সংবাদ সংস্থা, প্যারিস/‌ মাদ্রিদ/‌ ওয়াশিংটন, ২৩ মার্চ- করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে‌–‌পড়া রুখতে বিশ্ব জুড়ে ৫০টিরও বেশি দেশের ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ এখন স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি। এর মধ্যে অন্তত ৩৪টি দেশে বাধ্যতামূলক ‘‌লক ডাউন’‌ ঘোষিত। অন্যত্র, সরকার নাগরিকদের প্রতি ‘‌আবেদন’‌ জানিয়েছে, ঘরের বাইরে না বেরিয়ে করোনা সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার। বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা আগেই জারি হয়েছিল ফ্রান্স, ইতালি, আর্জেন্তিনা, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, ইরাক এবং রোয়ান্ডায়। সবমিলিয়ে জনসংখ্যা প্রায় ৬৬ কোটি। সোমবার সকাল থেকে গ্রিস সেই তালিকায় যোগ দিয়েছে। কলম্বিয়াতে মঙ্গলবার থেকে চালু হয়ে যাচ্ছে বাধ্যতামূলক ঘরে থাকা। বুধবার থেকে নিউজিল্যান্ডেও। তবে এই সব দেশেই জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যঁারা যুক্ত, তঁারা কাজে যেতে পারছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বা ওষুধপত্র কিনতেও বাড়ির বাইরে যাওয়া যাচ্ছে।
সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়েছে, এমন তিনটি দেশ— ইরান, জার্মানি এবং ব্রিটেন মূলত নাগরিকদের বাস্তববোধ এবং শুভবুদ্ধির ওপরেই ভরসা রেখে তঁাদেরকে অন্তরিন থাকতে বলেছিল। আবেদন করেছিল, সামাজিক সংযোগ যতটা সম্ভব কম রাখতে। কিন্তু সেই নীতি ফলপ্রসূ হচ্ছে না। ব্রিটেনে শনি–রবিবার লোকে ভিড় করেছে সমুদ্রের ধারে, পার্কে বেড়াতে গেছে!‌ ইরানে গত সপ্তাহে হাজারে হাজারে লোক নিজেদের গ্রামের বাড়ি ফিরেছে পার্সি নববর্ষের উদ্‌যাপন করবে বলে। ফলে আরও কঠোর হতে চলেছে প্রশাসন। বুরকিনা ফাসো, চিলে, সার্বিয়া, মাউরিটানিয়া, ফিলিপিনসের রাজধানী শহর ম্যানিলাতে কারফিউ জারি হয়েছে। গোটা সৌদি আরবে কারফিউ জারি হয়ে গেছে সোমবার সন্ধে থেকে। কয়েকটি দেশ তাদের প্রধান শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এই তালিকায় আছে আলমাটি, কাজাকস্তানের নূর সুলতান এবং আজরবাইজানের বাকু।
দুনিয়া জুড়ে এই সতর্কতা প্রতি সেকেন্ডে আরও জরুরি হয়ে পড়ছে, কারণ করোনার সংক্রমণ এবং তার থেকে মৃত্যু, দুই–‌ই উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্পেনে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬২ জন মারা যাওয়ায়, সেদেশে মৃত্যুর সংখ্যা সোমবার ২০০০ ছাড়িয়ে গেছে। আমেরিকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৪১৯ হয়েছে, সংক্রমণের হার আচমকাই বেড়ে গিয়ে, এখন ৩৪ হাজার মার্কিন নাগরিক করোনা–আক্রান্ত। এঁদের মধ্যে আছেন কেন্টাকির সেনেটর র‌্যান্ড পল। তিনিই প্রথম সেনেটর, যিনি আক্রান্ত হলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এক–‌তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিককে এখন ঘরবন্দি থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দেশের যে তিনটি জায়গাকে সংক্রমণের আঁতুড়ঘর হিসেবে চিহ্নিত করতে পেরেছে, সেগুলো হল নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া এবং ওয়াশিংটন। তালিকার প্রথমেই আছে নিউ ইয়র্ক। সেখানে ১৫ হাজার নিশ্চিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে ৫৪১৮টি সংক্রমণ ঘটেছে গত ২৪ ঘণ্টায়। এখনও পর্যন্ত ১১৪ জন মারা গেছেন। একদিনেই প্রাণ গেছে ৫৮ জনের। নিউ ইয়র্কের উদ্বিগ্ন মেয়র বিল দে ব্লাসিও জানিয়েছেন, বড়জোর আর দিনদশেক। তারপর নিউ ইয়র্ক এক ভয়াবহ চিকিৎসা–‌সঙ্কটের মুখে পড়বে, কারণ ফুরিয়ে যাবে চিকিৎসার সরঞ্জাম, ওষুধপত্র। যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে, আরও বেশি ভেন্টিলেটার না পাওয়া গেলে লোককে স্রেফ মরতে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না!‌ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স হিসেব দিয়েছেন, এই মুহূর্তে আমেরিকায় করোনা–‌আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া এবং ওয়াশিংটনে বিপর্যয় পরিস্থিতি ঘোষণা করেছেন তিনি। জরুরি চিকিৎসার বাড়তি বন্দোবস্ত যত দ্রুত সম্ভব করে ফেলার জন্য সরকারি বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নিউ ইয়র্কে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করার প্রস্তাবেও সায় দিয়েছেন তিনি, যা একমাত্র যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেই করা হয়। ‘‌এটা কার্যত যুদ্ধই চলছে। সমগ্র জাতি আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত উতরে যাবই।’‌ সাহস জোগাতে বলেছেন প্রেসিডেন্ট।  
আমেরিকা–সহ বাকি বিশ্বের সংক্রমণ–‌পরিস্থিতি যদিও এই মুহূর্তে যথেষ্ট উদ্বেগজনক। করোনার উৎস–দেশ চীন এই মহামারীর প্রকোপ রুখে দিতে পেরেছে বলে দাবি করলেও অন্যান্য আক্রান্ত দেশে সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। এখনও পর্যন্ত ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ গেছে, আক্রান্ত তিন লক্ষেরও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‌হু)‌ আগেই করোনা ভাইরাসের নতুন ‘‌এপিসেন্টার’‌ বলে ঘোষণা করেছিল ইউরোপকে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইতালি। সেদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৫১ জনের প্রাণহানিতে মৃতের সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে ৫ হাজারে। এর আগে অবশ্য ইতালিতে একদিনে মৃত্যু হয়েছিল ৭৯৩ জনের। দেশে মড়ক লাগার রেকর্ড গড়েছিল ইতালি। সে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী একদিনে মৃত্যুর সংখ্যা কমলেও সংক্রমণের হিসেবে ইতালি চীনকেও পিছনে ফেলেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ হাজারের কাছাকাছি। প্রতিনিয়ত ইতালিতে বাড়ছে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা। ফ্রান্স এবং স্পেনেও অবস্থা যথেষ্ট সঙ্কটজনক। স্পেনে জরুরি অবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধি করে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো স্যাঞ্চেজ।

জনপ্রিয়

Back To Top