সপ্তাহের সাক্ষাৎকার: সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরি

(প্রশাসক হিসেবে এই তাঁর টোটকা। শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাসের বাতাবরণ দূর করার বিষয়ে রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্যকে প্রশ্ন করেছিলেন নীলাঞ্জনা সান্যাল)

 যখন রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য হলেন, পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তপ্ত ছিল। কীভাবে সামলেছিলেন?‌ সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরি:‌ ২০১২ সালের জুলাই মাসে দায়িত্ব নিই। তখন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষে এক শিক্ষাকর্মীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। ছাত্রদের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিগ্রহের অভিযোগ ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগও ওঠে। শিক্ষাকর্মীদের সঙ্গে বচসার জেরে রেজিস্ট্রার ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে একপ্রকার বাধ্য হন। পরিস্থিতি যথেষ্ট টালমাটাল ছিল। সেটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনও নির্দেশ জারি করে নয়। সব পক্ষের সঙ্গে আগাম আলোচনা করে কোনও পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকী, পঠনপাঠনের ক্ষেত্রেও আগাম আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সে সেমেস্টার বা চয়েস বেস্‌ড ক্রেডিট সিস্টেম চালু—যাই হোক না কেন। গত চারবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন গুরুতর কোনও সমস্যা নেই। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যে কোনও সমস্যা, সে র‌্যাগিং বা শ্লীলতাহানির অভিযোগ, ফেলে না রেখে দ্রুত মোকাবিলা করা উচিত। অনেক সময় আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় ফেলে রাখি। কিন্তু তাতে আখেরে সেই প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষতি হয়। 
 জিডি বিড়লা স্কুলের ঘটনায় অধ্যক্ষকে সরে যেতে হল। ওঁর জায়গায় আপনি থাকলে কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতেন?‌
সব্যসাচী:‌ স্কুলটি বেসরকারি। তাই তার পরিচালন বিধি নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না। এটুকু বলতে পারি, যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা  খতিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম। প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করতাম। অভিযোগকারীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতাম। অর্থাৎ, সঙ্গে সঙ্গে একটা ব্যবস্থা নিতাম। অভিজ্ঞতায় দেখেছি,  তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়াটা খুব জরুরি। অভিযোগের আকারে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, আগে সেটার প্রশমন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের কেউ কোনও অন্যায় করেনি—এই মনোভাব নিয়ে থাকতাম না। কারণ, সকলের দায়িত্ব আমি নিতে পারি না। কার মনে কী আছে, সেটা জানাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ঘটনা কী বা আদৌ ঘটেছে কিনা ইত্যাদি তর্কে না গিয়ে আগে উচিত ক্ষোভ প্রশমন করা। সেজন্য যেটা করা দরকার, আগে সেটাই করতাম। 
 কিন্তু আন্দোলনটা তো কার্যত অধ্যক্ষ তাড়ানোর আন্দোলন হয়ে গেল!‌ একজন শিক্ষা প্রশাসক হিসেবে কী মনে হচ্ছে?‌ 
সব্যসাচী:‌ এটা খুব বিপজ্জনক। এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে তা কোনও নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু নয়, শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনও কারণে বনিবনা না হলে, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আক্রোশ থাকলে কোনও ইস্যুতে একটা গোষ্ঠী তৈরি করে আন্দোলন করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। অভিভাবকদের আরেকটু সচেতন থাকার দরকার আছে। কারণ, তাঁদের ছেলেমেয়েরাও বিষয়টা দেখছে। এরপরে নম্বর কম পেলে তারাও এই ধরণের আন্দোলনে নামতে পারে। শিক্ষকদের সম্মান করার জায়গাটাও তো নড়বড়ে হয়ে যাবে। 
 একটা সময় স্কুলে শিক্ষক–শিক্ষিকাদের রেখে দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হতো পড়ুয়ারা। এখন পড়ুয়াদের একাংশও অভিভাবকদের সঙ্গে আন্দোলনে নামছে! সম্পর্কে এই ভাঙনের ব্যাখ্যা কী?‌
সব্যসাচী:‌ একটা সময় ছিল, যখন মাষ্টারমশাই সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে আমরা উঠে দাঁড়াতাম। তিনি খেয়াল করলেন কিনা, সেটা বিচার্য ছিল না। এখন আর সেদিন নেই। তবে মনে হয়, ইদানীং শিক্ষকদের ভাবমূর্তি বদলে যাওয়াটাও এজন্য অনেকটা দায়ী। শিক্ষকদের জীবনযাত্রায় অনেক বদল এসেছে। বেতন অনেকটাই বেড়েছে। নিজের গাড়ি নেই, কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় এমন শিক্ষক খুব কম আছেন। শিক্ষক হিসেবে শুধু সিলেবাস শেষ করাটাই একমাত্র কাজ হতে পারে না। এর বাইরেও পিছিয়ে–পড়া ছাত্র বা ছাত্রীটিকে একটু সময় দেওয়া দরকার। এখানে আমাদের তরফে খামতি তৈরি হয়েছে। আমরা আমাদের দাবি নিয়ে যতটা সচেতন (‌‌সেটাও অবশ্য একটু দরকার বটে)‌‌, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ নিয়ে সচেতনতা ততটা বাড়েনি। আগে শিক্ষকরা বিনাপয়সাতেও পড়া বুঝিয়ে দিতেন। এখন এটা ভাবাই যায় না! শিক্ষকদের মানসিকতায় বদল এসেছে। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেটাও কাজ করছে। তারাও আমাদের প্রয়োজনীয় সম্মান দিচ্ছে না। তবে সংখ্যায় কম হলেও এখনও কিছু শিক্ষককে  বাজারি মানসিকতা গ্রাস করতে পারেনি। তাঁদের সকলেই শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। 
 এখানে অভিভাবকদের কোনও ভূমিকা আছে?‌
সব্যসাচী:‌ অবশ্যই। কারণ, একটি শিশুর প্রথম রোল মডেল তার বাবা–মা। তার প্রথম শিক্ষা বাড়ির পরিবেশ থেকেই। তাই অভিভাবকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাচ্চার স্কুলে গিয়ে বাবা–মা বিক্ষোভ দেখালে, ভাঙচুর করলে, কুকথা বললে সেই স্কুলের পড়ুয়া হিসেবে তাঁদের সন্তান কী শিখবে? স্কুলের ভেতর যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠলে ক্ষোভ সঙ্গত। কিন্তু প্রতিবাদেরও অনেক রকম ভাষা আছে। আরেকটু দায়িত্বশীল আচরণ আমরা আশা করতেই পারি। 
 একটা পারস্পরিক অবিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়েছে। স্কুল, অভিভাবক, পড়ু্য়া—সকলে আতঙ্কিত। এটা ঠেকাতে কী করণীয়?‌
সব্যসাচী:‌ এটা সত্যিই চিন্তার। এটা সুস্থ–স্বাভাবিকভাবে একজন পড়ুয়ার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অন্তরায়। যে কোনও মানুষকে দেখলেই সে ভয় পেতে পারে। স্কুলে কী হচ্ছে, বাবা–মা হিসেবে সেই খবর রাখাটা জরুরি। কিন্তু তার জন্য শিশুটিকে বারবার প্রশ্ন না করে অন্যভাবেও খবর নেওয়া যায়। এই মোবাইলের যুগে অল্প বয়সেই বাচ্চার হাতে সেলফোন দিয়ে দিচ্ছেন বাবা–মা। এটার দরকার আছে। কিন্তু ব্যবহারের দিকে নজর রাখতে হবে। কিন্তু দেখতে হবে, যাতে তাতে আতঙ্ক তৈরি না হয়। আমার মনে হয়, এখনকার পরিস্থিতিতে প্রতিটি স্কুলেই শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা দরকার। যিনি রোজ না হলেও একটা সময় অন্তর পড়ুয়াদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলবেন। 
 জিডি বিড়লার ঘটনার শিক্ষাক্ষেত্রে কোনও সুদূরপ্রসারী প্রভাব?‌
সব্যসাচী:‌ থাকতে পারে। স্কুল পরিচালকদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত। কোনও অভিযোগ এলে দ্রুততার সঙ্গে ক্ষোভ নিরসন করতে হবে। নইলে অভিযোগকারীর সঙ্গে কর্তৃপক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাসের জায়গাটা বাড়বে। যেটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। ক্লাসে কেউ দুষ্টুমি করলেও শিক্ষকরা ন্যূনতম শাস্তি দিতে ভয় পাবেন। তাতে আখেরে ক্ষতি পড়ুয়াটির। ক্ষতি অভিভাবকদেরও।  

জনপ্রিয়

Back To Top