অরুণাভ দাস, কুনমিং: বাংলায় বিনিয়োগ টানতে সদ্য চীন ঘুরে এল বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ১৪ সদস্যের এক প্রতিনিধিদল। চেম্বার সভাপতি সত্যম রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে তঁারা যোগ দিয়েছিলেন তৃতীয় চায়না–‌সাউথ এশিয়া কো‌অপারেশন ফোরামে। কুনমিং থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে য়ুক্সিতে ১০ ও ১১ জুন অনুষ্ঠিত হল এই আন্তর্জাতিক ফোরাম। বাণিজ্য ছাড়াও দারিদ্র‌্য দূরীকরণ, সাধারণ মানুষের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর মতো বিষয়গুলি নিয়েও আলোচনা হল দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে।
বিএনসিসিআই সদস্যরা জানিয়েছেন, আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তিকে তুলে ধরেছেন তঁারা। ‘‌পশ্চিমবঙ্গে মানবসম্পদের অভাব নেই। সেই সঙ্গে পরিবেশও ব্যবসার অনুকূল। আমরা চাই, চীন তথা আশিয়া‌ন–‌সদস্য দেশগুলি ‌এ ব্যাপারে আগ্রহী হোক।’‌ এভাবেই পশ্চিমবঙ্গকে তুলে ধরলেন সত্যম রায়চৌধুরী তঁার ভাষণে। ‘‌অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ–‌ক্ষেত্রে সহযোগিতার লক্ষ্যে শিল্প টানার সম্ভাবনা জোরদার হোক’‌ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তা হিসেবে তিনি আরও বলেন, ‘‌আমি বিশ্বাস করি, চীনের শিল্পোদ্যোগীদের কাছে বিনিয়োগের জন্য পশ্চিমবঙ্গ যথেষ্ট আকর্ষণীয় জায়গা। আমাদের রাজ্যের সরকার এ‌জন্য দরজা খোলা রেখেছে বরাবর। এত শিল্পবান্ধব পরিবেশ আর কোথাও পাবেন না। আমি কথা বলেছি চীনের য়ুনান প্রদেশের সরকার ও স্থানীয় চেম্বারগুলির সঙ্গে, যাতে তঁারা পশ্চিমবঙ্গে নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে উৎসাহ দেন ব্যবসায়ীদের। বিশেষ করে পরিকাঠামো, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, তথ্য‌প্রযুক্তি, কৃষি–‌সরঞ্জামের মতো ক্ষেত্রে লগ্নির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমার মনে হয়।’‌
পূর্ব ভারতের সর্ববৃহৎ শিক্ষা গোষ্ঠী টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ–‌এর ম্যানেজিৎ ডিরেক্টর হিসেবে প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতার নিরিখে তঁার প্রস্তাব, বাংলার ক্ষুদ্রশিল্প ইউনিটগুলিকে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে চীনের বাণিজ্য মেলায়। আন্তর্জাতিক স্তরে বড় বিনিয়োগ টানতে গেলে উৎপাদন, প্রযুক্তি, পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, ইস্পাত, খনিজ আর সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পরিষেবা–‌ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি। এ‌জন্য বেশি করে প্রতিনিধি বিনিময় প্রয়োজন, সেই সঙ্গে দরকার আরও স্ট্র‌্যাটেজিক পার্টনারশিপ তৈরি। এই সফরেই বিএনসিসিআই চীনের এক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে আসার জন্য।
‘‌চীনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক দিনের। বিশেষ করে কুনমিং। এখানে আমি প্রথম আসি বহু বছর আগে। এখানকার স্টোন ফরেস্ট নিয়ে লিখেওছিলাম সংবাদপত্রে। গত এপ্রিলে অবশ্য এসেছিলাম বেজিংয়ে শিক্ষা–‌বিষয়ক একটা ফোরামে বক্তা হিসেবে। আমাদের সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি আর টেকনো গ্রুপের অন্য কলেজগুলোর সঙ্গে চীনের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চলছে।’‌ জানালেন সত্যম রায়চৌধুরী। তঁার কাছে প্রশ্ন ছিল, চেম্বারের এই সফর ঠিক কীভাবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে?‌ তঁার জবাব, ‘‌এবারের সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পাশাপাশি জোর দেওয়া হচ্ছে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর। আমরা শুধু চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মত–‌বিনিময় করতে আসিনি। এখানে সার্ক ও আশিয়ান–সদস্য দেশের সরকারি অফিসার ও চেম্বার প্রতিনিধিরাও এসেছেন। তঁাদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি কোন্‌ পথে এগোচ্ছে।’‌
এই সফরেই য়ুক্সি টেকনিশিয়ান কলেজের সঙ্গে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করলেন সত্যম রায়চৌধুরী। এর পর কলেজের প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন, টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপের সঙ্গে তঁাদের এই উদ্যোগে লাভবান হবে দুই পক্ষই। সত্যম রায়চৌধুরী চীনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রশংসা করে বলেন, ‘‌এজন্যই আমরা চীনের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মউ সই করেছি। এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ছাত্র ও শিক্ষক বিনিময় হবে। এ ছাড়াও গবেষণার তথ্য আদানপ্রদান সম্ভব হবে।’‌ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে য়ুনান প্রদেশের গভর্নর রুয়ান শেংফা বলেন, চীনে যে–‌সব বিনিয়োগ মেলা বা এক্সপো হয়, এই ফোরাম তার ওপরেই ভিত্তি করে আয়োজিত হয়েছে। মত–‌বিনিময় ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন প্ল্যাটফর্ম বলা যায় একে। সেজন্য বাণিজ্য নিয়ে আলোচনাসভার সঙ্গেই চীন–‌ভারত সাংস্কৃতিক সপ্তাহ, যোগব্যায়াম সম্মেলন, দক্ষিণ এশিয়া মিডিয়া ফোরাম, প্রদর্শনী ইত্যাদির আয়োজন করা হয়েছে। ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, এমনকী আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে প্রায় ৪০০ প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেল।
কুনমিংকে বলা হয় ‘‌সিটি অফ ইটারনাল স্প্রিং’‌ আর কলকাতা হল ‘‌সিটি অফ জয়’‌। মাত্র আড়াই ঘণ্টার ফ্লাইট। বিএনসিসিআই চায় এই দুই শহরের মধ্যে সেতুবন্ধন করতে। বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, আত্মিক বন্ধন। কুনমিংয়ের ডেপুটি গভর্নর ওয়াং শিআন গ্যাং–‌এর সঙ্গে বৈঠকে সত্যম রায়চৌধুরী য়ুনান প্রদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক দৃঢ়তর করার ওপর জোর দেন। এজন্য দুই সরকারের উদ্যোগ প্রার্থনীয় বলে জানান তিনি। শিক্ষা, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, পর্যটন, সিনেমা, টিভির মতো কিছু ক্ষেত্রকে এ‌জন্য চিহ্নিত করেছেন তিনি। বিএনসিসিআইয়ে‌র তরফে যে প্রস্তাবগুলি রাখা হয়েছে তা হল, কলকাতা ও কুনমিংয়ের মধ্যে ফ্লাইট বাড়ানো আর সেই সঙ্গে দু’‌দেশের বিমানবন্দরে বিদেশি ভাষা–‌জানা সরকারি প্রতিনিধি নিয়োগ করা। তথ্য‌প্রযুক্তি, ওষুধ ও বিনোদনের বাজারে চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, কলকাতায় চীনা উপদূতাবাসের সাহায্যে রেগুলেটরি অফিস তৈরি করে পূর্ব ভারতের ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব দ্রুত রূপায়ণের ব্যবস্থা করা, সরকারি ও বেসরকারি স্তরে কলকাতা ও কুনমিংকে প্রচারের আলোয় আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন বিএনসিসিআই প্রতিনিধিরা। ওয়াং আশা প্রকাশ করেছেন, উদার মানসিকতা দুই দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন জোয়ার আনবে।
দারিদ্র‌্য দূরীকরণ বিষয়ে এক আলোচনাচক্রে বক্তব্য পেশ করেন বিএনসিসিআইয়ে‌র কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ঋত্বিক দাস। তিনি বলেন, ‘‌দানধ্যানের মাধ্যমে দারিদ্র‌্য দূর করা যায় না। তার বদলে দরকার কোটি কোটি বঞ্চিত মানুষের রোজগারের ব্যবস্থা করা। অনেকেরই প্রতিভা, কর্মক্ষমতা, উচ্চাভিলাষ রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের তৈরি করতে হবে ব্যবসায় নামার জন্য। আমরা বিএনসিসিআই থেকে এই কাজটাই করি। তরুণ শিল্পোদ্যোগীদের বিদেশে পাঠানো দরকার যাতে তারা বাজারটা বুঝতে পারে, পণ্যের মান সম্পর্কে তাদের ধারণা তৈরি হয়। আমরা জানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আখেরে সাধারণ মানুষের আয় বাড়ায়, দারিদ্র‌্য দূর করতে সাহায্য করে।’‌‌‌

কুনমিংয়ে বিএনসিসিআই সভাপতি ও সদস্যরা।

জনপ্রিয়

Back To Top