‌অনিন্দ্য জানা: গাড়িটা একটা নৌকার মতো দুলছিল। ভাসছিল। বুধবার রাত সাড়ে ১০টা। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের কলেজ মোড়ের কাছে শেষমেশ বন্ধই হয়ে গেল আমার গাড়িটা। 
দু’বার সেল্‌ফ মারলাম। প্রাণের কোনও সাড়া এল না। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভাল করে নজর চলছে না। খানিকটা দূরে কলেজ মোড়ের ট্র্যাফিক সিগন্যালটা নিজের মতো সবুজ, হলুদ আর লাল হয়ে চলেছে। তার পাশে একটা সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্প। সেই আলোয় দেখতে পাচ্ছি, তুমুল হাওয়া বৃষ্টির ঝরোখাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে দিগ্বিদিকে। সহকর্মী বিপ্লব সরকারকে অবিরাম ফোন করার চেষ্টা করছি। ডায়াল করামাত্র কেটে যাচ্ছে। লাগছেই না। 
পাশের রাস্তা দিয়ে কয়েকটা গাড়ি যাচ্ছে। তার চাকার ধাক্কায় জলের তোড় আর ঢেউ এসে আমার গাড়িটাকে ঠেলে নিয়ে চলে যাচ্ছে এলোমেলো। একবার মনে হচ্ছে রেলিংয়ে ধাক্কা মারবে। আবার কিছুক্ষণ পর দেখছি গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মাঝখানে। এইসব আধুনিক গাড়ি চলে ইলেকট্রিকে। স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্টিয়ারিং শক্ত হয়ে গেছে। হ্যান্ডব্রেকও কাজ করছে না। ভয় করছিল। মাথা কাজ করছিল না। 
শেষমেশ এক সহকর্মী অনির্বাণ মজুমদারকে ফোনে পেলাম। ওর মারফত বিপ্লবকে ধরে বললাম অফিস থেকে একটা গাড়ি পাঠাতে। এই জলের মধ্যে কতক্ষণ বসে থাকব?‌ গাড়ি থেকে নেমেই বা অন্ধকারে কতদূর যাব?‌ কেউ উদ্ধার করে না নিয়ে গেলে তো সমূহ বিপদ। 
ফোনে কথা বলতে বলতেই পিছন থেকে জোরালো আলো। একটা বিশাল ট্রাক এসে দাঁড়িয়েছে পিছনে। তার কোমরজলেও কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু রাস্তার একেবারে মাঝখানে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকায় এগোতে পারছে না। ঝটপট ট্রাক থেকে দু’জন খালাসি নামলেন। তাঁরাই খানিক ধাক্কা মেরে, খানিক ভাসিয়ে আমার গাড়িটাকে রাস্তার একপাশে নিয়ে গেলেন। ট্রাক চলে গেল। তার বিশাল বিশাল টায়ারের ধাক্কায় আবার ঢেউ উঠল। সেই ঢেউয়ের তোড়ে আবার আমার গাড়ি দুলতে দুলতে গভীরতর জলের দিকে খানিক এগোল। 
কিছুক্ষণ পর অফিস থেকে অ্যাম্বাসাডর নিয়ে এলেন তপন’দা। ততক্ষণে ঠিক করে ফেলেছি, আমার গাড়ি রাতের মতো ওখানেই রেখে যেতে হবে। যা হয় হবে। ভেসে কোথাও চলে গেলেও বা কতদূর যাবে!‌ গাড়ি লক করে অফিসের গাড়িতে উঠলাম। অভিজ্ঞ চালক তপন’দা ব্যাকগিয়ারে আস্তে আস্তে করে পিছনে গেলেন। তারপর সম্পূর্ণ ঘুরপথে বেরিয়ে অফিসের পিছন দিয়ে গিয়ে আবার ঢুকলাম। সে যাত্রাও অবশ্য বিপদসঙ্কুল। কারণ, ততক্ষণে দেখছি, রাস্তায় জীবন্ত বিদ্যুৎবাহী তার–সহ ল্যাম্পপোস্ট উপড়ে এসে পড়েছে। তার মধ্যেই কপাল ঠুকে ফোন করেছিলাম পূর্বপরিচিত পুলিশ অফিসার জ্ঞানবন্ত সিংকে। রাজ্যপুলিশের আই জি (‌আইনশৃঙ্খলা)‌ জ্ঞানবন্ত তখন নবান্নের কন্ট্রোলরুমে। বললেন, ‘এখনই আপনার নম্বর সল্টলেকের পুলিশ কমিশনারকে দিচ্ছি। উনি আপনাকে ফোন করবেন।’
 অফিসে পৌঁছনোর পর থেকেই একের পর এক অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করল। সল্টলেকের ডিসি (‌ট্র‌্যাফিক)‌ ধৃতিমান, ট্র্যাফিক ইনস্পেক্টর অনিলকুমার মণ্ডল, ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানার ওসি বজলুর রহমান, সাব ইনস্পেক্টর সুদীপ নস্কর। প্রত্যেকেরই এক প্রশ্ন:‌ কী সহায়তা লাগবে?‌ 
তার মধ্যেই গাড়িনির্মাতা সংস্থার ‘রোড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্স’–এ ফোন করে নিজের সমস্যা নথিভুক্ত করেছি। কলসেন্টারের কর্মী খুব আশাব্যঞ্জক গলায় বলেছেন, ‘আমাদের লোক পৌঁছে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তার আগে আপনাকে ফোন করবে। আপনি গাড়ির কাছে চলে যাবেন।’ শুনে অত সমস্যার মধ্যেও হাসি পাচ্ছিল। বিপণনের জন্য কতকিছুই যে বলতে হয়!‌ কত অসত্য আশ্বাস যে দিতে হয়!‌ অবশ্য, গুরগাঁওয়ের কলসেন্টারে বসা কর্মী গুগ্‌ল ম্যাপ দেখে কী করেই বা বুঝবেন, সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের কোন এলাকাটা নদী হয়ে গিয়েছে। 
খানিকক্ষণ পরে বজলুর ফোন করে বললেন, ‘আমি লোক পাঠিয়ে দেখে নিচ্ছি। গাড়িটা কি ঠেলে আপনার অফিস পর্যন্ত দিয়ে আসবে ওরা?‌ রেকার পাঠানো যেতে পারে। কিন্তু তাতে গাড়ি ড্যামেজ হবে।’ ওঁকে বললাম, অত জল ঠেলে গাড়ি বার করা সম্ভব হবে না। ওটা পণ্ডশ্রম হবে। তার চেয়ে গাড়িটা ওখানেই থাকুক। যাতে নিরাপদে থাকে, সেটা নিশ্চিত করলেই হবে। কিছুক্ষণ পর ফোন করলেন সুদীপ। বললেন, আমি অনুমতি দিলে গাড়ির চাকায় কাঁটা লাগিয়ে দেবেন। যাতে কেউ কোথাও ঠেলে না নিয়ে যেতে পারে। ওঁকে বললাম, চারটে চাকাই জলে ডুবে আছে। কাঁটা লাগানো যাবে না। গাড়ি ওখানেই থাকুক। কী আর হবে!‌ বড়জোর ভেসে গিয়ে কোথাও একটা ঠেকবে। কিছুক্ষণ পর ফোন করে সুদীপ জানালেন, তিনি একমত। কাঁটা লাগানো যাবে না। 

আবার ফোন বজলুরের, ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। গাড়ি ওখানেই থাকুক। আমাদের নাইট পেট্রোল পার্টি গিয়ে রাউন্ড মেরে আসবে। কাল সকালে জল নেমে গেলে আপনি থানায় চলে আসুন। আপনার গাড়ি ঠিকমতো উদ্ধার করে দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। আমরা এই চেয়ারে বসে আছি লোকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আর যত রাতেই বাড়ি পৌঁছন, আমাকে একটা ফোন করবেন।’
শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, হতে পারে দোষত্রুটি আছে। ছুটকো বিতর্কও আছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের আক্রমণ, লকডাউন এবং আমফানের দুর্যোগে পুলিশ যা সার্ভিস দিয়েছে এবং দিচ্ছে— অভাবনীয়!‌ যাঁরা বলেন, সন্ধ্যা ৭টার পর পুলিশই ভগবান, তাঁরা ঠিকই বলেন। 
অফিস থেকে বাড়ির দূরত্ব গাড়িতে বড়জোর ১০ মিনিট। সেই রাস্তা পেরোলাম প্রায় একঘণ্টায়। পৌঁছে বজলুরকে ফোন করলাম। একটা রিংয়ে ফোন ধরে বললেন, ‘আমার লোক গিয়ে দেখে এসেছে। গাড়ি ঠিকঠাক আছে। কাল সকালে আপনি থানায় চলে আসুন।’ পরিচিতদের ফোন করার চেষ্টা করলাম। কয়েকজনকে পেলামও। সকলেই পুলিশের ভূমিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কেউ আটকে পড়েছিলেন রাস্তায়। পুলিশ দায়িত্ব নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে বাড়িতে। পুলিশের গাড়িতে বা মোটরবাইকে। লেকটাউনে এক পরিচিতর বাড়ির সামনে ট্রান্সফর্মারে আগুন লেগে গিয়েছিল। গুগ্‌ল সার্চ দেখে পুলিশে ফোন করেছিলেন। কারণ, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার হেল্পলাইন নিরুত্তর। পুলিশ ফোনে ফোনে সেই সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করেছে। কোথাও ল্যাম্পপোস্ট ভেঙে পড়েছে। পুলিশ গিয়ে আগে বিদ্যুৎসংযোগ বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছে। আমার মতোই কয়েকজনের গাড়ি আটকে গিয়েছিল জলে। পুলিশ তাঁদের অভয় দিয়েছে। আমার মতোই। বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে বাড়িও পৌঁছে দিয়েছে।  

এমন কত যে উদাহরণ!‌ 

রাতটা উদ্বেগের মধ্যে কাটিয়ে বেলা ১১টা নাগাদ পৌঁছলাম থানায়। তার আগে অনিলবাবু ফোন করে জানিয়েছেন, ‘জল নেমে গিয়েছে। আপনার গাড়ি একেবারে ঠিকঠাক আছে। আমার লোক গিয়ে দেখে এসেছে।’ বজলুর তার অনেক আগেই থানায় পৌঁছে গিয়েছেন এবং গৌরব বলে এক হোমগার্ডকে তৈরি রেখেছেন। গৌরব রয়্যাল এনফিল্ডে চাপিয়ে নিয়ে গেলেন গাড়ির কাছে। তারপর সেখানে আমাকে রেখে ২০ মিনিটের মধ্যে নয়াপট্টির ওয়ার্কশপ থেকে তুলে আনলেন মোটর মেকানিককে। দেখা গেল, সাইলেন্সার পাইপ দিয়ে জল ঢুকে গাড়ির প্রায় ইঞ্জিন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ব্যাটারি বসে গেছে। 
সম্ভবত সেটা অনুমান করেই মেকানিক প্রমোদ সঙ্গে ব্যাটারি নিয়ে এসেছিলেন। দেড়ঘণ্টার কসরতে গাড়ি আবার স্টার্ট হল। অ্যাক্সিলারেটর রেস করতে হল ক্রমাগত। সাইলেন্সার থেকে ঝরঝর করে জল বেরোতে লাগল। চালিয়ে দেখা গেল, ব্রেক খানিক কম ধরছে। মেকানিক অভয় দিলেন, ‘ওটা কোনও ব্যাপার না। চালাতে চালাতে ঠিক হয়ে যাবে। ব্যাটারিও চার্জ নিয়ে নেবে।’ ঠিকই। কিছুক্ষণ চালানোর পর দেখা গেল, গাড়ি একেবারে আগের মতোই চাঙ্গা!‌
পারিশ্রমিক মেটানোর পর মেকানিককে আবার ওয়ার্কশপে নামিয়ে দিতে গেলেন গৌরব। আমি গাড়ি নিয়ে গেলাম বজলুরের সঙ্গে দেখা করতে। মুখে মাস্ক–পরা ৪৬ বছরের পুলিশ অফিসার তখন অধস্তনকে নির্দেশ দিচ্ছেন বিধাননগরের পুরভবন থেকে তাঁর এলাকার ফুটপাথবাসীদের জন্য ত্রিপল নিয়ে আসতে। বলছেন, ‘ফোনে হবে না। আপনি চলে যান। মানুষের দরকার। এটা করতেই হবে।’ তারপর আগন্তুকের দিকে ফিরে, ‘এই চেয়ারটা তো দেওয়া হয়েছে এইজন্যই। লোককে ফেরানো যাবে না।’ 
শুনতে শুনতে বুধবার গভীর রাতে ‘রোড সাইড অ্যাসিস্ট্যান্স’–এর তরফে ভুল ইংরেজিতে আসা টেক্সট মেসেজের কথা মনে পড়ছিল। যেখানে লেখা ছিল, ‘রাস্তায় জ্যাম। আর খুব বৃষ্টি। সেজন্য গাড়ির কাছে পৌঁছতে পারা গেল না। মার্জনা চাইছি। আপনি চাইলে কাল সকালে রেকার দিয়ে আপনার গাড়ি উঠিয়ে ওয়ার্কশপে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে’। 
আবার মনে হচ্ছিল, হতে পারে দোষত্রুটি আছে। ছুটকো বিতর্কও আছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের আক্রমণ, লকডাউন এবং আমফানের দুর্যোগে পুলিশ যা সার্ভিস দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে— অভাবনীয়!‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top