আজকালের প্রতিবেদন: পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকপঞ্জি নয়। শুক্রবার বিধানসভায় সর্বদলীয় ভাবে এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গৃহীত হল। এদিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‌রাজ্যে তৃণমূল সরকার কখনই ‘‌এনআরসি’‌  লাগু করতে দেবে না। একই সঙ্গে কেন্দ্রের জনবিরোধী সব কর্মসূচির বিরুদ্ধে পথে নেমে আবারও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন মমতা। বিজেপি বিরোধী সব রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যে মমতা বলেছেন, ‘‌আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি, আসুন আমরা একসঙ্গে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে পথে নামি। তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলি।’‌ 
এদিন বিধানসভার দ্বিতীয় পর্বে ‘‌ন্যাশনাল সিটিজেনশিপ রেজিস্টার’‌ অর্থাৎ এনআরসি–‌র বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনা হয় রাজ্য সরকারের পক্ষে। প্রস্তাবটি সভায় উত্থাপন করেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। এর পরেই বিজেপি বাদে কংগ্রেস, সিপিএম–‌সহ বাম বিধায়করা ওই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তাঁর ভাষণে প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে কেন্দ্রে মোদি সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী কাজকর্মের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। মমতা বলেন, ‘‌দেশটাকে বদলে দিতে চাইছে বিজেপি। স্বাধীন দেশকে পরাধীন করতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। গণতন্ত্রকে হত্যা করছে ওরা।’‌ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, দেশভাগের ইতিহাসকে মেনে নিয়েই স্বাধীনতার পর সংবিধান তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আজ ‌হঠাৎ কী হল যে রাতারাতি মানুষকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে হবে?‌ সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, সংবাদ মাধ্যম সবকিছুর ওপর কেন্দ্র চাপিয়ে দিচ্ছে তাদের সিদ্ধান্ত। তাহলে তো গণতন্ত্রই থাকে না। যারা প্রকৃত ভারতীয়, তাদেরই আজ নাম নেই। বলছে তথ্য দাও।’‌ মুখ্যমন্ত্রীর মতে, সব তথ্য কি সব সময় হাতের কাছে থাকে?‌ সম্প্রতি বৌবাজারে মেট্রো রেলের বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, ‘‌ওখানেও তো মাটির নিচে অনেক কিছু চাপা পড়ে গেছে। এখন হঠাৎ কিছু চাইলে পাওয়া সম্ভব?‌ তার মানে কি ওখানকার মানুষরা নাগরিক নন?‌’‌
রেল বিলগ্নীকরণের প্রস্তাব থেকে বিএসএনএল, ব্যাঙ্ক— এমনকি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ইজরাইলের হাতে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাশিয়াকে ঋণ দিচ্ছে ভারত। এর প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, ‘‌নিজের দেশকে বাঁচানোর ক্ষমতা নেই। অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঢাকতে মুখ ঘোরাচ্ছে অন্যদিকে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। চিদম্বরম কি করেছেন জানি না, কিন্তু তাঁকে সাধারণ জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক বন্দি নয় কেন?‌ এটা শুধু এমারজেন্সি নয়, ফ্যাসিজম চলছে। কাশ্মীর নিয়ে আমার পদ্ধতিগত আপত্তি রয়েছে। কিন্তু সব যদি শান্তিতে থাকে তাহলে বন্দুক কেন?‌ মানুষ পথে বেরোতে পারছে না কেন?’‌‌ 
তিনি আরও বলেছেন, ‘‌কেউ কিছু বলছে না। বলার ক্ষমতা নেই। এটাই আমার দুঃখ। বিরোধী সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে আন্দোলন করতে পারছে না। সবাই চুপ করে বসে আছে। সাংবাদিককেও গ্রেপ্তার করছে। সংবাদ মাধ্যমের মুখ বন্ধ করে রেখেছে।’‌ এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় মমতার দৃঢ় বিশ্বাস, ‘‌একমাত্র বিকল্প এটাই হবে যে আসুন, আমরা  একসঙ্গে সবাই মিলে আন্দোলন করি। বাংলা বরাবরই প্রতিবাদের মাটি। এখানকার মানুষের ঐতিহ্য আছে। সবাইকে নিয়ে চলি আমরা। হিন্দি, উর্দুভাষীদের তাড়িয়ে দেওয়ার কথা আমরা বলি না। ধর্ম বেচে রাজনীতি চলবে না। বিজেপি ভেদাভেদের রাজনীতি করছে। পুলিশকে বলছে জুতো পালিশ করতে। এ তো অসম্মানজনক কথা, হুমকির পর হুমকি। দিল্লিতে বসে বাংলায় ঘৃণা ছড়াচ্ছে। বাংলাকে ওরা ভয় পায়। রাজ্যের নাম ‘‌বাংলা’‌  করতে দিচ্ছে না।’‌ এনআরসি–‌র বিরোধিতা করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মমতা। তিনি এদিন মনেও করিয়ে দেন, রাজীব গান্ধীর আমলে অসমের চুক্তির কথা। তারও আগে ইন্দিরা–‌মুজিব চুক্তি হয়েছিল বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়। উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে মমতার মন্তব্য, ‘‌কেন্দ্রের পরিষ্কার আইন আছে। তাহলে আবার নতুন করে এসব কেন?’‌‌ বিজেপি–‌র আসল উদ্দেশ্য উত্তেজনা সৃষ্টি,  দাঙ্গা বাধানো। যে ১৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে অসমে, তাদের ১১ লক্ষই হিন্দিভাষী। ১ লক্ষ গোর্খাও রয়েছেন। পাহাড়ে যারা বিজেপি–‌কে ভোট দিয়েছে, তাদের এসব তথ্য ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন মমতা। বলেছেন, ‘‌অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, মানবিকতার ধর্ম ভেঙেচুরে দিচ্ছে। আমরা বাংলায় এনআরসি করতে দেব না। বাংলাকে ম্যানেজ করা যাবে না। 
এদিকে প্রস্তাবের সমর্থনে বক্তব্য পেশ করেন কংগ্রেস ও বাম বিধায়কদের মধ্যে অসিত মিত্র, আলি ইমরান রামজ, শোভনদেব চ্যাটার্জি, সুজন চক্রবর্তী, আবদুল মান্নান, সৌরভ চক্রবর্তী, নর্মদাচন্দ্র রায় ও হিতেন বর্মন।  বিরোধিতা করেন বিজেপি–‌র স্বাধীনকুমার সরকার ও মনোজ টিগ্গা।

ছ‌‌বি: এনডি টিভি

 

জনপ্রিয়

Back To Top