ঋতুপর্ণা দাসদত্ত, নিউ জার্সি: বাড়ির টিভিটা খোলা সারাক্ষণ। অধিকাংশ সময় সিএনএন। মাঝেমধ্যে বিশ্বের অন্যান্য টিভি চ্যানেল, বাংলাও। আমেরিকার নিউজ চ্যানেলগুলোতে এমনভাবে পরিসংখ্যান প্রতিমুহূর্তে বদলে যাচ্ছে, হঠাৎ দেখলে মনে হবে ভোট গণনা হচ্ছে বুঝি! কিন্তু না, ওটা করোনা আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। যেদিন এই লেখা লিখছি, সেদিনই প্রথম আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা একদিনে একশো পার করল। বিকেলে সংখ্যাটা ছিল ৫২০। আর সন্ধেয় যখন টিভিতে চোখ রাখলাম তখন ৫৬০–এর গণ্ডি ছাড়িয়েছে মৃত্যু!‌ চীন ও ইতালির পর পরবর্তী মৃত্যু উপত্যকা হতে চলেছে আমেরিকা। গলায় জমাট বেঁধে যাচ্ছে ভয়, আর অসহায়তা। 
ঘরের কাছেই নিউ ইয়র্ক সিটি। আমেরিকায় করোনার স্বর্গরাজ্য। আগামী ২ সপ্তাহে সেখানে নাকি চল্লিশ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হবেন! প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে নিজের ঘর কি বাঁচে!‌ দুটো প্রদেশই এই মুহূর্তে লকডাউন। জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব বন্ধ। অথচ সপ্তাহখানেক আগেও ছবিটা এমন ছিল না। পুলিশ মানুষের শুভ বুদ্ধির ওপর আস্থা রেখেছিল। পথে ধরপাকড় হয়নি। পুলিশ গাড়ি থামিয়ে টিকিট ধরায়নি। কেবল হালকাপলকা কার্ফু জারি ছিল। ‘দরকার ছাড়া নাই বা বেরোলেন বাইরে’ গোছের আর্জি। কাজ হয়নি। ইতালি, ইরানকে দেখেও আমরা শিখিনি। মানুষ বেরিয়েছে, বাজারহাট করেছে, হয়তোবা পার্টিও করেছে। গোটা সপ্তাহটা ছুটির মেজাজেই গেছে। সোম থেকে শুক্র খুদে পড়ুয়ারা যার যার ঘরে ক্রোম বুক, ট্যাবলেট নিয়ে ব্যস্ত। দূরশিক্ষা। মাঝে একটা পার্টিশন দিয়ে স্বামী–‌স্ত্রী দুজনেরই ‘‌হোম অফিস’‌। অবসরে সাংসারিক আলোচনা, মুদিখানার হিসেব। কর্তা একবার কফি বানায় তো একবার গিন্নি। অন্যরকম রোজনামচা। রাত জেগে সিনেমা দেখা। ভোরে ওঠার তাড়া নেই। শুক্রবার সন্ধে থেকেই সামাজিক দূরত্বে পাগলপারা হয়ে ওয়েবেক্স বা জুম–এ জমিয়ে অনলাইন আড্ডা। ‘আড্ডা ফ্রম হোম’! তারই মাঝে হয়তো বা টুক করে বন্ধুর বাড়ি ঘুরে আসা, চলছিল সবই। আশু ফল স্টেজ থ্রি।
প্রশাসনিক আর্জি বদলে গেল অর্ডারে। তবে রাস্তায় উর্দিধারী পুলিশ এখনও নেই। কিন্তু গত দু’‌ তিনদিনে নিউ জার্সিতে যেটা হয়েছে , সেটা হাজার পুলিশের চোখ রাঙানির থেকেও অনেক বেশি কার্যকরী। সেটার জন্য সরকারি অর্ডার লাগে না। ‘ভয়’। শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে ভয়।
আজ আর ‘আমার কিস্যু হবে না’ বলে চোখে চাপা দিয়ে থাকতে পারছে না কেউই। রাস্তাঘাট জনমানবশূন্য। এদেশ এবার বন্‌ধ দেখছে!‌ আসলে পরিস্থিতিটা যে কতটা ভয়াবহ সেটা শিরায়, মজ্জায় মালুম হতে সময় লাগে। টিভিতে চ্যানেল ঘুরিয়ে যখন দেখছি, ম্যানহাটন আর শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের কোনও তফাত নেই। আমি, আমার মেয়ে, আমার সত্তরোর্ধ্ব শাশুড়ি— তিন প্রজন্মের মানুষ দুই মহাদেশে বসে এখন একসঙ্গে ‘মহামারী’ দেখছি। যদি বেঁচে থাকি, ২০ বছর পর পেছন ফিরে তাকালে আজকের এই দিনটা ভাবতে কেমন লাগবে জানি না। কিন্তু আজ সত্যি ভয় করছে। আমার পরিবারের মানুষগুলো ভাল থাকবে তো?‌ আমার বাচ্চাটাকে এসব থেকে আড়াল করে রাখতে পারব তো? সবাই একসঙ্গে বেঁচে থাকব তো?‌ 
আজ আমার ৫ বছরের মেয়ের খেলার জগতেও দেখলাম মারণ ভাইরাস ঢুকে পড়েছে! পুতুলগুলোকে রোগী সাজিয়ে নিজে মুখে মাস্ক দিয়ে ডাক্তার সেজেছে! অন্য সময় মজা পাই। আজ ভয় লাগল! টিভিতে কত সময় বিপজ্জনক ছবি তারিয়ে তারিয়ে দেখেছি! সেদিন ‘আউটব্রেক’ দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল! মোটাবা ভাইরাস আক্রান্ত ক্যালিফোর্নিয়ার কোস্টাল শহর বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল বিশ্বব্যাপী মহামারী রুখতে! আজ কোন অপারেশনে বাঁচব আমরা! ১৯০টা দেশের মানুষ! গোটা মানবজাতি!
জন ডিকেনসন্স–‌এর বিখ্যাত প্রবাদ উল্টে দিল একরত্তি এই ভাইরাস! ‘একতা বাঁচাবে, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে যাবে ধ্বংসের পথে’! আজ অবস্থা এমনই যে, একসঙ্গে মিলেমিশে রুখে দাঁড়ানোরও উপায় নেই! প্রবাসীদের যন্ত্রণা আরও বেশি! নিজে ভাল থাকা শুধু নয়, অর্ধেকটা মন পড়ে আছে হাজার হাজার মাইল দূরের অন্য একটা দেশে! বাবা–মা, ভাই–বোন, আত্মীয়–পরিজন রয়েছে যেখানে! 
শুধুই অপেক্ষা। নিশ্চই ঝড় থামবে একদিন। ততদিনে এই মারণ রোগ যে কী গভীর ক্ষত তৈরি করে দেবে গোটা পৃথিবীর আর্থসামাজিক কাঠামোয়, তা কল্পনা করতেও ভয় করছে। কিন্তু এখন একটাই একটাই আর্তি, যে যেখানে আছে, ভাল থাকুক, সুস্থ থাকুক! লড়াইয়ে থাকুক। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

জনপ্রিয়

Back To Top