এফি ট্যাং
গুয়ানঝাও (‌চীন)‌, ১৬ মে

সবচেয়ে প্রথমে আক্রান্ত হয়েছিল চীন। আবার সবচেয়ে প্রথমে কাটিয়ে উঠেছিল বিপদ। এই পর্যন্ত অঙ্কটা মিলে গিয়েছিল ক’‌দিন আগেই। খানিকটা হাঁফ ছেড়েছিল চীনের মানুষ। কিন্তু ফের কম সংখ্যায় হলেও সংক্রমণের খবর আসছে আর আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেই দিয়েছে, এখনই করোনা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা নেই, আগামীদিনে গোটা পৃথিবীর মানুষকেই চলতে হবে করোনাকে সঙ্গে নিয়ে। তবু অনেক জায়গায় স্কুল-কলেজ খুলে যাওয়ায় সবাই কিছুটা হলেও হাঁফ ছেড়েছিল। সাংহাইতে ডিজনি ওয়ার্ল্ড খুলে যাওয়ার খবর শুনে মনে হয়েছিল যেন মাস দুয়েক পর একঝলক খোলা বাতাস বয়ে গেল দেশে। কিন্তু করোনার উৎসস্থল বলে ইতিমধ্যেই বিখ্যাত উহান আর রাশিয়া সীমান্তের গুলান শহর থেকে নতুন সংক্রমণের খবর আসায় আবার যেন ভয়ের কাঁটা বিঁধতে শুরু করেছে।
আমি যেখানে থাকি সেই গুয়ানঝাও কোনও দিনই তত করোনা–‌আক্রান্ত নয়। আসলে এত বড় দেশের সর্বত্র একরকম পরিস্থিতি হতে পারে না। তাই আমাদের শহরে কখনই লকডাউন হয়নি। কিন্তু লো রিস্ক জায়গা হওয়া সত্ত্বেও অনেক বিধিনিষেধ রয়েছে। মাস্ক তো বটেই, সুপারমার্কেট জাতীয় পাবলিক প্লেসে ঢুকতে গেলেই কিউআর কোড পরীক্ষা হবে। টেম্পারেচারও দেখা হবে। কিন্তু মানুষকে বাড়িতে বন্দি রাখার জন্য কোনও জোরাজুরি নেই। সারাক্ষণ টিভিতে, ইন্টারনেটে সরকার প্রচার চালাচ্ছে কোভিড নিয়ে। মানুষ গুরুত্ব বুঝে স্বেচ্ছায় যথাসম্ভব বাড়িতে থাকছে বা অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে। সব দোকানপাট খোলা, রেস্তোরঁাগুলোতে অবশ্য অনলাইন অর্ডার আর টেক অ্যাওয়ে চলছে। আমাদের সিচুয়ান ভোকেশনাল কলেজ অফ ইনফরমেশন টেকনোলজির যেসব ছাত্রছাত্রী ক্যাম্পাসে রয়ে গেছে, প্রতিদিন শিক্ষকেরা তাদের টেম্পারেচার মাপছেন, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন।
বাড়িতে যদিও ভালই কাটছে সময়, অনলাইনে কিছু কোর্সও করছি, কিন্তু কাজের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। বিদেশের যেসব ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যৌথ প্রকল্পের কথা চলছিল, সেগুলো হয় বাতিল হয়েছে নয় পিছিয়ে গেছে। আমি সরকারি কলেজে চাকরি করি বলে বেতন পাওয়ার সমস্যা নেই, এমনকী এই দুঃসময়ে ক্যাম্পাসে বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের দেখভাল করছি বলে সরকার আমাকে পুরস্কারও দিচ্ছে। কিন্তু চারপাশে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তো এরকম ভাল জায়গায় নেই। সরকার চেষ্টা করছে এর মোকাবিলা করতে। কারখানাগুলোতে উৎপাদন শুরু হয়েছে, ব্যাঙ্কগুলো কিছু সুযোগসুবিধা দিচ্ছে গ্রাহকদের, বাড়িওয়ালারা অনেকেই ব্যক্তিগত স্তরে ভাড়া মকুব করে দিচ্ছেন। গত জানুয়ারি থেকে যে অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছে চীনের জীবনযাত্রা, তাতে দেশের অর্থনীতিতে ধস নামতে বাধ্য। দেশে ও বিদেশে যে বিপুল পরিমাণ চীনা নাগরিক কর্মহীন হয়ে পড়ছেন, তাঁদের দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে আর সেজন্য চাপ বাড়বে। খুবই দুর্ভাগ্যজনক আজকের এই মন্দা। অর্থনীতিবিদেরা বলেছিলেন, ২০২০ সাল হবে চীনের অর্থনীতিতে বিরাট মাইলস্টোন। এ বছরই আমরা সম্পূর্ণ দারিদ্র‌্যমুক্ত হয়ে সত্যিকারের এক সচ্ছল সমাজ হয়ে উঠব। গত চার দশক ধরে চীনের অগ্রগতি সারা বিশ্বের চোখ ধঁাধিয়ে দিয়েছে। সেখানে একটা বড় ধাক্কা এসেছে সন্দেহ নেই। তবে আগামীদিনে নিশ্চয়ই চীন এই বিপদ কাটিয়ে উঠে আবার এগিয়ে যেতে পারবে।

জনপ্রিয়

Back To Top