সমীর দে: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে৷ তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷ খালেদার বড় ছেলে তারেক জিয়া–‌সহ অন্য ৫ আসামিকে দেওয়া হয়েছে ১০ বছরের কারাদণ্ড। এছাড়া দণ্ডিতদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ মোঃ আখতারুজ্জামান এই রায় দেন৷ রায়ের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারেই যেতে হবে। বিকেল সাড়ে ৩টে নাগাদ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদাকে ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিন খালেদার আদালতে আসার পথে বিএনপি কর্মীদের বিক্ষোভ থেকে সঙ্ঘর্ষ ছড়ায় ঢাকার রাস্তায়। পুলিসের সঙ্গে চলে দফায় দফায় যুদ্ধ, ভাঙচুর। জখম হন ২ পুলিসকর্মী। কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়তে হয় পুলিসকে। কোথাও আওয়ামি লিগের সমর্থকদের সঙ্গেও চলে সঙ্ঘর্ষ। সঙ্ঘর্ষ ছড়ায় দেশের অন্যান্য জায়গায়। নারায়ণগঞ্জে একজনের মৃত্যু হয়েছে। 
এদিন দুপুর সওয়া ২টোয় আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া৷ বিচারক তাঁর রায়ে বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় অপরাধ প্রমাণ হয়েছে৷ ২০০৮ সালের ৩ জুলাই সেনা–নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কুয়েত থেকে এতিমদের জন্য পাঠানো ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (‌দুদক)‌৷ ওই বছরেরই ৪ জুলাই মামলাটি গ্রহণ করে আদালত৷ তদন্ত শেষে দুদক–এর সহকারী পরিচালক হারুন অর রশিদ ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া, তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান–সহ ৬ জনের বিরুদ্ধে এই মামলায় অভিযোগপত্র দেন। রায়ে তাঁদের সবার সাজা হল। মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন— মাগুরার প্রাক্তন এমপি কাজি সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রাক্তন মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকি, বিএনপি–র প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগনে মোমিনুর রহমান। ৬ অভিযুক্তের মধ্যে খালেদা জিয়া জামিনে ছিলেন। কাজি সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদ জেলে। তারেক রহমান, কামালউদ্দিন সিদ্দিকি এবং মোমিনুর রহমান পলাতক। তারেক এখন ব্রিটেনে। সেখান থেকেই দল চালাবেন, এরকমই ঠিক হয়েছে। রায় ঘোষিত হওয়ার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন, তাতে দেশের ভাবমূর্তি খারাপ হয়। তবে এটাও প্রমাণ হল যে, যত ক্ষমতাধরই হোন না কেন, এদেশে দুর্নীতি ও অপরাধ করে কেউ পার পান না। উল্টো দিকে, বিএনপি–র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির বলেছেন, খালেদা জিয়া দেশের মানুষকে ভালবাসেন, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেন, তাই তাঁর প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পরিত্যক্ত কারাগারে
পুরনো ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারের দোতলায় রাখা হয়েছে বেগম খালেদা জিয়াকে। এখানে আগে বন্দি মহিলাদের বিউটি পার্লারের কাজ শেখানো হত। নিচের তলাটি ছিল ডে কেয়ার সেন্টার। কয়েক দিন আগেই ভবনটি ধোওয়া–মোছা করা হয়। বিকেলে খালেদাকে বিপুল পাহারায় এখানে নিয়ে আসা হয়। কারাগারে ভিআইপি–র মর্যাদা পেয়েছেন খালেদা, এমনটিই জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াঁ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় খালেদা জিয়াকে পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়েছে। এটি স্থায়ী বন্দোবস্ত?‌ না কি পরে স্থানান্তরিত করা হতে পারে?‌ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যে কোনও সময় যে কোনও সিদ্ধান্ত হতে পারে। এখন এখানে রাখছি, পরে অন্য পরিস্থিতি হলে তাঁকে সরিয়ে অন্য কোথাও নিতে পারি। ৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া এর আগে একবারই কারাগারে যান। তবে সেটি ছিল সংসদ ভবনের পাশে এমপি হস্টেলে বিশেষ কারাগার। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। পাশাপাশি আরেকটি ভবনের বিশেষ কারাগারে ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্ত হন খালেদা। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপি–তে যোগ দেন খালেদা জিয়া। এরশাদ–বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি আটক হন। তবে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়নি। 
বিলেতে তারেক
‌জানা গেছে, লন্ডনে ভোররাত থেকেই টিভি‌তে চোখ রাখছিলেন পলাতক খালেদা–‌পুত্র। নজর ব্রেকিং নিউজে। আশঙ্কাই সত্যি হল৷ দেখতে হল মায়ের জেলযাত্রার সংবাদ৷ ফেসবুকে তারেক রহমান লিখেছেন, ‘আমি তোমায় অনেক ভালবাসি মা।’ খালেদার এক ছেলে আগেই মারা গেছেন৷ তাঁর নাম আরাফত রহমান কোকো৷ অন্য ছেলে তারেক লন্ডন থেকেই বিএনপি দলের কাজ সামলান। জেলে যাওয়ার আগে বিএনপি জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে ছেলের হাতেই দলের ভার অর্পণ করেছিলেন খালেদা জিয়া৷ লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে সেই বৈঠকে যোগ দেন তারেক রহামন৷‌ বিএনপি–র স্থায়ী কমিটির সদস্য, সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, খালেদা জিয়ার অবর্তমানে বিএনপি–র চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব পালন করবেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান৷ সেন্ট্রাল লন্ডনের এডমন্টনে সপরিবার বসবাস তারেকের।

জনপ্রিয়

Back To Top