সাগরিকা দত্তচৌধুরি: বারে বারে জ্বর, গা–হাত–পা ব্যথা, চোখ রক্তজবার মতো লাল। ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া ভেবে সবরকম রক্তপরীক্ষা করান ব্যান্ডেলের বাসিন্দা রত্না কর (‌নাম পরিবর্তিত)‌। কিন্তু কোনও কিছুই ধরা পড়েনি। উপসর্গর ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক তাঁর রক্তের নমুনা যাচাই করাতে পাঠালে ‘‌ওয়েলস ডিজিজ’‌ নামে বিরল এক রোগের সন্ধান পায় ব্যারাকপুরের টেকনো গ্লোবাল হাসপাতাল। 
চিকিৎসকরা জানান, ইঁদুরের মূত্রের মধ্যে এই রোগের ব্যাকটেরিয়া লুকিয়ে থাকে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে লিভার, কিডনি খারাপ হয়ে প্রাণঘাতী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদিও চিকিৎসকদের তৎপরতা ও সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে দ্রুত সুস্থ হয়ে বৃহস্পতিবার হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান রত্না। দিন দশেক আগে ব্যারাকপুরের টেকনো গ্লোবাল হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি হন রত্না। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অভিজ্ঞান মাজির অধীনে চিকিৎসা চলে।
চিকিৎসক অভিজ্ঞান বলেন, ‘‌যখন ওই রোগী ভর্তি হন, তখন তাঁর ধুম জ্বর ছিল, সঙ্গে কাশি, মূত্রের সমস্যাও হচ্ছিল। সেইসঙ্গে চোখের সাদা অংশ সম্পূর্ণ লাল (‌ব্লাডি আই)‌ বর্ণের হয়ে গেছিল। চিকিৎসার ভাষায় যাকে ‘‌কনজাংটিভাল কনজেশন’‌ বলে।  মুখের ভিতর, জিভে মিউকাস জমে সাদা হয়ে গেছিল, ঠোঁট, গালের ভিতর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। কিছু খেতে পারছিলেন না। অথচ ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া ধরা পড়েনি, প্লেটলেট কাউন্টও স্বাভাবিক ছিল। বুকের এক্স–রে–তে নিমোনিয়ার মতো ধরা পড়ে। তিনি বাইরের খাবার, জল ভীষণ পরিমাণে খেতেন বলে জানতে পারি। প্রথমে সাধারণ ভাইরাল ফিভার মনে করলেও উপসর্গ দেখে মনে হল ‘‌লেপটোস্পাইরা’‌ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। তাই লেপটোস্পাইরা সেরোলজি টেস্ট করাতে পাঠাই। কিন্তু সেই রিপোর্ট আসতে দিন সাতেক সময় লাগবে। এদিকে রোগীর অবস্থা ক্রমশ আশঙ্কাজনক হওয়ায় রিপোর্ট আসার অপেক্ষা না করে দ্রুত ‘‌ডক্সিসাইক্লিন’ নামে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। নইলে সংক্রমণ ছড়ানোর ভয় ছিল। দেখা যায় ৪–৫ দিন পর রোগীর অবস্থা উন্নতি হতে থাকে। যথাসময়ে অ্যান্টিবায়োটিক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর স্টেরয়েড রোগীর শরীরে পড়েছিল বলেই এটি সম্ভব হয়েছে।’‌
 ক্লিনিক্যাল ডায়াগনসিসটা এক্ষেত্রে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন ডাঃ অভিজ্ঞান। কারণ নমুনার রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর চিকিৎসা শুরু করলে ততদিনে রোগীর লিভার, কিডনি খারাপ হয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। এই কেসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ সাধারণত লেপটোস্পাইরোসিসে আক্রান্ত হয়ে যখন কেউ ভর্তি হন, ততক্ষণে রোগীর লিভার, কিডনি প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে ডায়াগনসিসটা অতটা চ্যালেঞ্জিং নয়। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে তা হয়নি। বরং শুধু ফুসফুসে প্রভাব পড়েছিল এবং মুখের ভিতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাই এটা ডায়াগনসিস করাটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ খুব কম রোগীর মধ্যে শুধু ফুসফুস ও রক্তক্ষরণের সমস্যা দেখা যায়।
লেপটোস্পাইরা সংক্রমণ হল এক ধরনের জুনোটিক ডিজিজ। ইঁদুরের মূত্র থেকে এই রোগ ছড়ায়। বর্ষাকালে এই রোগ বেশি দেখা যায়। সাধারণত রাস্তার ধারে কিংবা অপরিষ্কার কোনও জায়গায় আসবাবপত্র রাখলে, তার মধ্যে ইঁদুর প্রস্রাব করলে, সেই পাত্র ভালমতো না ধুলে তার মধ্যে ব্যাকটেরিয়া থেকে যায়। পরে ওই পাত্রে কিছু খেলে ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ছড়ায়। খুব কম সংখ্যক দেখা যায় বলে এই রোগটিকে বিরল বলা হয়। দেশে যত ধরনের সংক্রামক ব্যাধি আছে, তার মধ্যে এই রোগের সংখ্যা খুবই কম। চারদিক থেকে ডেঙ্গি, অজানা জ্বরের প্রকোপের কথা শোনা গেলেও ‘‌ওয়েলস ডিজিজ’‌ বা ‘‌লেপটোস্পাইরোসিস’‌ ডায়াগনসিস হওয়াটা আশ্চর্যের বিষয় রোগীর পরিবারের কাছে। আন্দামানে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। এ রাজ্যে এই রোগের প্রকোপ খুব কম। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top