সুতপা ভৌমিক: আয়ত নাকি বর্গ, ‘‌ক্ষেত্র’‌ মাপার স্কেল নিয়ে ঘোরার অভ্যেস বাঙালির নেই। আর ‘‌স্কেল’‌ নামক বস্তুটির প্রতি আশৈশবের আতঙ্ক, বাস্তুহারা হয়েছে মন জমি থেকে, সে কথাও হলফ করে বাঙালি বলতে পারবে না। কিন্তু তিনি দিব্যি আসেন।‌ দিব্যি ঘোরেন। দিব্যি বসেন। ‘‌স্কেল’‌ নিয়ে!‌ 
হ্যাঁ, খাঁটি, নিপাট, বিশুদ্ধ বাঙালি হয়েও!‌ তাঁর পরিচয় দিতে যে তিন শব্দের ব্যবহার করতেই হয়, তার সঙ্গে হুবহু মিল ‘‌ঘৃত’‌–র বিজ্ঞাপনের। কিন্তু উপায় নেই। গোপেশ্বর চক্রবর্তী এমনই এক মানুষ। যাঁর নিজের সুবাস নেই। কিন্তু তিনি বইয়ের সুবাসে ছুটে আসেন সেই ১৯৭৬ থেকে!‌ যে বছর বারো মাসে তেরো পার্বণের বদলে বাঙালি পেল ‘‌চোদ্দো’‌ নম্বর পার্বণটাও। বইমেলা। 
বইমেলায় বই বিক্রি হয়, লেখক–প্রকাশক–পাঠক মুখোমুখি হন। কিন্তু গোপেশ্বরবাবু মেলায় ছুটে আসেন অন্য কাজে। বইয়ের মলাট দিতে!‌ মাটিতে প্লাস্টিক পেতে, সেলোফেনের রিল আর স্কেল নিয়ে বসে পড়েন। চলনসই একটা জায়গায়। তারপর?‌ সদ্য ক্রেতা দোকান থেকে বেরিয়েই দাঁড়িয়ে পড়েন গোপেশ্বরবাবুর সামনে। ‘‌দাদা, মলাট লাগিয়ে দিন না?‌ পাঁচটা আছে।’‌ ব্যস, মেপেজুকে নিখুঁতভাবে মলাট লাগাতে থাকেন মাঝবয়সি মানুষটি। বই প্রতি ১০ টাকা। বইয়ের স্বাস্থ্য একটু বেশি ভাল হলে, ২০ টাকা। বই যাঁরা ভালবাসেন, মলাটের মোড়কে ভাঁজ পড়ুক, ছিঁড়ে–ফেটে যাক মোটেই চান না। তাই তাঁদের বইপ্রেমকে যত্ন করে লালন করেন বিরাটির এই বুক বাইন্ডার। মেলার মাঠে পশরার বৈচিত্র‌্য আছে। তা বলে তাঁর মতো তো কেউ নন?‌ গোপেশ্বরবাবু হাসেন, ‘মেলা যে প্রান্তেই হোক, ‌বইমেলায় না এলে কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠি!‌ বছরের অন্য সময়ও বইয়ে মলাট দেওয়া, বাইন্ডিংয়ের কাজ করি। কেউ চাইলে বাড়ি গিয়েও। স্কুলের বইও বাইন্ডিং করি। ছেলেপুলেরা তো বই ছিঁড়বেই। যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব আমার।’‌ 
কী অদ্ভুত নেশা!‌ নেশাটা ভারি বিচিত্র ‘‌মাইক্রো আর্ট’‌ শিল্পীর। যিনি বইমেলায় বসে চালের দানার ওপর নাম লেখেন!‌ মেলার মাঠে গর্ত নাই–‌বা থাকল, হোঁচট খেতে বাধ্য হবেন এই শিল্পীর ছোট্ট টুলের সামনে দাঁড়ালে। বেশ লম্বা লাইন সামনে। নাম লেখানোর!‌ 
বিচিত্রের ছড়াছড়ি মেলার কোণে, কোণে। ‘‌উপভোক্তা বিষয়ক দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।’‌ বড়সড় দোকান। কাছাকাছি গেলেই লিফলেট এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনে জিনিস কেনা বা পরিষেবা নেওয়ার সময় সতর্ক থাকুন, এ বিষয়ে টুকটাক আভাস। কিন্তু একটু বিশদে বলার কেউ নেই। উল্টে দুপুর পেরিয়ে বিকেল পড়ার আগেই শুরু হয়ে গেল কুইজ!‌ ‘‌কোন ক্রিকেটার অনূর্ধ্ব–‌১৯ বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপ আর টোয়েন্টি–‌২০ বিশ্বকাপ জিতেছে?’‌ উত্তর দিলেই পুরস্কার। কিন্তু উপভোক্তার মনে যে প্রশ্ন, তার উত্তর দেবেন কে?‌ 
বিচিত্র নম্বর চার। ‘‌কাশ্মীরি খাওয়া স্যাফরন টি’‌!‌ বইমেলায় দিয়েছে স্টল!‌ বই পড়তে পড়তে চায়ের আয়েশ চলে, কিন্তু বইমেলায় ঢুকেই কেশর চা মোঘল আমলের একটা পাত্র থেকে খাওয়ার জন্য এত ব্যতিব্যস্ত ভাব!‌ বোধ হয়, বাঙালিরই হয়। 
বইমেলা আর ফুড কোর্ট দুইয়ে কেমন যেন স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্ক!‌ ছাড়াও চলবে না। আবার সঙ্গে থাকলেও বিপদ!‌ দুই নিয়ে তর্ক–বিতর্ক এমন হয় যেন ‘‌ডিভোর্স’‌ হল বলে। কিন্তু হয়েও হয় না!‌ তাই তো বইয়ের পানে চাইতে চাইতে আপনি যদি একটু গতি কমিয়েছেন, অমনি পেছন থেকে শুনবেন, ‘‌সরুন, সরুন। মাংস আছে!‌’‌ পিলে চমকে গিয়ে যেই ইউ টার্ন নেবেন, দেখবেন এক নৌকো মাংস চলেছে!‌ বইছেন দু’‌জন। যেন ব্যাপারে বাড়ির হেঁশেল!‌ যজ্ঞি চলছে। ‘‌বিরিয়ানি ১০০, বিরিয়ানি ১০০’‌ বলে পরিত্রাহি চিৎকার, কষে–কষার কষাকষি— সব দেখেই বাঘা বাইনের ঢঙে বলবেন, ‘‌কী দাপট!‌’‌
‘‌দাপট’‌–এর গপ্পোসপ্পো আরও আছে। সেলফির হরকরকম্বা আছে। তবে ভাল লাগার রসদও আছে। ‘‌রায়বেঁশে’‌ ‘‌ছৌ’‌, শব্দগুলোয় যেখানে অনভ্যস্ত বাঙালি ছেলেপুলেরা, সেখানে তাদের চেনাতে, শেখাতে খাদি গ্রামোদ্যোগের স্টলে রাখা আছে দুটো দুর্দান্ত বই। ‘‌দেখে এলাম ছৌ’‌ আর ‘‌আজও আছে রায়বেঁশে’‌। ‘নজরুলের ‌জন্মভিটে’‌, ঠিক বই নয়। সিডি। তবে অশোকতরু চক্রবর্তী আর সাবিহা ইয়াসমিনের পরিচালনায় এই সিডি অন্য কিছুর স্বাদ দেবে। দাম:‌ ১০০ টাকা। কাঁটাতারের পরোয়া বই কখনও করেছে কি?‌ বোধ হয় না। তাই বই আর বইয়ের বিষয় বারবার ছাড়িয়েছে সীমানা!‌ ‘‌মালালা, এক অখ্যাত মেয়ের সত্য কাহিনী’‌, তৃপ্তি কুণ্ডুর এই বই হাতে–গরম উদাহরণ। 
‘‌আজকাল’‌ এবার এনেছে অশোক দাশগুপ্তের ‘‌হিং টিং ছট সমগ্র’‌, ‘‌নেপথ্য ভাষণ–২৩’‌, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘‌বাজার সফর সমগ্র’‌, দেবাশিস দত্তের ‘‌বিরাটইজম’‌, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘‌ত্রিসন্ধ্যার স্মরণকথা’–সহ আরও কয়েকটি আকর্ষণীয় বিষয় নিয়ে বই। মুক্ত মঞ্চে প্রকাশিত হল শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌ফাঁদ’‌। বৃহস্পতিবারই উদার আকাশ প্রকাশনার ছ’‌টি বই প্রকাশিত হয়েছে। নীহারিকার সংগ্রাম, ইসলামী আইন, অন্য গাঁয়ের আখ্যান, জবালা পুত্র, প্রবন্ধ সমগ্র, ভাবনার নানা দিক ও মাটির শিতান মাটির পৈথান। লিটল ম্যাগাজিনের তাঁতঘর পত্রিকার টেবিলে পৌঁছোল বইমেলা সংখ্যা। সংখ্যা জুড়ে সদ্যপ্রয়াত রবিশঙ্কর বল। ‘‌সুবর্ণরেখা’‌ স্টলে মিলছে ‘‌ওল্ড ইজ গোল্ড’‌। ‘‌এক্ষণ’‌–এর ‘‌দান্তে’‌ সংখ্যার পুনর্মুদ্রিত ফ্যাক্সিমিলি এডিশনটির চাহিদা বেশ ভাল। প্রায় ৫০ বছরের বেশি পরে এটি ছাপা হয়েছে। কানু সান্যালের ওপর বাসু আচার্যের লেখা প্রকাশিত হয়েছে আর ‌বি এন্টারপ্রাইজ থেকে। 
বই–‌বৈভবের এই বেলায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে লেখক–পাঠক মুখোমুখি হয়েছিলেন টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের ‘‌এস–‌‌১৭’‌ স্টলে। হাজির ছিলেন সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত, দে’‌জ পাবলিশিংয়ের শুভঙ্কর দে (‌‌অপু)‌‌ এবং ‘‌বি–বুক্‌স’‌‌–এর এষা চ্যাটার্জি। বই পড়া, এ প্রজন্ম পড়ে না, আগের সবাই পড়ত— আলোচনায় এই দিকগুলো নিয়ে কথা বলতে বলতে চমৎকার এক গল্প শোনালেন প্রচেত গুপ্ত। প্রকাশনা জগতের নানা বাঁক নিয়ে শুভঙ্কর আর এষার কথা সবাই শুনলেন মন দিয়ে। টেকনোর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষিকা আর ছাত্র–ছাত্রীদের আলোচনায় অংশগ্রহণ আরও একবার প্রমাণ করল, বই থাকবে চিরকাল। সঞ্চালনায় মাতিয়ে দিলেন শুভজিৎ দাস। ঝকঝকে ও মূল্যবান অনুষ্ঠানটি বইমেলার পাঠকরা মনে রাখবেন অনেকদিন। 

জনপ্রিয়

Back To Top