অযোধ্যা রায় নিয়ে বিরুদ্ধমত

অশোক গাঙ্গুলি, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি: সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, যেখানে নমাজ পড়া হয় সেটাকে মসজিদ হিসেবে অস্বীকারের উপায় নেই। এই যুক্তি মেনে যদি এগোই, তবে এটা সর্বজনস্বীকৃত সত্য যে, যখন থেকে ভারতের সংবিধান তৈরি হয়েছে তখন থেকেই ওই জায়গায় নমাজ পড়া হচ্ছিল। তাহলে সংবিধানে যে ধর্মাচরণের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, সেটা রক্ষা করার অধিকারও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আছে। এটা কোনও ঐতিহাসিক ব্যাপার নয়। এটা স্পষ্ট দেখা গেছে যে, এই মসজিদকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে ইসমাইল ফারুকির মামলা হয়। তাতে তৎকালীন কেন্দ্র সরকার বলেছিল, মসজিদ ভেঙে ফেলা জাতীয় লজ্জা। তখন কেন্দ্র সরকার তাদের শ্বেতপত্রে মসজিদটাকে ৫০০ বছরের পুরনো সৌধ বলে উল্লেখ করেছিল। লেখা হয়েছিল, মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফলে সাংবিধানিক মূল্যবোধকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। শনিবার, সেই সৌধের মালিকানা বিচার করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এএসআই–এর ভিত্তিতে কী করে বলে যে, ওখানে মন্দির ছিল?‌ এএসআই তো বলেনি ওখানে মন্দির ছিল। বলা হয়েছে, ওটার নীচে কোনও কাঠামো ছিল। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কীভাবে বলা হচ্ছে ওই জমি হিন্দুদের?‌ যেখানে সুপ্রিম কোর্ট বলছে, হিন্দুদের যে দাবি তার ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে যেমন কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায় না, সেরকম কাউকে মালিকানাও তো দেওয়া যায় না। যেখানে এটা স্পষ্ট যে, সংবিধানের সূচনা থেকেই ওই জায়গায় মসজিদ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের কর্তব্য, সংবিধানে যে ধর্মাচরণের অধিকারের কথা বলা আছে সেটাকে রক্ষা করা। সংখ্যালঘুরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে এসেছেন, ওই জায়গায় একটি মসজিদ রয়েছে। হঠাৎ সেটিকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তার ওপর মন্দির তৈরির যে রায় সুপ্রিম কোর্ট দিল, আমার পক্ষে তা মেনে নেওয়া শক্ত। ওই জমি ৩০০ বছর আগের। তার মালিকানা কি এখন সুপ্রিম কোর্ট ঠিক করবে?‌ কীভাবে ভোলা সম্ভব যে তার ওপর এতবছর ধরে একটা মসজিদ ছিল?‌ সংবিধান আসার পরও সেটা ছিল। সেটাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তো সুপ্রিম কোর্টের। সংবিধানের আগে কী ছিল সেটাকে রক্ষা করার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের নয়। কারণ তখন গণতান্ত্রিক ভারত ছিল না। তাই সংবিধান আসার আগে কোথায় মন্দির ছিল, কোথায় মসজিদ ছিল, কোথায় বৌদ্ধস্তূপ ছিল তার বিচার করতে বসলে তো অনেক মন্দির, মসজিদই ভাঙা পড়বে। ‌‌
(সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে)