বিভাস ভট্টাচার্য- সকাল হতেই বৌবাজারে ভেঙে পড়ল বাড়ি। ৮বি স্যাকরাপাড়া লেনের ওই বাড়িটি সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ের জেরে আগেই কিছুটা ভাঙা অবস্থায় ছিল। সোমবার গোটা বাড়িটাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। ঘটনায় কেউ আহত হয়নি। কলকাতা মেট্রো রেল কর্পোরেশন লিমিটেডের (‌কেএমআরসিএল)‌ তরফে এদিন বিপজ্জনক বাড়ি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ের জন্য আগামী দিনে কোন কোন বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে তা চিহ্নিতকরণের জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ভূতত্ত্ববিদ ড.‌ নীতিন সোমের নেতৃত্বে যে পঁাচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গড়া হয়েছে, এদিন সেই কমিটি একটি বৈঠক করে। জল আটকাতে সুড়ঙ্গের মধ্যে যে কংক্রিটের বঁাধটি তৈরি করা হচ্ছিল তার কাজ শেষ হয়েছে। সেইসঙ্গে ক্ষতিপূরণের টাকা সরাসরি পাঠানো শুরু হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। পাশাপাশি অন্যদিনের মতো সোমবারও বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে এনেছেন বিপর্যস্ত এলাকার বাসিন্দারা। এদিন দুর্গা পিথুরি লেনের বাসিন্দা দিলীপ লাহা তঁার বাড়ি থেকে পূর্বপুরুষের সংগ্রহ করা চিতাবাঘের একটি ছাল সমেত মাথা বের করে নিয়ে যান। যেটি ‘‌ট্রফি’‌ হিসেবে বাড়িতে রাখা ছিল।
কেএমআরসিএলের জেনারেল ম্যানেজার (‌প্রশাসনিক)‌ এ কে নন্দী বলেন, ‘‌দুর্গা পিথুরি লেনে মোট ৫টি বাড়িকে ভেঙে ফেলার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। ভাঙার জন্য একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকাতে ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়েছে এবং কম বা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এরকম ৬৪টি বাড়িকে এখনও পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কোন বাড়ি কী অবস্থায় আছে তা চিহ্নিত করবে বিশেষজ্ঞ কমিটি। এদিন ৩৩ জন ক্ষতিগ্রস্তের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে ১৯ জনের হাতে চেক তুলে দেওয়া হয়েছিল। বাকি ক্ষতিগ্রস্তদেরও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাজ চলছে।’‌ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে ভাড়া নিয়ে ব্যবসায়ীরা তঁাদের ব্যবসা চালাতেন। সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ে তঁারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তঁাদের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে বলে কেএমআরসিএলের এক আধিকারিক জানিয়েছেন।
কেএমআরসিএলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বনাথ দেওয়ানজি বলেন, ‘‌জল আটকাতে মাটির নীচে কংক্রিটের বঁাধ তৈরির কাজটি সোমবার শেষ হয়েছে। সেইসঙ্গে বাড়ির নীচে মাটির ধস আটকাতে গৌর দে লেনে গ্রাউটিংয়ের কাজও এগোচ্ছে।’‌ জল আটকাতে এই বঁাধটির আগে বালির বস্তা এবং বালির বস্তার আগে এবং টানেল বোরিং মেশিনের (‌টিবিএম)‌ পেছনে আরও একটি দেওয়াল তৈরি করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই মাটির ক্ষয় অনেকটাই আটকানো গেছে বলে জানিয়েছেন এক আধিকারিক। 
এদিন যে বাড়িটি ভেঙে পড়েছে তার মালিক দেবাশিস সেন জানালেন, ‘‌আমার বাড়ি তিনতলা। বাড়ি ছাড়ার জন্য পঁাচ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। ফলে কোনও 
জিনিসই নিয়ে বেরোতে পারিনি। রূপার বাসন, খাট সমেত অনেক মূল্যবান জিনিস ছিল। বাড়ির একতলায় আমি পুরনো আমলের ঘড়ি সারাইয়ের কাজ করতাম। সেখানে ঘড়ি এবং সেগুলি সারাইয়ের জন্য প্রচুর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছিল। সব চাপা পড়ে গেল।’‌ 
এদিন গ্রাউটিং বিশেষজ্ঞ এবং টিবিএম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন অধ্যাপক নীতিন সোম। বৈঠক শেষে তিনি জানিয়েছেন গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই জায়গাটি খুব পুরনো এবং বাড়িগুলিও পুরনো। মাটি কতটা পুরনো এবং বাড়িগুলি কতটা পুরনো তা পুরোপুরি খতিয়ে দেখে তবেই বলা যাবে। আমরা ওই এলাকাতেও যাব।‌‌

বৌবাজারে ভেঙে পড়া বাড়ি থেকে বাঘের চামড়া উদ্ধার করার পর হাতে নিয়ে দিলীপ লাহা। সোমবার। ছবি: বিজয় সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top