ঈদের উৎসবে ঢাকা ফাঁকা, শুক্রবার থেকে সুপার লক ডাউন

জয়ন্ত আচার্য, ঢাকা:‌ কোভিড মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আজ মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে।
 অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কার মধ্যেই এবারের ঈদ উদযাপিত হচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ঈদকে ঘিরে যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস থাকার কথা তা এবারও ম্লান করে দিয়েছে কোভিড। ঈদুল আজহা
 উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ তাঁর পরিবারের সদস্য এবং কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গভবনের দরবার হলে পবিত্র ঈদুল আজহা’র নামাজ আদায় করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাসভবন গণভবনে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। শেখ হাসিনা পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যগণকে শুভেচ্ছা জানান। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গজনবী রোডের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে (মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১) বসবাসকারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ফলমূল ও মিষ্টি পাঠান তিনি। সকালে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ গাজী হাফিজুর রহমান লিকু, উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার এবং সহকারী প্রেস সচিব এবিএম সরওয়ার-ই-আলম সরকার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এগুলি পৌঁছে দেন। 
করোনার কারণে এবারও ঢাকার হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ময়দানেও ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রতি বছরের মত এবারও ঈদের ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের প্রধান জামাত এবার বায়তুল মোকাররম মসজিদেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নামাজ শেষে মোনাজাতে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করা হয়। পাশাপাশি পৃথিবী জুড়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও নিহতদের জন্য দোয়া করা হয়েছে। করোনা থেকে মুক্তির জন্য মুসল্লিরা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেন। 
তবে ঈদের নামাজ শেষে চির পরিচিত দৃশ্য মুসল্লিদের হাত মেলানো ও কোলাকুলি এবার চোখে পড়েনি। করোনার সংক্রমণ রোধের জন্য সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ থেকে বিরত থাকেন মুসল্লিরা।
 করোনা মোকাবিলায় ও সংক্রমণ বিস্তার রোধকল্পে সরকারের নির্দেশনায় এবার খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। সারাদেশের ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় মসজিদের ভিতরে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে। 
আজ সকাল ৭টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। এতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মাওলানা মো. মিজানুর রহমান। মুকাব্বির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বায়তুল মুকাররম মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. আতাউর রহমান।
রাজধানীতে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমে পবিত্র ঈদ-উল-আজহা’র জামাতে নামাজ আদায় শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ । মহামারীকে পেছনে ফেলে দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বপ্নে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন, দল-মত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে আমরা যেন দেশকে সেই স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারি।’
 বাংলাদেশে কঠোর লকডাউন চলছিল। ঈদ উপলক্ষে গত সাতদিন লকডাউন শিথিল করে সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামমুখী মানুষের বাড়ি ফেরার ঢল নেমেছিল। বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট এবং ফেরিঘাটে ছিল উপচে পড়া ভিড়। স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনও বালাই ছিল না। মাইলের পর মাইল গাড়ির সারি ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। দূরপাল্লার বাসের টিকিট না পেয়ে ঢাকা সিটির যাত্রীবাহী মিনি বাস ভাড়া করেও গ্রামে যেতে দেখা গেছে বহু মানুষকে। এ'দৃশ্য গতকাল পর্যন্ত চোখে পড়েছে। 
অন্যদিকে রাজনীতিবিদদের এবারের ঈদ কেটেছে একেবারে ভিন্নভাবে। প্রতিবছর তাঁরা গ্রামে নিজ নিজ এলাকায় আত্মীয়স্বজন ও জনগণের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেন। কিন্তু এবার মহামারীর আবহে জনগণের কথা চিন্তা করে গ্রামে ফিরে যাননি। তাঁরা রাজধানী ঢাকাতেই নিজের বাসভবন কিংবা স্থানীয় মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। ঈদের আগেই অবশ্য এলাকায় উপহার পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। 
মানুষ ঈদ উৎসবে রাজধানী ছাড়ার কারণে আজ ঢাকার সমস্ত রাস্তাই ফাঁকা, কোথাও কোনও যানজট বা কোলাহল নেই। তবে যারা এই সাতদিনে বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চের টিকিট পায়নি অথবা কোনও কারণে যেতে পারেনি, তাদের মধ্যে কিছু কিছু যাত্রীকে আজও ঈদের দিন গ্রামে যেতে দেখা গেছে। তবে সংখ্যাটা খুবই কম। 
এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দূরপল্লার সড়ক, মহাসড়কও ছিল অনেকটাই ফাঁকা। দু'একটি প্রাইভেট কার, সিএনজি, রিক্সা ছাড়া যাত্রীবাহী কোনও বাস ছেড়ে যায়নি। 
আগামী ২৩ তারিখ থেকে ১৪ দিন কঠোর লকডাউনের বিধিনিষেধে পড়তে যাচ্ছে দেশ। এই কারণেও শহরের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর অনেকে আয়ের অভাবে, বাড়ি ভাড়া দিতে না পেরে গ্রামে ফিরে গিয়েছেন। মোটের উপর করোনা আতঙ্কে এবারের ঈদ অনেকটাই জৌলুসহীন।