শুভশ্রী দত্ত, লন্ডন: বছরটা শুরু হয়েছিল ভালভাবেই। ২০২০ সংখ্যাটার মধ্যে যে মজা আছে, সেটার জন্য একটা উত্তেজনা, একটা অদ্ভুত আনন্দ ছিল লোকের মনে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিপুল জয়ে ব্রিটেনের পরিস্থিতি বেশ একটা নিশ্চিন্ত জায়গায়। জানুয়ারি মাসে খবর পাওয়া গেল, চীনের উহানে নভেল করোনা ভাইরাস হানা দিয়েছে। কিন্তু বিশেষ পাত্তা দিল না ব্রিটিশ ক্যাবিনেট। তখন সবাই ভাবছে, এশিয়ার ওই প্রান্ত থেকে সেটা এই পর্যন্ত আসবেই না। ফেব্রুয়ারিতে স্কুল–কলেজের হাফ টার্ম ব্রেকে প্রচুর লোক ইতালি, ফ্রান্স বেড়াতে গেল। অনেক অ্যাডভেঞ্চার–প্রিয় মানুষ ছুটল স্কি রিসর্টগুলোতে। জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত লাখ দেড়েক ট্যুরিস্ট চীন থেকে এসেছিলেন ব্রিটেনে বেড়াতে। এ–সব চলছিল অন্য সব বছরের মতোই। এর পরই ব্রিটেনে ছড়াতে শুরু করল সংক্রমণ। যখন দেখা গেল ইওরোপের অন্যান্য দেশে মারাত্মক অবস্থা, তখনও ব্রিটিশ সরকার বলছিল, লকডাউন প্রয়োজন নেই। ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তুলতে হবে। ইতালি, স্পেনের মতো দেশ যখন সীমান্ত বন্ধ করে দিল, তখনও এ দেশের সীমান্ত খোলা। সেই সময়টা রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে কথাটা মনে হত, তা হল, আজ সংক্রমণ কত বাড়ল আর কতজনের মৃত্যু হল। তখনও কিন্তু অফিস তো বটেই, বাচ্চাদের স্কুল পর্যন্ত খোলা। মনে আতঙ্ক নিয়েই তাদের স্কুলে পাঠানো, নিজেরা কাজে বেরোনো নিয়ে মানসিক চাপ চরমে উঠেছিল। শেষমেষ ২৪ মার্চ আংশিক লকডাউন ঘোষণা হল। কিছুটা হলেও হঁাফ ছেড়ে বঁাচলাম। ততদিনে অবশ্য আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে পঁাচ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু তিনশোর কাছাকাছি। গত দু’মাসে যে সংখ্যাটা আড়াই লক্ষ এবং সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়েছে।
এখন লকডাউন তোলা নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পয়লা জুন থেকে বাচ্চারা স্কুলে যাবে। শোনা মাত্র বিরোধীরা চেঁচামেচি শুরু করেছেন। আর একটা কথা অবশ্য বরিস জনসন মন্দ বলেননি। লন্ডন শহরের ভেতর গাড়ি একেবারে কম চলতে দেওয়া হবে। ‘কার ফ্রি’ লন্ডন। বদলে পায়ে হঁাটা আর সাইকেল চালানোয় উৎসাহ দেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মানা সম্ভব, অন্যদিকে তেমনই দূষণ আর যানজট এড়ানো যাবে। সেজন্য সাইকেল হাবের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এখন যেমন বাচ্চাদের আর বুড়োদের বাসভাড়ায় ছাড় আছে, সেটা তুলে দেওয়ার কথা চলছে। যাতে তারা রাস্তায় কম বেরোয়। তবে সমীক্ষা বলছে, ব্রিটেনের মানুষ লকডাউন ওঠার জন্য আদৌ ব্যস্ত নন। বেশির ভাগ বলছেন, করোনা থেকে বঁাচতে যদি জুন–জুলাই পর্যন্তও লকডাউন থাকে, তা হলেও আপত্তি নেই। আসলে মানুষ খুব ভয় পেয়ে গেছেন। ভারতের মতো এখানে বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল নন মানুষ। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেয়। তারাও এত বড় মহামারীর জন্য প্রস্তুত ছিল না। সেই দিশেহারা অবস্থাটা আমজনতাকে খুব নাড়া দিয়েছে। মার্চের শেষদিকে সরকার নড়েচড়ে বসল। কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হল।
এতদিন হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার–নার্সের অভাবে খুব খারাপ পরিস্থিতি ছিল। এবার অবসরপ্রাপ্তদের ডাকা হল কাজে। প্রচুর বিদেশি, যার একটা বড় অংশ ভারতীয়, কাজ করেন ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে। তঁাদের ভিসার মেয়াদ অন্তত ছ’মাস করে বাড়ানো হল। বেসরকারি হাসপাতালগুলো নেওয়া হল কোভিড চিকিৎসার জন্য। লন্ডন, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহামে সেনাবাহিনীর সাহায্যে নতুন কোভিড হাসপাতাল তৈরি হল রাতারাতি। জাগুয়ার, ল্যান্ডরোভারের মতো নামী গাড়ি কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হল ভেন্টিলেটর তৈরির জন্য। তুরস্ক আর ভিয়েতনাম থেকে প্রচুর পিপিই আনানো হল। এখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি আর ইম্পিরিয়াল কলেজে জোরকদমে চলছে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাজ। তা ছাড়া সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করার জন্য প্রচুর প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কিন্তু পরিস্থিতি অনেকটাই হাতের বাইরে চলে গেছে মনে হয়। কত ছোট ব্যবসা ইতিমধ্যেই গুটিয়ে গেছে। ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড সতর্ক করে বলেছে, ৩০০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ সময় আসতে চলেছে। তবে সেই সঙ্গে আশার কথাও শুনিয়েছে। লকডাউন ওঠার বছর খানেকের মধ্যে ঘুরে দঁাড়ানোর সম্ভাবনা আছে অর্থনীতির। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়!

জনপ্রিয়

Back To Top