মলয় সিন্‌হা: ‌ গোটা বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। ইওরোপের করোনা সঙ্কটে জর্জরিত দেশগুলির মধ্যে অন্যতম ইংল্যান্ড। কোভিড–১৯ হামলায় মৃত্যুর তালিকা বিশ্লেষণ করে ওয়ার্ল্ডোমিটার জানাচ্ছে, ইতালিকে টপকে এখন বিশ্বে দ্বিতীয় এবং ইওরোপে মধ্যে সর্বাধিক মৃতের দেশ ইংল্যান্ড। ইতিমধ্যে আক্রান্ত আড়াই লাখের কাছাকাছি। এই পরিস্থিতিতেই গোটা ইংল্যান্ডে করোনা যুদ্ধে অকুতোভয়ে লড়ছে চিকিৎসক থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিলেতের এই যুদ্ধে শামিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া এক বাঙালি চিকিৎসকও। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ–পশ্চিমে সমুদ্র উপকূল ঘেঁষা সমারসেট কাউন্টির ইয়োভিল ‌ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে মহামারী করোনার সঙ্গে স্টেথোস্কোপ হাতে লড়ছেন বাংলার ডাঃ নিলয় চ্যাটার্জি।
সমারসেট কাউন্টিতে ছোট্ট টাউন ইয়োভিল। স্থানীয় ও প্রবাসী মিলে কম করে ৫০ হাজার মানুষের বাস। টাউনের ৩০ থেকে ৪০ মাইল দূরে দুটি বড় শহর টনটন এবং ব্রিস্টল। এর জন্য ইয়োভিল ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতাল স্থানীয়দের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে জানালেন ডাঃ নিলয় চ্যাটার্জি। তাঁর কথায়,‘‌আমাদের হাসপাতালে কোভিড–১৯–‌এর চিকিৎসা দুভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগ, ডু নট অ্যাটেম্পট রিসাসসাইটেশন (‌ডিএনএআর)‌। এখানে চিকিৎসার জন্য একটি প্ল্যান থাকে। সেটি হল ট্রিটমেন্ট এসক্যালেশন প্ল্যান (‌টিইপি)‌। এই প্ল্যানে, রোগী নিজের চিকিৎসা তাঁর অবস্থা ও ইচ্ছার উপর নির্ভর করে নাম নথিভুক্ত করা থাকে। সেখানে লেখা থাকে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা করতে ইচ্ছুক কিনা। এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসা ওয়ার্ড ভিত্তিক। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে আইসি এবং ভেন্টিলেশন করা হয় না। তাঁদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ভাগ, যাঁরা করোনা ছাড়া সুস্থ আছেন অথবা টিইপি–তে যাঁরা নথিভুক্ত করেননি। এখানে রোগী ও তাঁর পরিজনের সঙ্গে কথা বলে বাস্তবসমন্ত চিকিৎসা করা হয়। অবশ্যই সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসক। এখানে ইন্টেনসিভ কেয়ার বা ভেন্টিলেশনে যারা উপযুক্ত তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা করে সারিয়ে তোলা হয়। এছাড়াও আরেক ধরনের রোগী আছেন, যাঁদের সংখ্যা খুবই কম। যাঁরা খুব শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসেন, তাঁদের ইন্টেনসিভ কেয়ার বা ভেন্টিলেশনে ভর্তি করা হয়। এঁদের সুস্থ হওয়ার পরই চিকিৎসার প্ল্যান ঠিক করা হয়।’‌
উত্তর ২৪ পরগনার রহড়ার বাসিন্দা ডাঃ নিলয় চ্যাটার্জি। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। এরপর চার বছর ওমানের একটি হাসপাতালে অ্যানাস্থেসিয়া ও ইন্টেনসিভ কেয়ারের চিকিৎসক হিসাবে কাজ করেন। বর্তমানে ইংল্যান্ডের সমারসেট কাউন্টির ইয়োভিল ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালে দেড় বছর ধরে চিকিৎসক হিসাবে কর্মরত। ডাঃ চ্যাটার্জি জানালেন, ‘‌করোনার হানা এখানেও হয়েছে। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য সপ্তাহে আমাদের ৩০ থেকে ৭২ ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে। চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই, মাস্ক থেকে অন্যান্য সামগ্রীর জোগান রয়েছে যথেষ্ট। আমরা নিজেরা সবরকমের সতর্কতা অবলম্বন করে চলছি।’‌ তিনি আরও জানান, ‘‌আমাদের হাসপাতালে ২০ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। করোনা পজিটিভ রোগী ভর্তি রয়েছে। ইতিমধ্যে আমাদের এই দক্ষিণ–পশ্চিম অঞ্চলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার গোটা দেশের মধ্যে সব থেকে কম। বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছিলেন। তাঁরা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এই পরিস্থিতিতে করোনা যুদ্ধে আমরা সতর্ক কিন্তু ভীত নই।’‌ করোনা পরিস্থিতিতে নিজের দেশ ও রাজ্য নিয়ে বেশ চিন্তায় ছিলেন নিলয়। তিনি বলেন, ‘‌সংক্রমণ ক্রমশ বাড়ছে। এ নিয়ে খুবই চিন্তায় ছিলাম আমরা। কেন্দ্র ও রাজ্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি এই কঠিন পরিস্থিতিতে রাজ্যের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ যেভাবে কাজ করছেন তাঁদের সবাইকে স্যালুট জানাই।’‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top