অশোককুমার মুখোপাধ্যায়: কে বলে সমাজতন্ত্র মৃত? যান না মশাই বইমেলায়!‌ মেলার উত্তর–‌পূর্ব শিয়রে সিএমডিএ–‌র আপিস। তার উল্টো দিকেই চার নম্বর গেট। গেট দিয়ে নাক বরাবর গেলে আজকাল–‌এর স্টল। ওই স্টলের খবর পরে। আজকাল–‌কে বাঁ–‌দিকে রেখে মাত্র কয়েক পা। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ন। এক শামিয়ানার তলায় সারি সারি টেবিল। পাশাপাশি এক–‌একটি কমিউন যেন! হলুদ প্রেক্ষাপটে উজ্জ্বল রক্তবিন্দু সব। রক্তবিন্দুই তো! এবং জলার্ক, অনীক, পদক্ষেপ...। এবং জলার্কের বইমেলা সংখ্যায় পাওয়া যাবে সত্তরের হুগলির লড়াইয়ের ছবি। অনীক—‘গৈরিক আগ্রাসন: আক্রান্ত ভারত’। ঠারেঠোরে নয়, খুল্লামখুল্লা লড়েছে ‘গেরুয়া’ দর্শনের বিরুদ্ধে। আর পদক্ষেপ–‌এ ‘সত্তরের সেই দিনগুলি’। পত্রিকাগুলির বিক্রি দেখেই বোঝা যায়, ছেলে–‌বুড়োর দল এখনও সত্তরের রক্তিম স্বপ্ন দেখে চলেছে।
টেবিলে যারা বসে, ভাল করে লক্ষ্য করুন, প্রত্যেকের মুখে প্রচ্ছন্ন গর্ব:‌ ‘পত্রিকাটি পড়লে আপনিই ঋদ্ধ হবেন’। যে সদ্য যুবা একটু আগে পরম ভোলানাথ (মাস্টারমশাই) মহাসঙ্ঘ স্টলে বসে এক গেরুয়াধারীর জ্ঞান শুনছিল, ওই দেখুন মশাই, সে–‌ও এসে জুটেছে লিটল ম্যাগাজিনের মহল্লায়। হ্যাঁ, আপনি ভাববার আগে, সে–‌ও কিনে ফেলেছে অনীক।
অন্যরকম লাল যারা, সেই ন্যাশনাল বুক এজেন্সিতে পেয়ে যাবেন কিশোরদের জন্য লেখা আবুল বাশারের এক ডজন গল্প।
মেলায় এবার বঙ্গ নামের জয়জয়কার! বঙ্গের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ মেলালে ওই নাম দিয়ে শুরু এমন স্টল আছে মোট দশ। তার মধ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ নিজের মহিমায় অটুট। অধিকাংশই পুরনো বই, কিন্তু না পড়ে থাকলে সংগ্রহযোগ্য। যাদবপুর, বর্ধমান কি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনাগুলি না দেখে থাকলে, অবশ্যই দেখে নেবেন মশায়। যাদবপুরের স্টলে ঢুকে খোঁজ নিন, জাতীয় শিক্ষা পরিষদের বইগুলির। ওরা একালের বিপণনতন্ত্র শেখেনি, তাই দু’‌মলাটে ধরে রাখা অক্ষরমালা হেলাফেলায় পড়ে আছে। সুশীল মুখোপাধ্যায়ের নাম শুনেছেন? ডন পত্রিকার? শোনেননি? যান যাদবপুরের স্টলে। জেনে নিন, ওই শিক্ষা–‌বিপ্লবীর কর্মকাণ্ড।
সাহিত্য অকাদেমি–‌র স্টলে যে বছর বাইশের ছেলেটি মন দিয়ে বই দেখে চলেছে, অনিরুদ্ধ কুমার। নিবাস রঁাচি। কাজের সূত্রে কলকাতায়। আড়চোখে বইটির নাম আপনিও পড়ে নিতে পারেন— মৈথিলি লোকগীত। সঙ্কলন: অণিমা সিং।
— কী হে, তুমি কি গান করো?
— না না, আমার দাদির জন্য। মিষ্টি হাসে ছেলেটি। এই গানগুলিই দাদি শুনিয়েছে বহু বার... তাই দিচ্ছি... বয়েস হচ্ছে তো, এখন মাঝে মাঝে লাইন ভুলে যায়।
এরই পাশাপাশি রামসিং তোমর অনুবাদিত ‘রবীন্দ্রনাথ কি কহানিয়া’‌র বিক্রি অব্যাহত। তবে এখনও অপ্রতিহত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ।
বইমেলার মতো আন্তরিক অভ্যর্থনা আর কোথায় পাবেন মশাই? বিশ্বাস না হলে সোজা চলে যান ঋতবাক–‌এর একচিলতে আশ্রয়ে। শ্যামলবরনী কন্যা আপনাকে সুচারু আহ্বান করবেন বই দেখবার। প্রথমেই, ‘দেবতার সন্ধানে—একটি অনার্য অডিসি’। শিবাংশু দে। ‘...পুরীতে ঘুরতে ঘুরতে তিনি আপনাকে জানাবেন কেমন করে আর্যদের সেরিব্রাল আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, এক অনার্য ঐশীধারণা নীলমাধব, দারুব্রহ্ম রূপ নেন আর্য প্যান্থিয়নে। সরস্বতী নদী কীভাবে দেবী হলেন...।’ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর ‘মন্দকথা’ও নেড়েচেড়ে দেখতে পারবেন। ইতিহাসের অন্য আলোকে শোভাবাজার রাজবাড়িকে জানতে ‘মহারাজা কাহিনী’।
ত্রিপুরার বইয়ের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অক্ষর পাবলিকেশনস। একবার ঘুরে আসুন না মশায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনী কিনতেও তো পারেন। দেব সাহিত্য কুটির–‌এ ‘ইন’ বঁাটুল, ‘আউট’ হাঁদাভোঁদা। ছেলেবেলাটা একবার ঝালিয়ে নিতে চাইলে ঢুকে পড়ুন না, কে বারণ করছে! এশিয়া পাবলিশিংয়ের ভ্রমণসঙ্গী এখনও বেস্ট সেলার। ওই দেখুন, সুদূরের পিয়াসীরা খুঁজে বেড়াচ্ছে ট্যুর হেল্প পাবলিকেশন, ট্র্যাভেল ছুটি আর ট্র্যাভেল রাইটার্স ফোরাম–‌এর দপ্তর।
খুঁজতে খুঁজতে সেন্টুর কার্টুন স্টলে গেলেই আপনি ব্যোমকে যাবেন। শূন্য স্টল। সারি সারি তাক। কোলাপসিব্‌ল বন্ধ। চিড়িয়াখানার বাঘহীন খাঁচা!
বইমেলা সংখ্যা হিসেবে কোরক বের করেছে রসরঙ্গরসিকতার সাহিত্য— মধ্যযুগ থেকে গৌরকিশোর ঘোষ। অন্য এক সংখ্যা মাস্টারমশাই। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখেছেন তাঁর যোগ্য ছাত্ররা— শঙ্খ ঘোষ, সুধীর চক্রবর্তী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।
শুধু আঁকার বই কিনতে হলে চিত্রলেখা–‌য় চলে যান। আঁকা নয়, গানের স্বরলিপি? কিশোরকুমার, মান্না দে? কিনে ফেলুন গানের সরগম। একটু খুঁজুন, পেয়ে যাবেন ঠিকই।
বাড়ির ছোটদের বই উপহার দেবেন? অবশ্যই দেবেন। শিশু সাহিত্য সংসদ–এ‌র ‘ইতিহাস গল্প বলে’ পড়ে দেখুন তো একবার!‌ কেমন না কিনে থাকেন দেখব!‌ করুণা প্রকাশনীর ‘জিম করবেট অমনিবাস’ তো এখনও অপ্রতিরোধ্য। একবার অন্তত হাত বুলিয়ে তো দেখুন!‌ মহাশ্বেতা দেবীর স্পর্শ পেয়ে যাবেন।
কলকাতা পৌরসংস্থা–‌র কলকাতা পুরশ্রী–‌র হাতেগরম সংখ্যা ‘ভগিনী নিবেদিতা/সার্ধ জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ না দেখে যাবেন না মশাই। ওই মহীয়সীর অপমান হবে।
দেবতা নয়, আপনি মিথমুক্ত মানুষটিকে জানতে আগ্রহী? চলে যান গাঙচিল–‌এর স্টলে। হাতে তুলে নিন ‘গৌতম বুদ্ধ/বিতর্কের নতুন বাঁক’। যা নাকি দেবাশিস পাঠকের ‘মিথমুক্ত বুদ্ধদেবকে চেনার চেষ্টা’।
‘‌দাঁড়াবার জায়গা’‌র একটুকরো স্টলে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। চলে গেছে গিটার–‌যুবাদের দখলে। ওদের টুংটাঙের ফাঁকে আপনি তো পড়ে নিতেই পারেন বইমেলা সংখ্যাটি। সূর্য মণ্ডলের কবিতা কি আপনার ভাল লাগবে না?
‘আমার কোন দোষ নেই/যত দোষ শ্রীমান কৃষ্ণের/তিনি বলতে গেলেন কেন/...সম্ভবামি যুগে যুগে’।
তালপাতা–‌র ‘নির্বাচিত গদ্যলেখা’/শঙ্খ ঘোষ আর গিরিশচন্দ্র ঘোষের সাক্ষাৎকার/কুমুদবন্ধু সেন–‌এর পাতা উল্টোবার সময় আপনার কানে এসেছে তো— ধিতাং ধিতাং বোলে...। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন মশায়। আজকাল–‌এর ঠিক উল্টো দিকে ছেলেমেয়েরা গাইছে। ওরা বেছে নিয়েছে আজকাল–‌এর প্রেক্ষাপট।
এই তীব্র বিকেলবেলায় আপনি আজকাল–‌এ ঢুকতে বাধ্য। যেখানে যৌবন অটুট। দেখুন না মশায় যারা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বাজার সফর সমগ্র’ কি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানিকদার সঙ্গে’ কিনছে, তারা কি সবাই বৃদ্ধ নাকি? ওই যে সাঁতরাগাছি থেকে এসেছেন যে টুপি–‌পরা মুসলমান ভদ্রলোক, বোরখা–‌পরিবৃতা রমণীকে নিয়ে, আরে যিনি এই মুহূর্তে অশোক দাশগুপ্তের নেপথ্য ভাষণ তেইশ খুঁজছেন, বিগতযৌবন নাকি!
আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা তো এই বিয়াল্লিশেও তরতাজা। যৌবন চলে যাওয়া অত সহজ?‌

জনপ্রিয়

Back To Top