ধ্রুবজ্যোতি নন্দী- চলতি দফায় রাজ্য সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট কতটা ভোটমুখী সে বিষয়ে বিস্তর কথাবার্তা শুনছি। আর, অবাক হচ্ছি। 
জিএসটি বা পণ্য পরিষেবা কর চালু হওয়ায় বিভিন্ন পণ্যে করের হার বাড়ানো–‌কমানোর ক্ষমতা তো রাজ্য সরকারগুলির হাত থেকে চলে গেছে পণ্য পরিষেবা পর্ষদের হাতে। তারপর থেকে রাজ্য বাজেটে মূলত লক্ষণীয় থেকে গেছে কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন বাধ্যতার পর এখনকার এই ঝিমুনি–‌ধরা অর্থনীতিতে বরাদ্দ বণ্টনকে ভোটমুখী করে তুলতে গেলে রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের অসাধারণ উদ্ভাবনী হতে হয়। অমিত মিত্র সেরকম উদ্ভাবনী হতে পারলে, তাঁর তো বাহবাই প্রাপ্য। আপাতভাবে ২০২০–‌২১ সালের রাজ্য বাজেটের দুটো বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এক, ৩ মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন যাঁরা, তাঁদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা। এবং দুই, খুব ছোট, ছোট আর মাঝারি শিল্পোদ্যোগ স্থাপনে উৎসাহ দিতে রাজ্যে ১০০টি এমএসএমই পার্ক চালু করার জন্যে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা।
ঘরে কোনও মতে আলো জ্বালানো গরিব মানুষকে বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ভাবনা অনেকের কাছেই নাকি ‘ঘুষ’ দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা!‌ কিন্তু এই সাহসী পদক্ষেপের পাশাপাশি উপযুক্ত প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে পারলে সমাজের দরিদ্রতম অংশে হুকিং করে বিদ্যুৎ চুরির প্রবণতা তো ব্যাপক কমার কথা। তাতে শুধু যে গরিব মানুষের উপকার, তা–‌ই নয়। বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির হিসেবের খাতাও অনেকটা ধোপদুরস্ত হয়ে ওঠার কথা। ফলে সামগ্রিকভাবে রাজ্য অর্থনীতিরই উপকার।
আর নতুন ১০০টি এমএসএমই পার্ক চালুর ভাবনা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের পক্ষে যতটা যথাযথ, ঠিক ততটাই জরুরি। রাজ্যে নতুন বড় শিল্প তেমনভাবে আসছে না বলে রাজ্য সরকারের চেষ্টাকে কেউ গালমন্দ করতেই পারেন। কিন্তু বাস্তব হল, শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, বড় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আজ দেশের কোনও রাজ্যই আর দেখতে পাচ্ছে না। মোদি সরকারের আর্থসামাজিক নীতিতে দেশে কেনাকাটা কমেছে, চাহিদা কমেছে, অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় বড় শিল্পোদ্যোগে নতুন বিনিয়োগ করবে কে? কিন্তু এই ঝিমিয়ে পড়া জমানাতেও বিনিয়োগ থেমে নেই খুব ছোট, ছোট আর মাঝারি শিল্পোদ্যোগে। এই সব উদ্যোগই আজ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫% থেকে ৯৩% পর্যন্ত এখন আসছে অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই সব ছোট আর মাঝারি উদ্যোগ থেকেই। বেশ কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ যেমন একদিকে বড় বিনিয়োগ পায়নি, অন্যদিকে এই ছোট আর মাঝারি কারখানা কিন্তু হুহু করে বেড়েছে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে চাহিদা আছে, দক্ষ শ্রমিকও আছে। রাজ্যের ৫৪ লক্ষ ছোট–‌মাঝারি শিল্পোদ্যোগে আজ কাজ করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। কিন্তু একদিকে নোট বাতিল আর অন্যদিকে অসময়ে, অপরিকল্পিতভাবে, অপটু হাতে জিএসটি চালু করতে গিয়ে এই ছোট আর মাঝারি শিল্পোদ্যোগের পুঁজির অনেকটাই স্রেফ মুছে গিয়েছে। তৈরি হয়েছে পুঁজির আকালের মতো এক গভীর সঙ্কট। এই সঙ্কট সামলাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এর আগে রাজ্যের সমবায় ব্যাঙ্কগুলিকে এই ক্ষেত্রটিতে ঋণ সরবরাহ বাড়াতে বলেছে। বিশেষ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রপ্তানিমুখী ছোট ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগগুলিকে। এবার সেই দিকেই যুক্তিসঙ্গত পথে এগিয়ে সরকার নিজেই ক্ষুদ্রশিল্পের জন্য জেলায় জেলায় বিশেষ শিল্পাঞ্চল স্থাপনে উদ্যোগী হলে পুঁজি–‌সমস্যা খানিকটা মেটে, আবার কর্মসংস্থানও বাড়ে। মনেপ্রাণে আশা করব, রাজ্য বাজেটের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি সফলভাবে রূপায়িত হবে। কাজের সুযোগের জন্যে উন্মুখ রাজ্যবাসীর তাতে মস্ত উপকার।

জনপ্রিয়

Back To Top