেরও নানা সমস্যা কাটাতে  সাহায্য করবে।
রাজ্য সরকার তার পরিসরে, ক্ষমতা অনুযায়ী নিশ্চয় চেষ্টা করবে। ঘোষিত ১২ দফার বাইরেও নানা বিষয়ে আজ নবান্নে খোলামেলা আলোচনা হয়। যে কোনও ধরনের প্রস্তাবেই সায় দিয়েছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী। আগের দিন সাংবাদিক সম্মেলনেও দারুণ সদর্থক বার্তা দেন তিনি। আমরাও তো সরকারি হাসপাতালেই তৈরি। সেই কাজের অভিজ্ঞতাই কিন্তু ডাক্তারিতে সারাজীবনের পাথেয়। মিটিংয়ে কেউ কেউ বলছিলেন, রোজ ৫০০ থেকে ১,০০০ রোগী দেখতে হয় আউটডোরে। এমার্জেন্সিতে সারাক্ষণ বড্ড ভিড়। হবেই, ভাই। অতীতে আমরাও করেছি এবং স্বীকার করতে আপত্তি নেই, সেটা আশীর্বাদই। পর পর দু–‌তিন রাত টানা জেগে এমার্জেন্সি এবং ওয়ার্ড সামলাতে হয়েছে আমাদেরও। এমন শেখার জায়গা কি দ্বিতীয়টি আছে? ওয়ার্ড থেকে, রোগীর বেডসাইডে থেকে যত শেখা সম্ভব, তা সারাজীবন এমসিকিউ সমাধানের বইয়ে পাওয়া যাবে না।‌ মানবিকতা, সেবার আদর্শ— এ–‌সব বড় বড় বুলি থাক। একটা শপথ আজ আমরা নিতেই পারি— রোগী এবং তাঁর পরিজনের সঙ্গে সারাক্ষণ ভাল ব্যবহার করব। অন্তত হেসে কথা বলব, পারলে একটু রসিকতাও। এই ‘‌হিউম্যান টাচ’‌ না ফিরলে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতি জীবনে হবে না। মুশকিল হচ্ছে, কীভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কিংবা বিপন্ন রোগীর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতে হয় তা কিন্তু কোনও ডাক্তারি পাঠ্যবইয়ে নেই! ডাঃ সুকুমার মুখার্জি, ডাঃ বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী, ডাঃ অভিজিৎ চৌধুরি বা ডাঃ দেবী শেঠিদের জীবনে এ–‌সব কেউ শেখায়নি।‌ ‌

এনআর এসের বন্ধ গেটের তালা ভেঙে কাজে ফিরলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। ছবি: বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top