অনাম্বর আদিত্য় চৌধুরী, প্য়ারিস: প্রেমের শহর, কবিতার শহর, চেনা প্যারিসের সঙ্গে লক ডাউন প্যারিসের কোনই মিলই খুঁজে পাচ্ছি না। এ–শহর এখন একদম অচেনা। যে শহরের এলোমেলো মানুষগুলোকে কথা শোনাতে সরকারের নাভিশ্বাস ওঠে, গত বছর দুয়েক যে শহর কখনও প্রতিবাদে, কখনও ধর্মঘটে সংবাদ শিরোনামে, ঘরের থেকে ক্যাফে, পাবে, পার্কে থাকতেই যার বাসিন্দারা বেশি পছন্দ করে, সেই শহর আতঙ্কে গুটিয়ে রয়েছে। আমি বছর তিনেক প্যারিসের বাসিন্দা। পি এইচ ডি করছি ইউনির্ভাসিটি অফ প্যারিস এইট এ। থাকি ইউনিভার্সিতেয়ার বলে একটা ক্যাম্পাসে। সেখানে বিভিন্ন দেশের মাস্টার্স, পিএইচডি, আর পোস্ট–ডক গবেষকরা থাকে।
এখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব ভবন আছে। যেমন, আমাদের ইন্ডিয়া হাউস। সেখানে অবশ্য ২৫% অন্য দেশের গবেষক থাকতে পারেন। ভারতীয় দূতাবাসের নিয়ন্ত্রণ আছে এর ওপর। আমাদের সঙ্গে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ।

তিন সপ্তাহ আগে থেকে লক ডাউনের কথা শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমরা তেমন গুরুত্ব দিইনি। সারাদিন ব্যস্ততা থাকে ইউনিভার্সিটিতে, সন্ধেবেলা ফিরে কিছু খেয়ে নিয়েই আবার পরদিনের প্রস্তুতি নেওয়া, আর মাঝেসাঝে হাতে গোনা ক’‌জন বাঙালির সঙ্গে কমন রুমে টুকটাক আড্ডা— এভাবেই কাটছিল জীবন। হঠাৎই সব এলোমেলো করে দিল করোনা।
আমাদের ক্যাম্পাসে প্রতি উইকেন্ডে কোন না কোন হাউসে পার্টি লেগেই থাকে। বিশাল ক্যাম্পাসের মাঠে স্পোর্টস টুর্নামেন্ট, গানের আসর কি না হয়। কিছু না থাকলে পায়চারি করতাম, একই বিল্ডিংয়ে থেকেও যাদের সঙ্গে সারা সপ্তাহ দেখা হত না, তাঁদের সঙ্গে টুকটাক আড্ডা হত, সবই এখন অতীত। আমরা ক’‌জন বাঙালি অবশ্য আড্ডার নেশা ছাড়তে পারিনি, তবে এখন ভরসা জুম বা স্কাইপ। মাঝে মাঝে যে যার বারান্দায় বেরিয়ে গিটার হাতে চেঁচিয়ে গান জুড়ছি ঠিকই, কিন্তু এমনটা কি প্যারিসকে মানায়? এই শহরের সঙ্গে যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সান্নিধ্য ব্যাপারটা।

এই তো সেদিন পর্যন্ত পাক্কা ফরাসি স্টাইলে দেখা হলেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গালে গাল ঠেকিয়ে বা জড়িয়ে ধরে অভিবাদন জানিয়েছি। এখন সেসব স্বপ্ন মনে হয়। প্যারিসের রাস্তায় বেরোতে গেলে এখন সবাইকে ডিক্লারেশন ফর্ম নিয়ে বেরোতে হয়। সঙ্গে রেসিডেন্ট কার্ডও রাখতে হবে। ফর্মে পরিষ্কারভাবে লিখতে হয় বেরোনোর কারণ। যদি পুলিশ ধরে আর যদি কেউ বোঝাতে না পারে সত্যিই বেরোনোর কারণ আছে, সোজা ৩৭০০ ইউরো জরিমানা। মানে ভারতীয় টাকায় তিন লাখেরও বেশি। কদিন আগে পর্যন্ত ছিল ৪০০ ইউরো। অথবা জেলও হতে পারে। বিদেশি ছাত্র-গবেষকদের জন্য অবশ্য অনেকটা ছাড়-১৩৫ ইউরো। সেই বা কম কী! এরপর কে আর সাধ করে বেড়াতে বেরোয়! লক ডাউনের আগে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রেখেছিলাম, কিন্তু অনেক কিছুই পাইনি। যেমন, চাল ছিল না কোনও সুপার মার্কেটে।
তাই নদিন বাদে বেরিয়েছিলাম। কিছু ছবি তুললাম পথঘাটের। তবে নিয়ম, একা বেরোতে হবে এবং এক কিলোমিটারের বেশি যাওয়া বারণ।

বহু ভারতীয় লক ডাউনের আগে পরে দেশে ফিরে গেছে। আমি ফিরিনি। কলকাতায় আামার বাবা–মা নিজেদের বাড়িতে বন্ধ অবস্থায় রয়েছেন, আমার দাদা গত ষোলো বছর ধরে মেলবোর্নে থাকে। তবু আমি ফিরিনি। প্যারিসে লক ডাউনের আগে যখন সুপার মার্কেটগুলো ফাঁকা হয়ে আসছে, ইতালির ভয়াবহ অবস্থা আমাদের বুকে কাঁপন ধরাচ্ছে, যখন বুঝতে পারছি, যে কোনও দিন বিদেশের ফ্লাইট ঢোকা বন্ধ হয়ে যাবে ভারতে, আমার বন্ধুবান্ধবেরা যখন টিকিটের জন্য হন্যে হয়ে চেষ্টা করছে, তখনই ভারতীয় দূতাবাস থেকে পরামর্শ, করোনা ভাইরাস আমার ভিতর ঘুমিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু একইসঙ্গে আমাকে বাহক হিসেবে ব্যবহারও করতে পারে। মনে হল, দেশে ফিরলে যদি বাবা-মায়ের সংক্রমণ হয় আমার থেকে, যদি অন্য অনেকের হয়, তাহলে কী হবে। জানি না এই ভাবনাটা অন্যরা কতটা সমর্থন করবেন, বা আদৌ করবেন কি না।
দিনে তিনবার করে ফোন করছি কলকাতায়, দুশ্চিন্তা তো যাওয়ার নয়। আপাতত এটুকু বলতে পারি, এই লক ডাউন পিরিয়ড আমার মতো প্রবাসীদের জীবনে একটা বড় অভিজ্ঞতা হয়ে রয়ে যাবে, যতদিন বাঁচব।

জনপ্রিয়

Back To Top