Padma Bridge: ‌বর্ণময় উৎসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ্মা সেতু উদ্বোধন

জয়ন্ত আচার্য, ঢাকা:‌ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার সকালে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে বর্ণময় উৎসবের মধ্য দিয়ে বহুল প্রতীক্ষীত পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন।

এই উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখেন। হাসিনা বলেন, ‘‌আজ পদ্মার বুকে জ্বলে উঠেছে লাল, নীল, সবুজ, সোনালি আলোর ঝলকানি। ৪১টি স্প্যান যেন স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘‌আমি জানি আজকে বাংলাদেশের মানুষ গর্বিত। সেই সঙ্গে আমিও আনন্দিত, গর্বিত এবং উদ্বেলিত। অনেক বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে এবং ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আজকে আমরা এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছি। এই সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এই সেতু দুই পারের যে বন্ধন সৃষ্টি করেছে শুধু তাই নয়। এই সেতু শুধু ইট–সিমেন্ট–স্টিল–লোহার কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয়, এ সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা আর মর্যাদার প্রতীক।’‌ তিনি বলেন, ‘‌এই সেতু বাংলাদেশের জনগণের। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, আমাদের সৃজনশীলতা, আমাদের সাহসিকতা, সহনশীলতা আর আমাদের প্রত্যয়। এবং এই জেদ যে, এই সেতু আমরা তৈরী করবোই। যদিও ষড়যন্ত্রের কারণে এই সেতুর নির্মাণ দুই বছর বিলম্বিত হয়। কিন্তু আমরা কখনো হতোদ্যম হইনি, হতাশায় ভুগিনি, আত্মবিশ্বাস  নিয়ে এগিয়ে চলেছি এবং শেষ পর্যন্ত সকল অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর পথে যাত্রা করতে সক্ষম হয়েছি।’‌ 
বাংলাদেশের জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের সেই অমোঘ মন্ত্র ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না  পুনরুল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‌কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, আমরা বিজয়ী হয়েছি।’‌ 
তারুণ্যের কবি সুকান্তের ভাষায় তিনি বলেন, ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে–মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ হাসিনার কথায়, ‘‌আমরা মাথা নোয়াইনি, আমরা কোনদিন মাথা নোয়াব না, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও কখনও মাথা নোয়াননি, তিনি আমাদের মাথা নোয়াতে শেখাননি, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি জীবনের জয়গান গেয়েছেন। তিনি বাংলার মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতা চেয়েছিলেন এবং তাঁরই নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি।’‌ 
জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তাঁর এবং তাঁর সরকারের পথচলা উল্লেখ করে বাংলাদেশের সরকার প্রধান বলেন, ‘‌তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আজকে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।’‌
 সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। মন্ত্রী পরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম পদ্মা সেতুর নির্মাণ বিষয়ক সূচনা বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পকলা অ্যাকাডেমি নির্মিত দেশের বরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে থিম সং পরিবেশিত হয়। অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতুর ওপর একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়।
 প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে স্মারক ডাক টিকিট, সুভ্যেনির শিট, উদ্বোধনী খাম ও সিল মোহর এবং একশ টাকা মূল্যের স্মারক নোট প্রকাশ করেন। পদ্মা সেতু নির্মাণকারী সংস্থার তরফে প্রধানমন্ত্রীকে পদ্মা সেতুর একটি রেপ্লিকাও উপহার দেওয়া হয়। এরপরই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথম ব্যক্তি হিসেবে টোল দিয়ে সেতুর মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ফলক ও ম্যুরাল–১ উন্মোচন করেন এবং মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা এবং বাংলাদেশের অটিজম আন্দোলনের পথিকৃৎ সায়মা ওয়াজেদ উপস্থিত ছিলেন। পদ্মা সেতু ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। বিমান বাহিনীর একটি মনোজ্ঞ ডিসপ্লেও উপভোগ করেন হাসিনা।
 এরপর তিনি পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে মাদারীপুরের কাঠাল বাড়ির বিশাল সমাবেশে বক্তব্য রাথেন। সমাবেশে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘‌আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রমানিত হয়েছে বাঙালি ও বাংলাদেশকে দমিয়ে রাখা যাবে না।’‌ পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে গোটা বিশ্ব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। অভিনন্দন জানিয়েছে ভারত, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস বিবৃতিতে বলেছে, ‘‌পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করবে, বাণিজ্যকে উৎসাহিত করবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।’‌ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, ‘‌পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ সমাপ্তিতে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সেদেশের জনগণকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।’‌ ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন থেকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‌যুগান্তকারী এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তিতে ভারত সরকার ও জনগণ বাংলাদেশের সরকার ও জনগণকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত এই প্রকল্পটির সমাপ্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্ত ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের সাক্ষ্য দেয়। পদ্মা সেতু শুধু আন্তঃবাংলাদেশ যোগাযোগকেই উন্নত করবে না, এটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাধারণ অঞ্চলগুলোকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে দরকারি লজিস্টিকস্ ও ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় গতি প্রদান করবে। এই সেতুটি আমাদের দ্বিপাক্ষিক ও উপ–আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’‌ রবিবার ভোর ৬টা থেকে পদ্মা সেতু সাধারণের জন্য খুলে দেওয় হবে। ফলে  সড়ক পথে ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব কমবে কলকাতার। মাত্র ৫ ঘণ্টায় ঢাকা খেকে কলকাতা পৌঁছে যাওয়া যাবে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়া আগরতলার কলকাতাগামী বাসগুলো ৭–৮ ঘণ্টায় পৌঁছে যাবে। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সর্বত্র বর্ণাঢ্য উৎসব চলছে। 

আরও পড়ুন:‌ হাসপাতালের কার্নিশ থেকে হাত ফসকে পড়ে গেলেন মানসিক রোগী!‌ চাঞ্চল্য মল্লিকবাজারে

 

 

আকর্ষণীয় খবর