‌আজকালের প্রতিবেদন: সাম্প্রতিক ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লিখলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। জানালেন তঁার উদ্বেগ। রাজ্য সরকার বা ব্যাঙ্ক–‌কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করেই সংযুক্তিকরণ হয়েছে বলে উষ্মা প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিষয়টিতে যে তিনি ক্ষুব্ধ, তার ইঙ্গিতও দিয়েছেন চিঠির বয়ানে। বাংলাকে বঞ্চনার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন মমতা।
সম্প্রতি ১০টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংযুক্তি ঘটিয়ে চারটিতে আনার কথা ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। এর মধ্যে রয়েছে এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক ও ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (‌ইউবিআই)‌, যে–‌দুটি ব্যাঙ্কের পথ চলা শুরু হয়েছিল কলকাতা থেকে, যথাক্রমে ১৮৬৫ ও ১৯১৪ সালে। সে–‌কথা উল্লেখ করে মমতা প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ৮৭৫টি শাখা রয়েছে ইউবিআইয়ের এবং এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক এ রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে ৫৬২টি শাখায়। মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, দিল্লি ও চেন্নাইয়ের ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে সংযুক্তির ঘোষণার ফলে এই দুটি ব্যাঙ্কের যে–‌সব শাখা রাজ্যে রয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন। তা ছাড়া বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে রয়েছে এ–‌দুটি ব্যাঙ্কের বড়সড় ভূমিকা। এ রাজ্য থেকে তাদের সরিয়ে অন্য ব্যাঙ্কের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাংলার সার্বিক উন্নয়নই যে চরম ব্যাহত হবে, স্পষ্ট ভাষায় তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। উদাহরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, রাজ্যের ১১টি জেলায় ব্যাঙ্ক–‌পরিষেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইউবিআই। এই ব্যাঙ্ককে দিল্লি–‌কেন্দ্রিক পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জেরে গ্রামীণ বাংলা আর্থিক দিক দিয়ে সাঙ্ঘাতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পিছিয়ে পড়বে রাজ্যের অর্থনীতি।
মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, বাংলার বিশাল গ্রামাঞ্চলের অনেক জায়গাই এখনও ব্যাঙ্ক–‌পরিষেবার আওতার বাইরে থেকে গেছে। এই অবস্থায় ব্যাঙ্ক–‌সংযুক্তির এহেন সিদ্ধান্ত অর্থনীতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনবে। ক্ষুদ্রঋণ, কৃষিঋণে এর প্রভাব পড়বে ব্যাপক।
আগের অভিজ্ঞতা থেকেও দেখা গেছে, স্টেট ব্যাঙ্কের সঙ্গে সহযোগী অন্য ব্যাঙ্কগুলিকে যখন জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, দেশ জুড়ে সব মিলে ১৫০০ শাখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বাংলায় যার সংখ্যা ছিল ৮০। ব্যাঙ্ক অফ বরোদাও অন্য দুটি ব্যাঙ্কের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে ৮০০–‌৯০০ শাখার ঝঁাপ ফেলে দিয়েছিল, সে–‌ক্ষেত্রেও ৩০টি শাখা বন্ধ হয়ে যায় এ রাজ্যে। মমতার অভিযোগ, এভাবে বাংলার মানুষের কাছে ব্যাঙ্ক–‌পরিষেবাকেই ক্রমশ সঙ্কুচিত করে দেওয়া হয়েছে। নির্মলা সীতারামন ব্যাঙ্ককর্মী সংগঠনকে আশ্বস্ত করেছেন, সংযুক্তিকরণের ফলে একজনেরও চাকরি যাবে না। রীতিমতো উদ্বেগ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু লিখছেন, এই সংযুক্তির কবলে পড়ে ইউবিআই–‌এর ৬,৫৯৮ জন এবং এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের ৪,২০১ জন কর্মীর ভবিষ্যৎ এখন অথৈ জলে, যঁারা এ রাজ্যের নানা প্রান্তে ওই দুই ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখায় কাজ করছেন।অভিজ্ঞতাই বলছে, এসবিআই–এর সঙ্গে অন্য সহযোগী ব্যাঙ্কগুলির সংযুক্তির ফলে অনাদায়ী ঋণের সমস্যা তো মেটেইনি, বরং তা আরও খারাপ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে। এ–‌সবের পরেও, মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর রীতিকে অগ্রাহ্য করে রাজ্যের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করে, রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে কথাবার্তা না বলে হঠাৎ একতরফা কেন ব্যাঙ্ক–‌সংযুক্তির এত বড় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হল?‌ শুধু বাংলার নয়, এই ব্যাঙ্ক–‌সংযুক্তি সারা দেশের সাধারণ মানুষকেই বিপাকে ফেলবে জানিয়ে মমতা প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছেন, ইউবিআই–‌এর সঙ্গে পিএনবি এবং এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের সঙ্গে ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কের সংযুক্তিকরণ আদৌ ঠিক কাজ হবে না এবং তা যেন করা না হয়। পাশাপাশি তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কলকাতা থেকে এই দুটি ব্যাঙ্কের সদর দপ্তর সরানোও হবে বাংলাকে বঞ্চিত করার শামিল। শুক্রবার রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে  বিধানসভায় সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি মিডিয়ার হাতে তুলে দিয়ে বলেন, ‘অর্থনীতিতে ধস নামা শুরু হয়েছে। অামাদের মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র বাংলা নিয়েই নয়, অন্য রাজ্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।’

জনপ্রিয়

Back To Top