আজকাল ওয়েবডেস্ক:‌ শরীরের লেগে থাকা নখের আঁচড়গুলোই বহন করছে বিগত কয়েক বছরের মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ইতিহাস। তা বেমালুম ‘‌অস্বীকার’‌ করে বাবাকে ‘‌পূর্ব–পরিকল্পিত’‌ভাবে‌ কুপিয়ে খুনের দায়েই মোকদ্দমা চালানো হবে তিন খাচাটুরিয়ান বোনের ওপর। শুক্রবার মস্কোর আদালতে তোলা হবে তিন বোনকে। কাঠগড়ায় উঠে জবাবদিহি করবে বড় দুই বোন ক্রিস্টিনা এবং অ্যাঞ্জেলিনা। খুনের সময় ছোট বোন মারিয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল, তাই তার ওপর অন্য ভাবে চলবে ‘‌খুনের মোকদ্দমা’‌।

 

বছর দু’‌য়েক আগের ঘটনা। মস্কোর একটি অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি থেকে উদ্ধার হয় মিখাইল খাচাটুরিয়ানের রক্তাক্ত দেহ। বুকে গলায় ছুরি দিয়ে কোপানোর চিহ্ন। খুনের পর নিজেরাই পুলিশে খবর দিয়ে আত্মসমর্পণ করে তিন কিশোরী। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ফ্ল্যাট অগোছালো দেখে তিন মেয়েকে ডেকে ওই সন্ধ্যায় প্রচণ্ড বকেছিলেন বাবা। ‘অপরাধে’র শাস্তি হিসেবে পেপার গ্যাসও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাদের মুখে। জ্ঞান হারিয়েছিল ক্রিস্টিনা। ক্ষোভে ওই রাতেই বাবাকে খুনের ‘‌পরিকল্পনা’‌ করে তিন মেয়ে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসের ওই ঘটনার পর গোটা রাশিয়াতে তোলপাড় পড়ে যায়। সংবাদমাধ্যম জুড়ে ক্রিস্টিনা, অ্যাঞ্জেলিনা এবং মারিয়াদের নিয়ে খবরের ছড়াছড়ি। তারপর বহু মাস কেটে গেলেও আলোচনা এখনও থিতিয়ে যাইনি। তিন বোনের বেকসুর খালাসের দাবিতে এখনও উত্তাল রাশিয়া। জমা পড়েছে লক্ষ লক্ষ আবেদন। চলেছে মিছিল, সহমর্মিতা দেখিয়ে কবিতা পাঠ বা থিয়েটার। রাশিয়ার মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলে দাবি জানিয়েছেন, ওই কিশোরীরা অপরাধী না, নিজের বাবার হাতেই শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতিত তারা। 
মাঝে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে এও সামনে আসে, খুনের আগে ওই তিন মেয়ে নাকি নিজেদের শরীরে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিল যাতে পরিষ্কার বোঝা যায়, প্রথমে আক্রমণ করেছেন তাদের বাবাই!‌ তারপরই তারা ঘুমন্ত মিখাইলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন করে এবং সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেয়। এরপর তদন্তেই খুলতে থাকে একাধিক জট। ঘটনার চার বছর আগে থেকেই তিন মেয়ের ওপর অকথ্য যৌন নির্যাতন চালাতেন মিখাইল। মেয়েদের ঘরবন্দি করে চলত মারধর, মানসিক নির্যাতন। বছর তিনেক আগে মস্কোর ওই ফ্ল্যাট থেকে মা অরেলিয়া ডানডাক–কে বের করে দিয়েছিলেন মিখাইল। 
মিখাইল যে প্রায়শই তিন মেয়ে এবং মাকে খুনের হুমকি দিত, সেই প্রমান সামনে রেখেছেন আলেক্সি লিপস্টার, তিন বোনের পক্ষে আইনজীবী। ছেলে বন্ধুর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের খবর জানতে পেরে মেয়েকে বাবার হুমকি, ‘‌খুন করব তোকে। তুই বেশ্যা। বেশ্যার মতোই মরবি!’‌ মেসেজে এই কথোপকথন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন লিপস্টার। এতেই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় গোটা ঘটনা। রাশিয়ার বহু মানুষের দাবী, অমানুষিক নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পেতেই বাবাকে খুন করেছে ক্রিস্টিনা, অ্যাঞ্জেলিনা এবং মারিয়া। তিন বোনের আইনজীবী আদালতে সওয়াল করেছেন, আত্মরক্ষা করতেই এই খুন!‌ তদন্তে মনোবিদরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিল তিন কিশোরী। চিকিৎসাশাস্ত্রে যাকে বলা হয় পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা পিটিএসডি। নিজেদেরকে বাঁচানো ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। নইলে বাবার হাতে মরতে হতো, মত তাঁদের। ২০১৯ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, রাশিয়ার ৪৭% মহিলা এবং ৩৩% পুরুষ মনে করেন, প্রাণে বাঁচতেই বাবাকে খুন করেছে তিন মেয়ে। 
গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে কড়া আইন নেই রাশিয়ায়। সে দেশের কত মানুষ নিজেদের ঘরেই শারীরিক–মানসিক নির্যাতনের শিকার, তার কোনও সঠিক পরিসংখ্যান নেই রাশিয়ার প্রশাসনের হাতে। তবে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাশিয়ায় জেলবন্দি ৮০% মহিলাই গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হয়ে খুন করে জেলে গেছেন। সে দিক দিয়েও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ তিন বোনের বিরুদ্ধে এই খুনের মামলা। কারণ বাবাকে খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ কুড়ি বছরের জেল হতে পারে এই তিনজনের। 
অবশ্য, এই ঘটনার অনেক আগে থেকেই গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে বিল পেশের দাবি জানাতে শুরু করেন মানবাধিকার কর্মীরা। উল্টে ২০১৭ সালে চার্চের চাপে পড়ে গার্হস্থ্য হিংসার পক্ষেই বিল পাশ হয়ে যায় রাশিয়ায়। বিলে বলা হয়, শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকলে তাকে হিংসা বলা যাবে না। কিন্তু খাচাটুরিয়ান কাণ্ডের পরে প্রশাসনের উপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। গত জানুয়ারি মাসে প্রসিকিউটরের দপ্তর থেকে মেনেও নেওয়া হয়, দীর্ঘদিনের শারীরিক মানসিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তিন কিশোরী। তদন্তকারী কমিটিকেও নির্দেশ দেওয়া হয়, পূর্ব–পরিকল্পিত খুনের মামলাকে বদলে আত্মরক্ষায় খুনের মামলা দায়ের করার জন্য। কিন্তু হঠাৎই সব বদলে গেল এই মে মাসে। ওই প্রসিকিউটরের দপ্তরই জানিয়ে দিল, পূর্ব–পরিকল্পিত খুনের দায়েই মামলা সাজানো হবে ওই তিন খাচাটুরিয়ান বোনের বিরুদ্ধে।

জনপ্রিয়

Back To Top