আজকালের প্রতিবেদন: বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় দুই ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্র হয়ে উঠল ই এম বাইপাসের চিংড়িঘাটা মোড়। ঘটনার পর বাসে আগুন, গাড়ি ভাঙচুর, পুলিসকে লক্ষ করে ইট ছোঁড়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নামানো হয় র‌্যাফ। কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হয়। লাঠিচার্জও হয় বলে অভিযোগ। ঘটনার জেরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ই এম বাইপাস। ঘণ্টা চারেক পরে ফের যান–চলাচল শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার সকাল ১০টা ৫০ নাগাদ ই এম বাইপাসের চিংড়িঘাটা মোড় হয়ে নবদিগন্তের দিকে যাচ্ছিল মুচিঘাটা–করুণাময়ী রুটের বেসরকারি বাসটি। বঙ্গবাসী কলেজের বি ‌কম প্রথম বর্ষের পড়ুয়া দুই বন্ধু সঞ্জয় বনু (‌১৯)‌ ও বিশ্বজিৎ ভুঁইয়া (‌১৯) সাইকেলে করে মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা বাসটিকে থামার জন্য হাতও দেখান। কিন্তু বাঁক নেওয়ার পরই বাসটি দ্রুত এসে সাইকেলে ধাক্কা মারে। দুই বন্ধুই পড়ে যান। বাস গতি বাড়িয়ে এগিয়ে যায়। সামনের চাকা বিশ্বজিতের মাথার ওপর উঠে যায়। পেছনের চাকা উঠে যায় সঞ্জয়ের বুকের ওপর। তার পরও বাসটি দ্রুত গতিতে ছুটতে থাকে নিকো পার্কের দিকে। চিংড়িঘাটার পাশেই শান্তিনগরে এই দুই ছাত্রের বাড়ি।

পাড়ার দুই ছেলের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলাকার লোকজন ছুটতে শুরু করেন চিংড়িঘাটার দিকে। রক্তাপ্লুত, নিথর অবস্থায় দু’‌জনকে পথে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। বেপরোয়া বাস নিয়ন্ত্রণে পুলিসি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে ঘাতক বাস ছাড়াও আরও কয়েকটি বাসে ভাঙচুর করা হয়। চিংড়িঘাটার মোড়ে একটি সরকারি বাসে আগুন লাগানো হয়। পুলিস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে খণ্ডযুদ্ধ বেধে যায়। তার পরই আরেকটি বাসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে বাসটি। হঠাৎ বাসটি জলন্ত অবস্থায় এগিয়ে যেতে থাকে এবং রাস্তায় ভাঙচুর হওয়া অন্য একটি বাসের পেছনে ধাক্কা মারে। বিকট শব্দে ফাটতে থাকে বাসটির টায়ার। বেশ কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর হয়। গন্ডগোল ছড়িয়ে পড়ে বাইপাস–লাগোয়া ক্যাপ্টেন ভেড়ি পর্যন্ত। দুই পড়ুয়াকে এনআরএসে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁদের মৃত ঘোষণা করা হয়। পুলিস জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ৪টি বাসে আগুন লাগানো হয়েছে। আগুন লাগানো হয় দমকলের গাড়িতেও।
ঘটনাস্থলে পুলিস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে শুরু হয় ইটবৃষ্টি। কয়েকজন পুলিসকর্মী ও পথচারী আহত হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতা ও বিধাননগর পুলিসের বিশাল বাহিনী আসে।

আসে র‌্যাফও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও ইট ছোঁড়া ঠেকাতে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হয়। অভিযোগ, পুলিস লাঠি চালিয়েছে। তাতে বেশ কয়েকজন জখম হয়েছেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, একটি বাড়িতে শ্রাদ্ধ চলছিল। সেখানে এবং মৃত ছাত্র বিশ্বজিতের বাড়িতে ঢুকে তাঁর বাবা সুশীল ভুঁইয়াকে মারধর করা হয়েছে। 
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন বিধাননগর কমিশনারেটের নগরপাল জ্ঞানবন্ত সিং, বিধাননগরের বিধায়ক সুজিত বসু। ততক্ষণে ই এম বাসপাসে কয়েক হাজার গাড়ি আটকে পড়েছে। মা উড়ালপুলেও সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। একদিকে রুবি, অন্যদিকে উল্টোডাঙা পর্যন্ত রাস্তায় গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। পার্ক সার্কাসের দিকেও গাড়ির লাইন হয়। পরে কিছুক্ষণের জন্য যান–চলাচল শুরু হলেও ফের ইট ছোঁড়া শুরু হয়। রাস্তায় সাজানো টবগুলিও ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। নতুন করে অবরোধ শুরু হয় চিংড়িঘাটা মোড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করতে হয় পুলিসকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনতাকে লক্ষ করে ইট ছোঁড়া হয়। দুপুর ২টোর পর সায়েন্স সিটির দিকে যান–চলাচল শুরু হয়। ঘণ্টাখানেক পর পোড়া বাস সরিয়ে উল্টোডাঙার দিকে যানবাহন চলতে শুরু করে। যাঁরা বইমেলায় যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিলেন, এই ঘটনার জেরে আটকে পড়েন তাঁরাও।

আটকে–পড়া কয়েকটি অ্যাম্বুল্যান্সকে অন্য রাস্তা দিয়ে বের করেন পুলিসকর্মীরা। জানা গেছে, মৃত দুই ছাত্রের পরিবার ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাবে।
খালে ঝাঁপ চালকের
দুর্ঘটনা ঘটানোর পর কিছু দূর বাসটি ছুটিয়ে নিয়ে যান চালক লক্ষ্মণ সামন্ত। ততক্ষণে বাসটির পিছু নিয়েছেন দুই অটোচালক এবং দুই বাইক আরোহী। বেগতিক দেখে বাস থামিয়ে বাঁচতে ইস্টার্ন ড্রেনেজ চ্যানেলে ঝাঁপ দেন লক্ষ্মণ। এক অটোচালক এবং এক বাইক আরোহীও খালে ঝাঁপ দিয়ে লক্ষ্মণকে তোলেন। তাঁকে পুলিসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাঁকে গ্রেপ্তার করে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী অটোচালক রাজা ভৌমিক বললেন, যাত্রী তুলে অটো ছাড়ব, এমন সময় চোখের সামনেই ঘটল ঘটনাটা। ধাক্কা মারার পর গতি বাড়িয়ে দিল বাস। না হলে ওই দুই পড়ুয়া প্রাণে বেঁচে যেত। দুর্ঘটনায় মৃত বিশ্বজিতের বাড়ির পাশেই থাকেন লক্ষ্মী নিয়োগী। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। বললেন, চোখের সামনে দেখলাম পিষে দিল। রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে–থাকা এক কিশোরী তা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।‌‌‌‌‌‌

 

 

 

 

বিশ্বজিৎ ভুঁইয়্যা। সঞ্জয় বনু।

বাস পুড়ছে চিংড়িঘাটায়। আক্রান্ত পুলিস। ছবি: শিখর কর্মকার
 

জনপ্রিয়

Back To Top