দীপঙ্কর নন্দী, সব্যসাচী ভট্টাচার্য, কলকাতা, শিলিগুড়ি, ২০ জানুয়ারি- এবার ‌নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (‌্ক্যা)‌ প্রত্যাহারের দাবিতে রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাব আনছে সরকার। 
সোমবার উত্তরবঙ্গে যাওয়ার সময়ে কলকাতা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের একথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি জানান, আগামী তিন চারদিনের মধ্যে বিধানসভায় এই প্রস্তাব আনা হবে। এর আগে আমরাই প্রথম এনআরসি ও ক্যাব–‌এর বিরুদ্ধে বিধানসভায় প্রস্তাব নিয়েছি। তখনও ক্যাব আইনে পরিণত হয়নি।‌ এদিকে সূত্রের খবর, শুক্রবার এই প্রস্তাব আনার জন্য বিধানসভার অধিবেশন বসতে পারে। 
এদিন শিলিগুড়ির সভায় মমতা ব্যানার্জি বলেন,  ‘‌‌আমি দেখলাম অনেকে অনেক কথা বলল কিন্তু সবাই মিটিংয়ে চলে গেল। আমি একা গেলাম না তবুও তো একজন প্রতিবাদ করেছে। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’‌‌‌ তিনি বলেন, ‘‌ভেবে দেখার জন্য আমি আবার সবাইকে বলছি। আপনাদের ভাল কথায় বুঝিয়ে দিয়েছে, বাবা মায়ের জন্মস্থান বা জন্মের শংসাপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তাহলে ফর্মে কেন র‌য়েছে?‌’‌ 
মমতা এদিন কলকাতা বিমানবন্দরে বলেন, ‘‌শুধুমাত্র অ–‌বিজেপি রাজ্যই নয়, বিজেপি–‌শাসিত রাজ্যগুলির কাছেও আবেদন করছি, সবাই প্রতিবাদ করুন। ‌এনপিআর–‌এর মধ্যে কিছু শর্ত রয়েছে। শর্তগুলি ভয়ঙ্কর। এই মুহূর্তে এনপিআর প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। এনপিআর–‌এর মোড়কেই রয়েছে এনআরসি।’‌ মমতা বলেছেন, ‘‌যারা এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করবেন না, তারা যদি মনে করেন এ নিয়ে বৈঠক করার প্রয়োজন আছে, তাহলে সেই বৈঠক কলকাতাতেও হতে পারে। তবে, সরস্বতী পুজো ও প্রজাতন্ত্র দিবস রয়েছে, এ সব অনুষ্ঠান হয়ে গেলে বৈঠক করা যেতেই পারে। কারও নির্দেশ আমরা মানব না। বাংলায় আমরা কিছুই করতে দেব না। বিজেপি ধর্মের নামে দেশ ভাগাভাগি করতে নেমেছে। ওদের কাছ থেকে আমরা হিন্দুত্ব শিখব না। স্বামী বিবেকানন্দ, গান্ধীজি ও নেতাজির আদর্শ নিয়ে আমরা চলি। আমরা মনীষীদের সম্মান করি। বিজেপি করে না।’‌ 
এদিন শিলিগুড়ির শিবমন্দিরে আঠারোখাই গ্রাম পঞ্চায়েতের মাঠে উত্তরবঙ্গ উৎসবের উদ্বোধনী মঞ্চেও একই সুরে প্রতিবাদের কথা বলেছেন। 
তিনি বলেন, ‘আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম ওটা (‌এনপিআর)‌ সেন্সাস, যখন দেখলাম কলাম করেছে, বাবা–মায়ের জন্মস্থান দিতে হবে, জন্মদিন দিতে হবে। এ তো আমিও দিতে পারব না, কোথা থেকে দেব?‌’‌ অন্য দলগুলোকে উদ্দেশ্য করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌‌আমি দেখলাম, অনেকে অনেক কথা বলল কিন্তু মিটিংয়ে চলে গেল। আমি যাইনি। একজন তো প্রতিবাদ করেছে। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’‌‌ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‌আমি আবার সবাইকে বলছি ভেবে দেখার জন্য। আপনারা মিটিংয়ে গিয়েছিলেন, আপনাদের ভাল কথায় বুঝিয়ে দিয়েছে, বাবা মায়ের জন্মস্থান বা জন্মের শংসাপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।’‌ এরপরই মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, ‘‌আপনি যখন মার্কশিট পান প্রত্যেকটা সাবজেক্টের জায়গা থাকে, আপনি যদি একটা পরীক্ষা না দেন তাহলে কি  আপনাকে পাশ বলে ঘোষণা করবে?‌ যদি নাম, জন্মদিন, জন্মস্থান, জন্মের শংসাপত্র কেউ না দেয়, তাহলে আসল সময় তঁাকে বাদ করে দেবে। মুখ্যমন্ত্রী জোরের সঙ্গে বলেন, ‘‌যে ইচ্ছে  তঁাদের কথায় বুঝুক, আমি বুঝছি না, আমি একটা কথা বুঝি, আইনে কাগজপত্রে যখন লেখা আছে, কাগজপত্র ঠিক না করা পর্যন্ত এটা করা যাবে না।’‌
এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা ছিল ভাগাভাগির বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘‌এদেশ কেন ভাগাভাগি করব?‌ মানুষ আমরা সবাই এক। সবাইকে ভাল থাকতে হবে, এক থাকতে হবে। দক্ষিণ–উত্তরে কোনও ভেদাভেদ নেই। বাংলায় যাঁরা থাকবেন তঁাদের কাছে একটা বার্তা যাওয়া দরকার। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য, আমরা কোনও ভাগাভাগিকে মদত দেব না।’‌ এরপরই মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, ‘‌এনআরসি নিয়ে চিন্তা করবেন না, আমি আছি, কেউ গায়ে হাত দিতে পারবে না, কিচ্ছু হবে না। কেউ অধিকার কাড়তে পারবে না। ক্যা–নিয়েও চিন্তা করবেন না, আমি আপনাদের সঙ্গে পুরোপুরি আছি, আমি আছি মানেই আমার সঙ্গে বাংলার ১০০ শতাংশ মানুষ আপনাদের সঙ্গে আছে, কে একটা কী বলল বাইরে তাতে কিছু যায় আসে না। এ রাজ্যটা আমাদের, এই মাটিটা আমাদের। ‌নিজেরা নিজেদের মতো ভাল করে কাজ করুন, চিন্তা করবেন না, ভোটের সময় আমরা পাহারাদার হিসেবে আসি না, বছরের প্রতিটা দিন সব সময় আমি আপনাদের পাহারাদার, ভোটের পাহারাদার নই। কিন্তু মানুষকে দেখবার পাহারাদার। মানুষের বিরুদ্ধে কোনও কাজ হোক এটা আমি কোনও দিন করতে দেব না। এটা আমার অভিরুচি নয়, এটা আমাদের সংস্কৃতি নয়।’‌
‌এদিন মুখ্যমন্ত্রী কলকাতা বিমানবন্দরে বলেছেন, ‘‌নাগরিক পঞ্জি, ক্যা প্রত্যাহারের দাবি নিয়ে আমরা অনেক মিছিল করেছি। বহু জনসভা হয়েছে। ধর্মতলায় ছাত্ররা অবস্থান করেছে। মহিলারা অবস্থান শুরু করেছে।’‌‌‌

 

 

সোমবার শিলিগুড়িতে উত্তরবঙ্গ উৎসবে আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন শিক্ষক রাজেন্দ্রনাথ দাসকে সংবর্ধনা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির। প্রসঙ্গত, রাজেন্দ্রবাবু এলাকায় ‘গান্ধীবুড়া’ বলে পরিচিত। ছবি: শৌভিক দাস

জনপ্রিয়

Back To Top