জাদুকররা অনেক সময়েই এমন খেলা দেখান, যাতে জীবনের ঝুঁকি থাকে। আর সেই ঝুঁকির কারণে কখনও প্রাণও যায়। যেমন ঘটল জাদুকর ম্যানড্রেক ওরফে চঞ্চল লাহিড়ীর ক্ষেত্রে। যে খেলাটি ম্যানড্রেক দেখাতে গিয়েছিলেন, জাদুর পরিভাষায় তাকে বলে ‘‌এসকেপ’‌–‌এর খেলা। বিশ্বের তাবড় তাবড় জাদুকরের ভয়ঙ্কর সব খেলা আর দু্র্ঘটনা নিয়ে লিখলেন সমীরকুমার ঘোষ। 

 

ম্যাজিক মানেই যা বাস্তবে সম্ভব নয়, তাকে সম্ভব হতে দেখা। যাঁরা দেখান, তাঁদের কেমন যেন অন্য জগতের লোক বলে মনে হয়। মনে হয়, ইচ্ছা করলে ওঁরা যা খুশি করতে পারেন। সাধারণের এই উচ্চ ধারণাকে উচ্চতর করতে জাদুকররা অনেক সময়েই মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন প্রকাশ্যে, এমন খেলাও দেখান, যাতে জীবনের ঝুঁকি থাকে। আর সেই ঝুঁকির কারণে কখনও বেঘোরে প্রাণটাও যায়। যেমনটি ঘটল জাদুকর ম্যানড্রেক ওরফে চঞ্চল লাহিড়ীর ক্ষেত্রে। যে খেলাটি ম্যানড্রেক দেখাতে গিয়েছিলেন, জাদুর পরিভাষায় তাকে বলে ‘‌এসকেপ’‌–‌এর খেলা। হাত–‌পা বেঁধে বাক্স, থলে ইত্যাদি পুরে দেওয়া এবং জাদুকরের সেখান থেকে বেরিয়ে আসা, থলে–‌বাক্স যেমন কে তেমন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও। জাদুকররা এই খেলা প্রকাশ্যে দেখান বিপুল প্রচারের জন্য। পরিভাষায় ‘‌পাবলিসিটি স্টান্ট’‌। যেমন, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি বা তাজমহল ভ্যানিশ। মুখে মুখে গল্প রঙিন থেকে রঙিনতর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এসকেপ বা পলায়নী খেলা দেখাতে গিয়েই অনেকে মারা পড়েছেন। এই খেলায় যিনি প্রবাদপ্রতিম, তিনি হ্যারি হুডিনি। আর্থার কোনান ডয়েল মনে করতেন ওঁর অলৌকিক ক্ষমতা আছে। এমনটি মনে করা হত হুডিনির প্রায় সমসাময়িক ভারতীয় জাদুকর গণপতি চক্রবর্তী সম্পর্কেও। ওঁর ‘‌ইলিউশন বক্স’‌ ও ‘‌কংসের কারাগার’‌ কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিল। লোকে পাগলের মতো দেখতে ছুটত। বিশ্বখ্যাত জাদুসম্রাট পি সি সরকারও এই এসকেপের খেলা দেখিয়ে সাড়া ফেলেছিলেন। ১৯৩৭–‌এ চীনে এক বিশেষ দ্রুতগামী রেলগাড়ির সামনে লাইনে হাতকড়া দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল। মাত্র ৩৮ সেকেন্ডে নিজেকে মুক্ত করে দেশ–‌বিদেশে সাড়া ফেলেছিলেন। ওঁর পুত্র পি সি সরকার জুনিয়রও ডায়মন্ড হারবারের স্যান্ড হেডসের কাছে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেওয়া বাক্স থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। সেটা ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯।
এসকেপের খেলা নিয়ে আলোচনার আগে যে খেলা দেখাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি জাদুকর প্রাণ হারিয়েছেন, সেই খেলার নাম ‘‌ক্যাচিং দ্য বুলেট ট্রিক’‌। দাঁত বা হাত দিয়ে বন্দুক বা পিস্তলের ছুটে–‌আসা গুলিকে ধরা। 
জাদু জগতে হ্যারি হুডিনির মতো বেপরোয়া ও ডানপিটে আর জন্মাননি। বহুবার তিনি মৃত্যুর দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। সেই হুডিনি একবার চ্যালেঞ্জ হিসাবে বুলেট ধরার খেলা দেখাবেন ঠিক করেন। এই সর্বনেশে ও অভিশপ্ত খেলা দেখানো থেকে তাঁকে নিরস্ত করেন পিতৃসম প্রবীণ মার্কিন জাদুকর হ্যারি কেলার। বলেছিলেন, তুমি যত হুঁশিয়ারই হও না কেন, এ খেলায় বিপদের ঝুঁকি থাকেই। বিশ্বে দুটো হুডিনি হবে না, তাই তাকে হারালে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। আধুনিক জাদুবিদ্যার জনক বলা হয় রবেয়ার উদঁাকে (‌Rebert Houdin‌)‌। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই ফরাসি জাদুকরের আত্মস্মৃতিতেও এই দুর্ঘটনার উল্লেখ মেলে। উদাঁর জাদুগুরু ছিলেন এক কাউন্ট পুত্র এদমঁ দ্য গ্রিসি। খেলা দেখাতেন টরিনি নামে। তাঁর বুলেট ক্যাচিং খেলাটি ছিল ‘‌সন অফ উইলিয়াম টেল’‌ নামে। সেই সুইস বীরের ছেলের মাথায় আপেল রেখে তীর দিয়ে দুখণ্ড করার কাহিনী। খেলায় টরিনির ছেলে জিওভানি মাথায় না রেখে আপেল ধরে রাখতেন মুখে। টরিনি ইশারা করলে এক দর্শক জিওভানিকে লক্ষ্য করে গুলি চালাত। দেখা যেত, গুলিটা আপেলে আটকে রয়েছে। পিস্তলে নকল গুলি ভরা হত। ঘোড়া টিপলে আওয়াজ, আগুন, ধোঁয়া সব হত, কিন্তু গুলি ছুটত না। আপেলের ভেতর থাকত অন্য গুলি। ১৮২৬ সালে স্ট্রাসবুর্গ শহরে খেলা দেখানোর সময় পিস্তলে নকল গুলির বদলে আসল গুলিই ভরা হয়ে গিয়েছিল। টরিনি খেয়াল করেননি। তাঁর নির্দেশে দর্শক গুলি চালালে বালক জিওভানি সেখানেই আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ে। টরিনির এই দুঃখজনক পরিণতির কারণেই উদঁা কখনও এই খেলায় কোনও মানুষকে ব্যবহার করতেন না। ছুরির ফলায় বেঁধানো আপেলকে লক্ষ্য করে গুলি করা হত। আপেলের ভেতর থেকে বের করা হত গুলি।
রামস্বামী নামে এক ভারতীয় জাদুকর ইংল্যান্ডে গিয়ে জাদুর খেলা দেখিয়ে নাম করেছিলেন উনিশ শতকের গোড়ায়। তাঁর দলেরও এক খেলোয়াড় মারা যান আয়ার্ল্যান্ডের ডাবলিন শহরে বুলেট ধরার খেলা দেখাতে গিয়ে। ভুল করে কৌশল–‌করা পিস্তলের বদলে আসল টোটাভরা পিস্তল দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। 
এরই বছর দুই পর আবার একই দুর্ঘটনা জার্মানির আর্নস্টাড শহরে। এবারের ঘটনা আরও মর্মান্তিক। পোল্যান্ডের বিখ্যাত জাদুকর ডি লিনস্কি খেলা দেখাচ্ছেন যুবরাজ স্ভারৎসবুর্গ জন্ডারহয়সেনের প্রাসাদে। এই খেলা দেখানোর ওপর ওঁর শুধু বিপুল অর্থলাভই নয়, আরও খ্যাতিও নির্ভর করছিল। নানা খেলা দেখিয়ে আসর জমিয়ে তোলার পর শুরু করেন সেই রোমহর্ষক হাত দিয়ে বন্দুকের গুলি ধরার খেলা। মঞ্চের একধারে দাঁড়িয়ে ছয় বন্দুকধারী সৈনিক। দর্শকেরা কার্তুজ পরীক্ষা করে দেওয়ার পর তারা নিজেদের বন্দুকে তা ভরে তৈরি। উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে জাদুকরের স্ত্রী মাদাম ডি লিনস্কি। লিনস্কির দাবি ছিল, বিশ্বে এই প্রথম কোনও মহিলা হাত দিয়ে বুলেট ধরতে চলেছেন। মাদামের মনে কু ডাকছিল। তাঁর স্বামী আস্বস্ত করেন এই বলে যে, তিনি আগেই সৈনিকদের শিখিয়ে–পড়িয়ে রেখেছেন কী করতে হবে। কয়েকবার মহড়াও করিয়েছেন। সেই সময় বন্দুকে পোরবার আগে কার্তুজের মুখটা দাঁত দিয়ে কেটে নিতে হত। সৈনিকদের বলে দেওয়া হয়েছিল, কার্তুজের মুখটা ছিঁড়ে নেওয়ার সময় তারা যেন বুলেটটাও মুখে পুরে নেয়। সেই কার্তুজ ভরে গুলি চালালে আওয়াজ হবে, গুলি ছুটবে না। মাদামের আশঙ্কাই সত্যি হল। লিনস্কির ইশারা পেয়ে সৈনিকেরা মাদামকে লক্ষ্য করে গুলি চালাল। প্রচণ্ড আওয়াজ করে গুলি ছুটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়লেন মাদাম। তাঁর দু হাতে তখনও ধরা ছটি আসল কার্তুজ, যেগুলি বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজের পর ধরে ফেলেছেন বলে দেখানোর কথা। একজন সৈনিক ভুল করেই হোক বা ইচ্ছে করে কার্তুজ থেকে বুলেট কামড়ে খুলে নেয়নি। সেই বুলেটেই মাদামের মৃত্যু। এই দুর্ঘটনার কিছুদিন আগেই লিনস্কির একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হয়। এবার স্ত্রী গেল, সঙ্গে ভাবী সন্তানও। কারণ মাদাম তখন সন্তানসম্ভবা। পত্নীর শোকে জাদুকর ডি লিনস্কি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন।
এর প্রায় একশো বছর পরে বিশ্বখ্যাত চীনা জাদুকর চুং লিং সু এই খেলা দেখাতে গিয়ে মারা যান। তাঁর বিখ্যাত খেলা ছিল— মঞ্চের একধারে দাঁড়িয়ে থাকা দুই বন্দুকধারী গুলি ছুঁড়বে, সেই বুলেট চুং লিংয়ের বুকের সামনে ধরে থাকা চীনে মাটির প্লেটে বাধা পেয়ে পড়বে স্টেজের ওপর। হাতে নিয়ে দেখা যাবে দর্শকদের চিহ্ন দেওয়া সেই বুলেট। চুং লিং অক্ষত। কিন্তু ১৯১৮–‌র ২৩ মার্চ সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল না। দর্শকেরা পরীক্ষা করার পর দুই বন্দুকধারী বুলেট ভরলেন বন্দুকে। চুং লিং সু দাঁড়ালেন বিপরীতে। স্ত্রী সুই সিন তাঁর হাতে তুলে দিলেন চীনা মাটির প্লেট। প্লেটটা বুকের সামনে ধরলেন বন্দুকের গুলি ঠেকানোর ভঙ্গিতে। জাদুকর মাথা হেলিয়ে ইঙ্গিত করতেই গুলি ছুটল। শুধু প্লেট নয়, গুলি একেবারে জাদুকরের ফুসফুস ভেদ করে চলে গেল। একবার কেঁপে উঠে মঞ্চে পড়ে গেলেন জাদুকর। এটা দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যা, তা নিয়ে বহু তর্ক চলেছে। এই মৃত্যুর পর আরেক রহস্যের জালও উন্মোচিত হল। দীর্ঘ ১৮ বছর চীনা জাদুকর হিসাবে খেলা দেখানো চুং লিং আসলে মার্কিন জাদুকর উইলিয়াম এল্‌সওয়ার্থ রবিনসন। নিখুঁত অভিনয়ের কারণে কেউ ধরতেই পারেনি। তাঁর স্ত্রী অলাইভ রবিনসনও চীনা রমণী সেজে দিব্যি চালিয়ে গিয়েছেন। এই চুং লিং সু একবার ভারতে এসে খেলা দেখিয়ে গিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ফিমার জাদুমেলায় প্রিন্স শীল বুলেট ধরার খেলাটি দেখিয়েছেন।
লাফায়েত নামে এক বিশ্বখ্যাত জাদুকরের অবশ্য দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হয়। মঞ্চের পিছনে একটা খিড়কি দরজা ছিল। জাদুর খেলা চলাকালীন যাতে কেউ সেদিক দিয়ে না ঢুকে পড়ে খেলার কৌশল জেনে ফেলে এই শঙ্কায় তিনি সেটিতে চাবি দিয়ে রাখতেন। একদিন কীভাবে মঞ্চের পর্দায় আগুন ধরে যায়। লাফায়েত খিড়কি দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়েও তালা লাগানো থাকায় পারেননি, মারা যান।
ফিরে আসি এসকেপের খেলায় এবং হুডিনিতে, যিনি বেঁচে থাকাকালীনই কিংবদন্তী হয়ে উঠেছিলেন। কোনও বন্ধনেই তাঁকে আটকে রাখা যেত না। তা থেকে ইংরেজিতে ‘‌হুডিনাইজ’‌ বলে একটা শব্দই তৈরি হয়েছে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতকড়া, রাশিয়ায় প্রিজন ভ্যান কিছুই তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। জার্মানিতে হুডিনিকে হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়ি, আর শেকল দিয়ে জড়ানো অবস্থায় নদীর জলে ফেলে দেওয়া হয়। এক মিনিট যায়, দু মিনিট যায়, তিন মিনিট যায়,  হুডিনি আর জল থেকে ওঠেন না। নদীতীরে শয়ে শয়ে লোক উৎকণ্ঠায় অধীর। সেই সময় ভুস করে ভেসে উঠলেন হুডিনি। হুডিনি ছিলেন ছোট থেকেই ওস্তাদ সাঁতারু। ডুবসাঁতারেও পটু। তাই বাঁধন থেকে মুক্ত হয়েও চট করে উঠে পড়তেন না, এতে খেলাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠত। জলের তলায় বাক্স থেকে পালানোর খেলাটি দেখান নিউ ইয়র্ক বন্দরে। খেলাটি ছিল এরকম— বড় কাঠের বাক্স। দর্শকেরা ভাল করে পরীক্ষা করে দেখবেন কোনো কারসাজি আছে কিনা। তারা ঠিক আছে বললে হুডিনিকে হাতকড়া ও পায়ে বেড়ি লাগিয়ে বাক্সে পুরে ডালাটা অনেকগুলো পেরেক ঠুকে আটকে দেওয়া হয়। বাক্সটির দু ধারে ওজন দিয়ে দড়ি দিয়ে জড়িয়ে বেঁধে জলে ফেলে দিতেই ওজনের টানে বাক্সটি জলের তলায় ডুবে যায়। যে স্টিমার থেকে নামানো হয়েছে, তাতে উদ্বিগ্ন দর্শকেরা। বেশ কিছুক্ষণ উদ্বেগপূর্ণ মুহূর্ত কাটার পর হুডিনি জল থেকে উঠে আসেন। বাক্স তেমনই বন্ধ। এই খেলায় ওঁর সহকারী জিম কলিনসের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাক্সটায় একটা কারসাজি ছিল, যেটা দর্শকেরা পরীক্ষা করেও ধরতে পারত না। একটা ছোট্ট চৌকো অংশ খুব ছোট্ট একটা যন্ত্রের সাহায্যে ভেতর থেকে খুলে ফেলা যেত। হুডিনি সেই পথেই বেরিয়ে এসে আবার যথাস্থানে লাগিয়ে দিতেন। পরে পরীক্ষা করেও দর্শকেরা ধরতে পারত না যে ওই জায়গাটা খোলা হয়েছিল। হুডিনিকে বাক্সে পুরে স্টিমারের ডেকে যখন তার ডালায় পেরেক মারার কাজ চলছে ততক্ষণ হুডিনি ভেতরে কৌশলে হাতকড়া ও বেড়ি খুলে বাক্সের গোপন দরজাটা আলগা করে রাখতেন। যাতে জলে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটা খুলে ফেলা যায়। সহকারী হুডিনির গোপন সঙ্কেত না পাওয়া পর্যন্ত বাক্স নামাতে দিতেন না। এমন ভান করতেন যেন বাক্স ভাল করে বন্ধ করার ব্যাপারেই তাঁর আগ্রহ বেশি। এত কিছুর পরেও যে বিপদের সম্ভাবনা ছিল না তা নয়। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে হুডিনি ছিলেন পাকা সাঁতারু। 
হুডিনির দুটি খেলা ছিল বেশ বিপজ্জনক একটি মিল্ক ক্যান আরেকটি চাইনিজ টর্চার সেল। প্রথমটি একটি ধাতুর তৈরি দুধের পাত্র, পরেরটি দেখানো হত কাচের বাক্সে। দর্শকদের সামনেই তাতে জল ভরা হত। তার ঢাকনায় দুটো ফুটো থাকত। সেখান দিয়ে পা বের করে বেঁধে মাথা ঝুলিয়ে হুডিনিকে নামিয়ে দেওয়া হত। ওপরের ঢাকাটি তালা বন্ধ করে দেওয়া হত। তারপর ক্যাবিনেটটিকে ঘিরে দিয়ে বাইরে হাতুড়ি হাতে দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকত দুজন। প্রয়োজনে কাচ ভেঙে হুডিনিকে উদ্ধার করার জন্য। কয়েক মিনিট কেটে গেলে দর্শকেরা উদ্বেগে কাচ ভেঙে ওঁকে বের করার জন্য চেঁচামেচি করত। সেই সময় হুডিনি পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসতেন। গা দিয়ে জল ঝরছে। টরচার সেল যেমন বন্ধ তেমনই। বহু বিশেষজ্ঞ এ নিয়ে মাথা ঘামিয়েও ঠিক কৌশলটা কী ধরতে পারেননি। 
হুডিনির অনুকরণে খেলা দেখাতে গিয়ে মারা গিয়েছেন অনেকেই। রয়ডেন জোসেফ গিলবার্ট রাইসোঁ ডি লা জেনেস্তা খেলা দেখাতেন জেনেস্তা নামে। মিল্ক ক্যান এসকেপের খেলা দেখাতে গিয়ে ঠিক সময়ে বেরিয়ে আসতে না পারায় প্রাণ হারান। জো বারাস হুডিনির অনুকরণে হাত–‌পা বাঁধা অবস্থায় সাত ফুট গভীর গর্তে স্বচ্ছ কফিনে নেমেছিলেন। গর্ত বোজাতে ট্রাক থেকে ফেলা হয়েছিল সিমেন্ট। তার চাপেই কফিন ভেঙে মারা যান জাদুকর। হুডিনি স্ট্রেট জ্যাকেট পরে প্রকাশ্যেও খেলা দেখাতেন। পায়ে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে ক্রেনে করে তাঁকে তোলা হত উঁচু বাড়িতে। উঠতে উঠতে হাজার মানুষের সামনেই খুলে ফেলে দিতেন জ্যাকেট। এই স্ট্রেট জ্যাকেট সময়ে খুলতে না পারায় ছুটন্ত গাড়ি পিয়ে দেয় জাদুকর চার্লস রোয়ানকে। এসকেপের খেলাকে আরও রোমাঞ্চকর করার জন্য ওপর থেকে তলোয়ার, আগুন ইত্যাদির আমদানি করা হয়। সেগুলো জাদুকরের ওপর পড়ার আগে তিনি নিজেকে মুক্ত করে সরে যান। এসকেপের এই খেলা দেখাতে গিয়ে মারা যান প্রিন্সেস টেঙ্কো, ২০০৭ সালে। ১০টি তলোয়ারের ফলা গিঁথে যায় শরীরে।
বাক্সয় ভরে নদী বা সমুদ্রে ফেলার খেলায় জাদুকর আগেই হাত–‌পায়ের বাঁধন খুলে তৈরি হয়ে থাকতে পারেন। দ্বিতীয়ত, জাদুকররা এই খেলা দেখান সাধারণত খালি গায়ে। ম্যানড্রেক গায়ে একগাদা পোশাক পরে জলে নেমেছিলেন। মানে, ওঁকে জলে ডুবিয়ে দেওয়ার পর হাত–‌পা খোলার প্রক্রিয়া শুরু করতে হত। সেজন্য দরকার বিপুল দমের। ওঁর পোশাকও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। থাকতে পারে গঙ্গায় চোরাস্রোত। ম্যানড্রেক এতগুলো প্রতিবন্ধকতা সামলাতে পারেননি। এর জন্য যথেষ্ট মহড়ার প্রয়োজন। দক্ষ সাঁতারুও হতে হয়।‌ 

ছবি: বিখ্যাত সেই ক্যাচিং দ্য বুলেট ট্রিক খেলা। দর্শক গুলি ছুঁড়ছেন। জাদুকর দঁাত দিয়ে ধরছেন সেই বুলেট।

জনপ্রিয়

Back To Top