সংবাদ সংস্থা, মেলবোর্ন, ৩০ মে- ভারতের মতো জনবহুল দেশে লকডাউন শিথিল করা মানে সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়া। কিন্তু লকডাউন জারি রাখাটাও একটা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবাস্তবতা। এই ছুরির ধারের ওপর দিয়ে সাবধানে পা ফেলে, ভারসাম্য রেখে হেঁটে যেতে হবে ভারতকে। এ ভাবেই সতর্ক করলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেলজয়ী অস্ট্রেলীয় গবেষক পিটার চার্লস ডোহার্টি। মেলবোর্ন থেকে এক ই–মেল সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, কোভিডের প্রতিষেধক সাধারণের জন্য সহজলভ্য হতে এখনও অন্তত নয় থেকে বারো মাস। প্রতিষেধক আবিষ্কারে যে কটা গবেষণা চলছে, তাতে সাফল্য আসতে খুব তাড়াতাড়ি হলেও সেপ্টেম্বর–অক্টোবর হয়ে যাবে। তার পর কী ধরনের প্রতিষেধক, কত তাড়াতাড়ি সেটা তৈরি করা যাবে, তার ওপর নির্ভর করছে কবে তা বাজারে আসবে। তবে এখানে আশার কথা একটাই, যে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অত প্রকারভেদ কোভিড–১৯ ভাইরাসের নেই। একটি প্রতিষেধকই সর্বত্র, সব রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এবং একবার প্রতিষেধক চলে এলে, যূথবদ্ধ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, বা ‘‌হার্ড ইমিউনিটি’‌ নিয়েও ডোহার্টি যথেষ্ট আশাবাদী। যেখানে অন্তত ৬০ শতাংশ লোক আক্রান্ত হবেন এবং একসঙ্গে তঁাদের চিকিৎসা চলবে।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্নের ডোহার্টি ইনস্টিটিউটের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত পিটার ডোহার্টি ১৯৯৬ সালে ওষধিবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। তঁার গবেষণার বিষয় ছিল, মানব দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে ভাইরাস সংক্রমিত কোষগুলিকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে। এখন করোনা সংক্রমণ রুখতে বিভিন্ন দেশে লকডাউন যে ক্রমশ তুলে নেওয়া হচ্ছে, সে সম্বন্ধে ডোহার্টির বক্তব্য, ঘরবন্দি থাকলে সংক্রমণ হবে না, এটা কোনও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়। যদি তাই হত, তা হলে সর্বত্র লকডাউন জারি রাখলেই হয়ে যেত। কিন্তু সেটা অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবেও অবাস্তব। কিন্তু লোকে যদি সচেতন হয়, দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়, তার পাশাপাশি যদি ব্যাপক হারে পরীক্ষা হয়, দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরিকাঠামো থাকে, তা হলে সংক্রমণের হার কম থাকবে, এমনটা আশা করা যেতে পারে। কিন্তু ভারতের মতো জনবহুল দেশে সেটাও বেশ কঠিন একটা বিষয়। কাজেই লকডাউন অথবা নিজের দেশের সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ রেখে ব্যাপক হারে পরীক্ষা— এটাই উপায়। দক্ষিণ কোরিয়া যেটা করেছে। কিন্তু নাগরিকরা যদি শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়, তবে বিত্তবান দেশে সেই পথে সাফল্য পাওয়া সহজ। নয়তো প্রতিষেধক আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া উপায় নেই। যদিও যে দেশে আগে থেকেই অনেক লোক সংক্রমিত হয়েছেন, সেখানে সীমান্ত বন্ধ করে দিয়ে লোককে আসতে না দেওয়ার কোনও যুক্তি ডোহার্টি দেখেন না। অবশ্য যদি সরকার দায়িত্ব এড়াতে চায়, বা যথেষ্ট লোকের চিকিৎসার ব্যবস্থা দেশে না থাকে, তবে লকডাউনই গত্যন্তর।
কোভিড–১৯ আসলে গবেষণাগারে তৈরি কৃত্রিম জীবাণু বলে যে দাবি উঠছে, তাও খারিজ করেছেন নোবেলজয়ী এই বিশেষজ্ঞ। বরং তিনি নিশ্চিত যে, এটি একেবারেই প্রকৃতিজাত। না হলে আন্তর্জাতিক উড়ানের যাত্রীদের মাধ্যমে, বা সমুদ্রে ভাসমান জাহাজেও এই ভাইরাস এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারত না। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ওষুধটির ব্যবহার নিয়েও নিজের দ্বিমত জানিয়েছেন ডোহার্টি। বলেছেন, অবিলম্বে করোনা রোগীদের ওপর ম্যালেরিয়া সারানোর ওই ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বন্ধ হওয়া দরকার। করোনা আক্রান্ত হওয়ার আগে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নির্দিষ্ট হারে নিলে কোনও সুফল হলেও হতে পারে। কিন্তু সেটা চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে, কারণ করোনায় এই ওষুধের সাফল্য–ব্যর্থতা নিয়ে আদৌ যথেষ্ট পরীক্ষা–নিরীক্ষা হয়নি। যথেষ্ট তথ্য চিকিৎসকদের হাতে নেই। তা হলে কি প্লাজমা থেরাপি বেশি নির্ভরযোগ্য?‌ পিটার ডোহার্টির সোজাসাপ্টা জবাব, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের থেকে বেশি নির্ভরযোগ্য তো বটেই। বিশেষত যদি দেখা যায়, করোনামুক্ত রোগীর রক্তের প্লাজমায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে গেছে, তা হলে তো অবশ্যই।‌

পিটার চার্লস ডোহার্টি

জনপ্রিয়

Back To Top