সোমদত্তা বসু, অক্সফোর্ডশায়ার: প্রিন্স চার্লস আর প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের করোনা পজিটিভ হওয়ার পর একধাক্কায় কড়াকড়ি অনেক বেড়ে গিয়েছে ব্রিটেনে। লন্ডন থেকে দেড়ঘণ্টার দূরত্বে আমাদের এই কন্ট্রাসাইড এমনিতে অনেক নিরিবিলি। এখন যেন একদম নিঝুম। সবুজের মাঝখানে যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবি। সুন্দর কিন্তু নিষ্প্রাণ। আর আমার মতো যেসব বিদেশি ছেলেমেয়ে একা থাকে, তাদের জন্য খুবই কষ্টকর অভিজ্ঞতা। লন্ডনের কিংসটন ইউনিভার্সিটি থেকে ক্যান্সার বায়োলজিতে মাস্টার্স করে এসেছি অক্সফোর্ডশায়ারে এক কোম্পানিতে রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটের কাজ নিয়ে। থাকা ভাড়া অ্যাপার্টমেন্টে। আমার বাড়িওয়ালা ভদ্রমহিলাও একাই থাকেন। ষাটের ওপর বয়স, তাতে আবার অসুস্থ। ফলে একা দোকানে যেতে পারেন না। অন্য সময় ডাকলে আমি যাই সঙ্গে। কিন্তু এখন পারব না কারণ, বয়স অল্প হলেও আমি ডায়াবেটিক। তাই এই করোনা পরিস্থিতিতে আমার বাইরে বেরনো একেবারেই নিষেধ। আমার নিজের যা কিছু দরকার, ওষুধ থেকে খাবার দাবার, আমার কোম্পানি দায়িত্ব নিয়ে সেসব পৌঁছে দিচ্ছে লোক পাঠিয়ে। দরজা খুললে দুমিটার দূরত্ব বজায় রেখে আমার হাতে দিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বেচারি ল্যান্ডলেডির সেই সুবিধে নেই। হোম ডেলিভারির স্লট করেছে ক্রেতাদের জন্য। প্রবীণ আর অসুস্থদের জন্য একরকম, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একরকম, সাধারণ লোকের জন্য একরকম। সুপারমার্কেটে এক বা দুজনের বেশি একসঙ্গে ঢুকতে পারবে না, যে কোনও আইটেম তিনটের বেশি নেওয়া যাবে না, এরকম অনেক নিয়ম চালু হয়েছে। এছাড়া দুজন ক্রেতা আর বিক্রেতার সঙ্গে কাউন্টারের দুমিটার দূরত্ব তো রাখতেই হবে।
সাধারণ নাগরিক শুধু খাবার আর ওষুধ কিনতে স্থানীয় দোকানে এবং দিনে একবার এক্সারসাইজ করতে কাছাকাছি পার্কে যেতে পারবেন। রাস্তায় পুলিশ ধরলে যদি সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারেন, তাহলে জরিমানা হতে পারে। সবথেকে কম জরিমানা ৬০ পাউন্ড। ১৪ দিনের মধ্যে দিলে কম হবে ৩০ পাউন্ড। আর পুলিশের ওপর চোটপাট করলে নির্ঘাত জেল। খবরে দেখলাম, কেউ একজন ইচ্ছে করে কেশে পুলিশের গায়ে থুতু ছিটিয়ে দুবছরের জন্য জেলে গেছে। গাড়ি নিয়ে বেরলে যখন তখন চেকিং হতে পারে। কেন বেরিয়েছেন এবং এত দূরে কেন এসেছেন, এই জেরার ঠিকঠাক জবাব না পেলে হয় জরিমানা, নয়তো পত্রপাঠ ফেরত। এই জরিমানা নাকি ৯৬০ পাউন্ড পর্যন্ত উঠেছে। এমনকী কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরোন যাঁরা, তাঁদের ওপর ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালানো হচ্ছে। সেই ড্রোন ক্যামেরায় মাঝেসাঝে ধরা পড়ছে বার বি কিউ বা মদ্যপানের পার্টিও। তখন কিন্তু আর রক্ষে নেই। সম্প্রতি এক নামকরা প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলার মার্সিডিজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন এক বন্ধু ও দুই বান্ধবীকে নিয়ে। তাদের কারও সিট বেল্টও ছিল না। পুলিশ অবশ্য একটু বকাবকি করে ছেড়ে দিয়েছে। বলেছে— তুমি ইউথ আইকন আর তুমিই লক ডাউন মানছ না!‌
এই মেঘ পিওনের দেশে রোদ উঠলে যে কি উল্লাস মানুষের। সানি উইক এন্ড মানেই রেস্তঁরায়, পাবে, শপিং মলে
জনস্রোত। এখন সেসব গল্পকথা মনে হচ্ছে। একেই নিঃসঙ্গতা ঢেকে রেখেছে দেশটাকে, তায় যেদিন বৃষ্টি নামে, আরও মন খারাপ হয়ে যায়। কলকাতার কথা মনে পড়ে। করোনা আক্রমণের শুরুতেই ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রক থেকে বিদেশি ছাত্রছাত্রী আর গবেষকদের বলে দেওয়া হয়েছিল, যে যেখানে আছ, সেখানেই থাকো। দেশে ফিরে যেও না। অন্য কোথাও ট্রাভেল কোরো না। ইউনিভার্সিটি হস্টেলগুলোকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, বিদেশিদের সবরকম সহযোগিতা করতে। যে যা স্কলারশিপ বা অন্যান্য আর্থিক সাহায্য পায়, সেগুলো যেন চালু থাকে। বিদেশ মন্ত্রক থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, কারও ভিসা ফুরিয়ে গেলে ভয় নেই, ৩১ মে পর্যন্ত থাকা যাবে ব্রিটেনে।

জনপ্রিয়

Back To Top