বাহারউদ্দিন: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ সফর নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা শুরু হয়েছে। জল্পনা না বলে একে কষ্টকল্পনা বলা অধিকতর যুক্তিগ্রাহ্য। কোনও কোনও বিদেশি সংবাদ সংস্থা বলেছে, ভারতীয় প্রযুক্তির সাহায্যে বাংলাদেশ উপকূলে রাডারের নজরদারিতে চীন অসন্তুষ্ট হতে পারে। দিল্লির ওপর ঢাকার অতিনির্ভরতা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমি বিশ্লেষকরা আগ বাড়িয়ে বলতে শুরু করেছেন, সমুদ্রপথে চীনের গতিবিধির ওপর নজর রাখতেই অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁদের এ ব্যাখ্যার ভিত্তি কী? চীন কি এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য ব্যক্ত করেছে? ভারতের বক্তব্যে কী উঠে আসছে? দিল্লির সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজের পরিচালক উদয় ভাস্কর বলেছেন, মহাসাগরীয় অঞ্চলে উন্নতধরনের রাডার ব্যবস্থা স্থাপন করে সমুদ্রছোঁয়া দেশগুলিকে সাহায্য করছে ভারত। মরিশাস, সেশেলস, মালদ্বীপে অনুরূপ নজরদারি তৈরি হয়েছে। ভারতের নজরে চীন নয়। মহাসাগর এলাকায় বাণিজ্য–জাহাজের অবাধ চলাচলই তার লক্ষ্য। সমুদ্রপথের ওপর নজর রাখতে মায়ানমারের সঙ্গেও ভারত কথা বলছে। 
ভারতীয় নৌবাহিনী উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে, দক্ষতার বিচারে এশিয়ার অন্যতম বড় শক্তি। তার দাপট চীনতুল্য নয়। কিন্তু জাপান, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে বহুগুণে বেশি।
যাঁরা বলাবলি শুরু করেছেন, চীনের ওপর নজরদারি করতে ভারতীয় রাডার প্রযুক্তির সাহায্য গ্রহণের কথা বাংলাদেশ ভাবছে, এ ব্যাপারে হাসিনার সফরে ঢাকা–‌দিল্লির আলোচনা হয়েছে, তাঁরা ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছেন কয়েকটি সত্য। তা হচ্ছে এই যে, বঙ্গোপসাগরে চীনের সামরিক জাহাজের বিচরণ বিরল। দুই, গত কয়েক বছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক যে‌ভাবে বেড়েছে, এখনও বাড়ছে, তাতে ঢাকা এমন কোনও ভুল পদক্ষেপ নেবে না, যেখানে তার উন্নয়নের কূটনীতি ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশ আয়তনে নাতিদীর্ঘ। কিন্তু তার অর্থনৈতিক বল, জনবলকে উপেক্ষা করা যাবে না। বিশ্বের যে কয়েকটি উন্নয়নমুখর দেশ প্রভূত গতি নিয়ে সম্মুখে ছুটছে, বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে প্রায় শীর্ষে। বাণিজ্যিক অর্থনীতির সাফল্য এর প্রধান, প্রধানতম কারণ। দ্বিতীয় কারণ রাজনৈতিক স্থিতি। তৃতীয় কারণ, ভারত, আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তার সম্পর্কের সুদৃঢ় নিরপেক্ষতা। 
দিল্লি ঢাকার নিকটতম প্রতিবেশী। জন্মলগ্ন থেকেই পরম বন্ধু। ফরাক্কার জল, ছিটমহল ও সীমান্ত সমস্যা নিয়ে মতভেদ অনেকটাই মিটে গেছে। তিস্তা ঝুলছে। সিকিম পর্যাপ্ত জল ছাড়লে মুখ খুলবে তিস্তার প্রবাহ। তিস্তাকে ঘিরে চীনের মাথাব্যথা নেই, থাকার কথাও নয়।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করা অন্যায়। বাংলাদেশকে এক বিন্দু জল দিলেই বিরুদ্ধ রাজনীতি রটনা–‌সিন্ধু হয়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত, শুখা মরশুমে বর্ষার বাহুবলি তিস্তা শুকনো লাশ হয়ে পড়ে থাকবে। নাব্যতা কমছে। সিকিমের পরপর বাঁধ একটি গুরুতর সমস্যা। নদীকে যারা বেঁধে রাখে, তারা নদীর কান্না শুনতে পায় না। শুনতে পায় তটরেখা আর তার অববাহিকা। বাংলাদেশের জন্মশত্রুরা চাইছে, তিস্তা নিয়ে বিরোধ উঁচু হোক। বঙ্গীয় উপসাগরে ভারতীয় প্রযুক্তির রাডার ব্যবহারকে ঘিরে ঢাকা–‌বেইজিং–‌এর নির্মীয়মাণ হৃদ্যতায় ভাঙন আসুক।
ভারতীয় প্রযুক্তির রাডার ব্যবহারের বিরুদ্ধে যারা সরব হয়েছে, বা অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের স্বার্থ কী?  তারা কি দুদেশের বন্ধু? মনে হয় না। বিষয়টির তল–‌অতল খতিয়ে দেখার প্রয়োজন নেই বুঝি? বঙ্গোপসাগরে নানা রকমের অপকাণ্ড ঘটে। কক্সবাজার এলাকায় সমরাস্ত্র–‌সহ বিশাল জাহাজ আটকের ঘটনা আশা করি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অস্ত্র কোত্থেকে এসেছিল, কোন মুলুকে যাচ্ছিল, এসব গোয়েন্দাদের নজর এড়ায়নি।  উত্তর–‌পূর্ব ভারত নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বৃদ্ধির বাস্তবতা ঢাকা পড়েনি। বাংলাদেশ তখন উত্তপ্ত। সন্ত্রাসবাদীরা উন্মাদের মতো আচরণ করছে। অস্ত্র আর জঙ্গি প্রবেশে ভয়ের কবলে অসম। পরম বন্ধুর মতো, সহোদরের মতো ঢাকা একহাতে নিকেশ করেছে তার ঘরোয়া শত্রুদের, আরেক হাতে নির্মূল করেছে বাংলাদেশে আশ্রিত জঙ্গিদের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতের সার্বিক সাহায্য ঢাকা যেমন কখনও ভুলতে পারবে না, তেমনি বাংলাদেশ থেকে সন্ত্রাসবাদীদের উৎপাটন দিল্লির ভুলে থাকা সম্ভব নয়। ইতিহাসের কঠিনতম সন্ধিক্ষণে, সন্ত্রাসদমনে দুই দেশের যৌথ ঘোষণা, যৌথ সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্তের আপসহীন প্রয়োগ গোটা উপমহাদেশকে মনে রাখতেই হবে। এটাও অলঙ্ঘনীয় ঐতিহাসিক দায়িত্ব। 
বাংলাদেশ ইসরাইল কিংবা পাকিস্তানের মতো যুদ্ধবাজ নয়। এরকম হয়ে ওঠায় তার আগ্রহ নেই। কার বিরুদ্ধে সে লড়বে? জল, মাটি, নদী আর কাঁটাতারে ঘেরা একটি দেশ। কৃষি আর বাণিজ্যই তার ভরসা। শিল্প গড়তে সময় লাগবে। বাণিজ্যিক অর্থনীতি তাকে বড় করছে। আরও বাড়বে তার সম্পদ। তার অঙ্গীকার জাতিসত্তার শ্রীবৃদ্ধি। অভিমুখ উন্নয়নের। ৭১–‌এ স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর জাতিকে, উপমহাদেশকেও স্মরণ করিয়ে দিয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানের জেল থেকে ছাড়া পেয়ে লন্ডন হয়ে, দিল্লি হয়ে দেশে ফিরলেন জননেতা। কলকাতা ময়দানে ঘোষণা করলেন, দেশগঠন  আর বাঙালি জাতিসত্তার অঙ্গীকার। সেদিনই তাঁর সম্মানে রাজভবনে নৈশভোজের আয়োজন করেছেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। প্রাক ভোজের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বললেন, উপমহাদেশকে শত্রুতার ইতিহাস ভুলে যেতে হবে। যুদ্ধ আর যুদ্ধের সরঞ্জাম কিনতে যে অর্থব্যয় হয়, সে অর্থ দিয়ে আমাদের দারিদ্র‌্য হটাতে হবে। উন্নয়নের খাতে ব্যয়বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ওই অঙ্গীকারকে মর্মে আর ধর্মে অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে ঢাকা। 
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কম হয়নি। ঢাকা প্ররোচনায় পা দেয়নি। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার ভরণপোষণের ভার কাঁধে নিয়ে, যুদ্ধের উসকানিকে ধূলিসাৎ করে যে দৃষ্টান্ত সে স্থাপন করেছে, এটিও মুজিব–ঘোষিত সঙ্কল্পেরই উত্তরাধিকার। যুদ্ধের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যার মনোভাব এত কড়া, দৃষ্টিভঙ্গি এত সংশয়হীন, সে দেশকে ‘‌গোয়েন্দাগিরির’‌ কাজে ব্যবহার করা কি সম্ভব? বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ স্থিতি ও শান্তির স্বার্থে উপকূলে অত্যাধুনিক নজরদারির রাডার–‌কৌশল গড়ে তুলতে চাইছে। চীন ঢাকা–‌দিল্লির লক্ষ্য নয়। বঙ্গোপসাগর নিয়ে বেইজিং–‌এর উদ্বেগ নেই। জলদস্যু বা বিদেশি সন্ত্রাসের হুমকিকে ঘিরে ঢাকা–‌দিল্লির আশঙ্কা উপেক্ষা করা যাবে না। মুম্বই হামলার অপরাধীরা জলপথ দিয়েই প্রবেশ করেছিল মহারাষ্ট্রে। বঙ্গোসাগর দিয়ে অনুরূপ অপশক্তি বাংলাদেশে ঢুকবে না, এমন নিশ্চয়তা কোথায়? অতএব ঢাকা–‌দিল্লির রাডার চুক্তি অপরিহার্য। আতঙ্ক আর আশঙ্কা থেকে যেহেতু না ভারত, না বাংলাদেশ কেউই মুক্ত নয়; যেহেতু বিষাক্ত সাপ ঘাড়ের ওপর অনবরত নিঃশ্বাস ফেলছে; যেহেতু সম্পর্কের মাধুর্যে ভাঙন দেখতে চায় বহিরাগত দুর্বৃত্তরা; চায় রুদ্ধ হোক, বন্ধ হোক প্রেম আর ঐক্যের গলাগলি, জড়াজড়ি; সে কারণেই ভেতর বাইরের উস্‌কানি অতিক্রম করে আরও নিবিড়, আরও কাছাকাছি আসতে চায় দুদেশের অন্তর। মাঝরাতের ভুল মেসেজ, পরিকল্পিত নিন্দা, সৌহার্দের বনগমনের রটনা কি রুখতে পারে পারস্পরিক উপস্থিতিবোধের সত্যকে? অসম্ভব। দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয় তো বটে, যৌথ রাডার নজরদারি গড়ে তোলার প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ ভারত সফরের আরেক বড় প্রাপ্তি।‌

জনপ্রিয়

Back To Top